আব্দুল হাই: জেলা বিএনপি’র রাজনীতিতে একক আধিপত্য

মোহাম্মদ সেলিম: জেলা বিএনপি’র সভাপতি আলহাজ্ব আব্দুল হাইয়ের রাজনৈতিক দাপটে সাবেক তথ্য মন্ত্রী এম. শামসুল ইসলাম মুন্সীগঞ্জের রাজনীতিতে থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে নানা জনে নানা মহলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এক সময়ের এই দাপুটে মন্ত্রীর এ হালে অনেকেই খুশি বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। এম. শামসুল ইসলামের পুত্র সাইফুল ইসলাম বাবু তার উত্তোরসূরি হিসেবে স্থানীয় রাজনীতিতে হালে তেমন পানি পায়নি বলে তার সমর্থকরা দাবি করছে। এম. শামসুল ইসলামের ষোল বছরে মুন্সীগঞ্জের বিএনপি’র রাজনীতিতে বর্তমান জনপ্রিয়তা শূণ্যের কোঠায় নেমে এসেছে। হারিয়ে যেতে বসেছে নাম দাম। তবে তার আসনে তার উন্নয়নের ছোয়ায়, উন্নতির কথা সাধারণ মানুষের মনে মনে। তার সময়ের উন্নয়ন বর্তমান সরকারের সময়ে করতে পারেনি বলে সাধারণ ভোটারদের অভিমত। বর্তমানে এম. শামসুল ইসলাম অসুস্থ। আগের মতো চলাচল করতে পারেন না। স্থানীয় রাজনীতির জন্য তিনি আর সময় দিতে পারেন না। কেন্দ্রীয় বিএনপিতে তার পদবী থাকলেও সেখানেও তিনি অসুস্থতার জন্য সময় ব্যয় করতে পারছেন না। ইতোমধ্যে তার স্ত্রী মারা গেছেন। এতে তিনি আরো মূষরে পড়েছেন।

নানা কারণে এম.শামসুল ইসলামের সমর্থকরা বিএনপি’র রাজনীতিতে কোনঠাসা। মুন্সীগঞ্জে আব্দুল হাইয়ের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে এম.শামসুল ইসলামের পক্ষে নিয়ে ছিলেন প্রয়াত সাবেক জেলা বিএনপি’র সিনিয়র সহ সভাপতি শাহজাহান সিকদার। এ কারণে পরে তাকে আর এ পদে রাখেননি আব্দুল হাই। এই পদে আসিন হন আব্দুল হাইয়ের স্ত্রীর বড় ভাই শাহজাহান খাঁন। শ্বশুড় বাড়ী বলে কথা! এর ফলে রাজনীতির বেড়াজ্বালে পরে শাহজাহান সিকদার রাজনীতিতে কোনঠাসা হয়ে পরেন। পরে শাহজাহান সিকদার নির্বাচন করে শহর বিএনপি’র সভাপতি নির্বাচিত হন। এতে তার কিছুটা ইজ্জত রক্ষা হয়।

১৯৯১ সাল। প্রয়াত জেলা বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা সিদ্দিকুর রহমানকে সরিয়ে দিয়ে মুন্সীগঞ্জ ৩ আসনে বিএনপি’র নতুন মুখ হিসেবে রাজনীতিতে অভিষেক ঘটে এম.শামসুল ইসলামের। এরপর তাকে আর রাজনীতিতে ফিরে তাকাতে হয়নি। রাজনীতির দাপটে কখনো কখনো এম.শামসুল ইসলাম ডাবল মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। আব্দুল হাইয়ের কাছে রাজনীতিতে পুত্র সাইফুল ইসলাম বাবুকে সক্রিয় করতে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি পদ চেয়ে ছিলেন এম. শামসুল ইসলাম। কিন্তু সেই সময় আব্দুল হাই এ পদটি সাইফুল ইসলামকে না দিয়ে তার ছোট ভাই মহিউদ্দিনকে এ পদে নিয়ে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে এম.শামসুল ইসলামের সাথে আব্দুল হাইয়ের রাজনৈতিক দ্বন্ধের যাত্রা শুরু হয়।

২০০১ সাল। চার দলীয় জোট বিএনপি আবার রাস্ট্রের ক্ষমতায় আসে। কিন্তু মুন্সীগঞ্জ ৪ আসনে উপ নির্বাচনে আব্দুল হাই বিজয়ী হন। এর আগেই বিএনপি মন্ত্রী পরিষদ গঠন করে। এতে এম. শামসুল ইসলাম আবার মন্ত্রী হয়ে মুন্সীগঞ্জের রাজনীতি ফিরে আসেন। এতে আব্দুল হাইয়ের রাজনীতির চাকা পিছনে পরে যায়। অভিযোগ আছে সেই সময় এম. শামসুল ইসলামের পরামর্শে উপ নির্বাচন পিছিয়ে দেয়া হয়। যাতে আব্দুল হাই মন্ত্রী পরিষদে না আসতে পারে। এই সময় আব্দুল হাই প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শিকার হন বলে অভিযোগ উঠেছে। মুন্সীগঞ্জে বিএনপির রাজনীতিতে প্রতক্ষ্য প্ররোক্ষ ভাবে বি চৌধুরীর প্রভাব ছিল। বি চৌধুরী বিএনপি’র রাস্ট্রপতি পদ থেকে সরে যাওয়র পর এখানে এককভাবে রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে এম. শামসুল ইসলাম।

১৯৯১ সালে এম.শামসুল ইসলামের সাথে আব্দুল হাইয়ের যে রাজনৈতিক টানাপোড়ন শুরু হয় তার ধারাবাহিকতার মধুর প্রতিশোধ হিসেবে ২০০১ সালে এ ঘটনার আবির্ভাব ঘটে বলে অনেকে মনে করে। মন্ত্রীর রাজনীতির মাঠ থেকে আব্দুল হাইকে সরিয়ে এম.শামসুল ইসলাম মুন্সীগঞ্জ জেলায় দাদাগিরি শুরু করেন। মন্ত্রীর স্বাদ পেতে সেই সময় অনেকেই আব্দুল হাইকে ছেড়ে এম.শামসুল ইসলামের পিছু পিছু ঘুরতে শুরু করেন। প্রতিহিংসার রাজনীতিতে সেই সময় আব্দুল হাই স্থানীয় রাজনীতিতে কোনঠাসা হয়ে পরেন।

রাজনীতির খোলামাঠে এম.শামসুল ইসলাম দলের মহাসচিব থেকে শুরু করে হেভিওয়েট নেতাদের নিমন্ত্রণ করে আনেন। সেখানে আব্দুল হাইসহ তার অনুসারিদের নিমন্ত্রণ করা হয় না। সেই সময় আব্দুল হাইকে নানাভাবে রাজনীতি থেকে বঞ্চিত করা হয়। বিষয়টি দলের হাই কমান্ডকে জানানোর পরও আব্দুল হাই এ বিষয়ে কোনা সমাধান পাননি। রাজনীতিতে ভিতরে ভিতরে আব্দুল হাই ফুঁসে উঠতে থাকেন।

এ সময় বিএনপির বিদায়কালে রাজনীতির অস্থিতিরতার সময় সেনা বাহিনীর আগমন ঘটে। রাজনীতিতে দেখা দেয় উল্টোপাল্ট দৃশ্য। সেনা বাহিনীর সমর্থনে ফেরদৌস কৈরাসির কিংস পার্টিতে বিএনপি ছেড়ে আব্দুল হাই এ দলে যোগদান করেন। কি দেখে আব্দুল হাই এখানে যোগদান করে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে? রাজনীতির দৈনদশার কারণে আব্দুল হাই এমনটি করেছে বলে অনেকের অভিমত। রাজনীতিতে ভুল সিদ্ধান্তের বিষয়টি বুঝতে পেরে আব্দুল হাই কিংস পার্টি ছেড়ে আবার বিএনপিতে ফিরে আসেন। ততদিনে বিএনপির রাজনীতিতে আব্দুল হাইয়ের মারাতœক ক্ষতি হয়ে যায়।

২০০৮ সালের নির্বাচনে ৪টি আসনের মধ্যে একটি আসন কমিয়ে মুন্সীগঞ্জের আসন পুর্ন বির্নাস করা হয়। আসন পুর্ন বির্নাসের কারণে নেতাদের মধ্যে প্রার্থী পদ নিয়ে সংকট দেখা দেয়। আবারো প্রসাদ ষড়যন্ত্রের কারণে আব্দুল হাইকে মুন্সীগঞ্জ ৩ আসনে মনোনয়ন না দিয়ে সাবেক তথ্য মন্ত্রী এম.শামসুল ইসলামকে মনোনয়ন দেয়া হয়। আর আব্দুল হাইকে মনোনয়ন দেয়া হয় ঢাকা ১০ আসনে। এর ফলে এখানে রাজনীতির চিত্র পরিবর্তন হতে থাকে ক্রমশ।

মুন্সীগঞ্জ ৩ আসনটি মুলত বিএনপি’র হয়ে আব্দুল হাইয়ের ঘাটি বলা চলা। সেখানে আব্দুল হাইয়ের মনোনয়ন না থাকায় আব্দুল হাইয়ের সমর্থকরা সেই নির্বাচনে এম. শামসুল ইসলামের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে সেই নির্বাচনে ৭৫’এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দ্বিতীয়বারের মতো নতুন মুখ হিসেবে আ’লীগের প্রার্থী এম. ইদ্রিস আলী বিজয় লাভ করে। অভিযোগ উঠেছে আব্দুল হাইয়ের কারণে সেই নির্বাচনে পরাজয় ঘটে এম.শামসুল ইসলামের। এর আগে এরশাদ সরকারের সময় ১৯৮৬ সালে এ আসন থেকে মো. মহিউদ্দিন সাংসদ হন। এ নির্বাচনে বিএনপি এরশাদ সরকারের নির্বাচন বর্জন করে। এ নির্বাচন বর্জনের কারণে বেগম খালেদা জিয়া আপোষহীন নেত্রীর উপাধী পান।

২০০৮ সালের পর বিএনপি রাজনীতিতে বিরোধী দলের কাতারে পরে যায়। কেন্দ্রীয় কর্মসূচি হিসেবে এখানে ঢিলাঢালা কর্মসূচি পালিত হতে থাকে। ডাক সাইটের নেতারা মাঝে মাঝে কর্মসূচিতে আসেন মাঝে মাঝে আসেন না। তবে এম.শামসুল ইসলামের সমর্থকদের এসব কর্মসূচিতে তেমন একটা দেখা যেতো না বলে অভিযোগ রয়েছে। জেলা বিএনপি’র অনেক নেতাকে সরকার বিরোধী আন্দোলনে দেখা যায়নি। অনেকেই টাকার বিনিময়ে জেলা কমিটির পদ পেয়েছেন বলে অভিযোগ থাকায় তারাও আন্দোলন কর্মসূচি এড়িয়ে চলেন বলে অনেকেই মনে করেন। যাতে তাদের ব্যবসা বাণিজ্যের যেন কোন ক্ষতি না হয়। জেলার হেভিওয়েট নেতাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা নেই বলে খবর চাউর হচ্ছে। অনেক ছাত্র নেতা ও যুব নেতাদের বিরুদ্ধে থানায় সরকার বিরোধী আন্দোলনের মামলা রয়েছে। অনেকেই গ্রেফতার হয়েছে। আবার অনেকেই আন্দোলনের ভয়ে বিদেশে চলে গেছেন।

বিক্রমপুর সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.