ঈদ–স্মৃতি: ‘মা বলতেন, পেটুক ছেলে কোথাকার’

এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী
এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীঅক্টোবর মাসে আমার বয়স ৮৪ হবে। সুতরাং ছেলেবেলার সব স্মৃতি মনে নেই, ফিকে হয়ে গেছে অনেক কিছু। কিন্তু ঈদের স্মৃতি কি আর ভোলা যায়?

রোজার সঙ্গে আসে যে ঈদ, তাকে আমরা বলতাম রোজার ঈদ। ‘ঈদুল ফিতর’ শব্দটা আমার জন্য ছিল কঠিন।

আমার ছেলেেবলায় ঈদের ছুটি দুই কি তিন দিন ছিল। সময়টা ব্রিটিশ আমল। বড় ছুটিতে আমরা যেতাম নানাবাড়ি কুমিল্লার মুন্সেফ বাড়িতে। সেখানে সব খালাতো, মামাতো ভাইবোনদের সঙ্গে হইচই করে দিন কাটত।

কিন্তু তিন দিনের ছুটিতে কুমিল্লা যাওয়া হতো না। ফলে ঈদ মানেই বিক্রমপুর যেতে হবে, সেখানে বাপ-চাচাদের বাড়িতে ঈদ করতে হবে।

তখনকার দিনে বিক্রমপুর যাওয়া ছিল বেশ কঠিন। রাস্তাঘাট প্রায় ছিলই না। বাবার সঙ্গে ট্যাক্সি ভাড়া করে নারায়ণগঞ্জ অথবা ফতুল্লা গিয়ে লঞ্চে করে যেতে হতো সিরাজিদখান, সেটাও প্রায় আড়াই–তিন ঘণ্টার ব্যাপার। বাবা আমাদের বেশির ভাগ সময় দোতলায় তথাকথিত ফার্স্ট ক্লাসে নিয়ে বসাতেন। সেখানে বেশি হলে ৮–১০ জনের জায়গা হতো। আমি ও আমার বড় ভাই লঞ্চের ওপর–নিচে হাঁটাহাঁটি–দৌড়াদৌড়ি করতে চাইতাম। মা সঙ্গে থাকলে সেটি পারা যেত না। তিনি আমাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, এই দুই শহুরে ছেলের ওপর প্রখর দৃষ্টি না রাখলে হঠাৎ একটা কোনো কাণ্ড হয়ে যেতে পারে।

গ্রাম মজিদপুর দয়হাটা, থানা শ্রীনগর, মহকুমা মুন্সিগঞ্জ—এই ছিল আমাদের গ্রামের বাড়ির ঠিকানা। মনে পড়ে, সিরাজদিখান থেকে বাড়ি যাওয়ার পথে ছিল বিরাট এক বটগাছ। আমি ও আমার বড় ভাইয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল, কী করে আগে বটগাছের নিচে পৌঁছাব। আমার বাবা মা ও ভাইবোনদের নিয়ে নির্ধারিত পাঁচ মিনিট বিশ্রাম করতেন এখানে। গরমের দিনে সিরাজদিখান থেকে মাথার চেয়ে এক হাত উঁচু পাটখেতের প্রখর গরমের ভেতর দিয়ে প্রায়ই দৌড়ে দৌড়ে চলে যেতাম বাড়িতে। মজিদপুরের জন্য একটা অদম্য আকর্ষণ ছিল আমার।

পিঁপড়া যেমন করে গুড়ের খবর পেয়ে যায়, তেমনি আমাদের গ্রামের আত্মীয় এবং অনাত্মীয় সমবয়সী ছেলেরা, আমি পৌঁছার আগেই খবর পেয়ে যেত; তা দুই দিনের জন্য হোক, আর দশ দিনের জন্যই হোক। প্রায় দেড় ঘণ্টার রাস্তা পেরিয়ে ঘর্মাক্ত অবস্থায় বৈঠকখানার ঘরে ছুটে যেতাম আমরা।

এরপর শুরু হতো ঈদের দিনের পরিকল্পনা। শীত–গ্রীষ্ম যখনই ঈদ হোক না কেন, প্রথম কথা ছিল, ভোররাতে সকাল হওয়ার আগে ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে আসতে হবে। সবাই মিলে পুকুরে একসঙ্গে করতে হবে ঈদের গোসল। পুকুরটা ছিল মাঝারি আকারের, প্রায় সোয়া বিঘার মতো হবে। মা সব সময় ভয় পেতেন, এই শহুরে ছেলে দুটো কখন না পুকুরে ডুবে যায়।

যাহোক, গোসল সেরে যার যার ঘরে গিয়ে নতুন কাপড় পরে শুরু হতো ঈদের দ্বিতীয় পর্ব—সেমাই এবং ফিরনি খাওয়া।

আমাদের একই বাড়িতে অনেকগুলো ঘর। বড় চাচা অনেক আগে মারা গেছেন। তাঁর ছেলে আলু ভাইয়ের ঘরেই ছিল আমাদের মূল আস্তানা। ভাবি ছিলেন আমার মায়ের বন্ধুস্থানীয়, প্রায় সমবয়সী। রাতের বেলায় তাঁর হাতে তৈরি সেমাই আর গুড় দিয়ে সেমাইয়ের ফিরনি বানিয়ে রাখতেন। ভাবির সেই বিখ্যাত ফিরনি একবার, দুবার, তিনবারও চেয়ে চেয়ে খেয়েছি। আর তাঁর স্নেহময়, তুলনাহীন স্মিত হাসির সঙ্গে অনুরোধ, ‘আরও একটু খাবি?’ ভুলতে পারিনি এখনো।

মেজো চাচার ঘরে ঢুকে খেতে হতো চাচির হাতের তৈরি ফিরনি। আমার মেজো চাচা স্নেহময় মানুষ ছিলেন। ‘এই মিয়া, এই দিকে আইসো’—এই কথা বলে পরক্ষণেই পকেটে ভরে দিতেন আস্ত একটা রুপার টাকা। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রতি আমার ভক্তি যেন দশ গুণ বেড়ে যেত।

চাচার দ্বিতীয় কাজ ছিল, খাঁটি সরষের তেল থেকে দুই হাতে মেখে ভালো করে আমার চুলে মালিশ করা।

নিজের পরিবারের সঙ্গে অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীতারপর যেতাম ঈদের নামাজে। বাড়ি থেকে পাঁচ মিনিটের হাঁটার দূরত্বে মসজিদ। বাবার কেনা নতুন শার্ট (প্রায়ই সিল্কের তৈরি) পরে নামাজে যাওয়াটা ছিল আমাদের রীতি। দৌড়ে মসজিদে পৌঁছাতাম পাঁচ নয়, তিন মিনিটেই। দৌড়ের চোটে ইতিমধ্যে বাবার দেওয়া নতুন ইংলিশ শুতে পায়ে ফোসকা পড়ে যেত। নতুন জুতার ব্যাপারে খুব সাবধান ছিলাম আমি। চামড়ার তৈরি নতুন জুতার ছিল বিশেষ গন্ধ। বাক্সসহ জুতা জোড়া আমার বালিশের পাশে স্থান পেত ঈদের তিন দিন আগে থেকেই, এবং দুই দিনের মধ্যে সেই জুতা পরে পায়ে ফোসকা পড়া—এও যেন ছিল সাধারণ নিয়ম।

নামাজ শেষে বাড়ি পৌঁছে, মা-বাবা, ভাবি, চাচা-চাচি, বড় চাচাতো ভাইবোন—সবাইকে সালাম করার ভেতরে একটা অন্যরকম আনন্দ ছিল। এর সঙ্গে আবার এক টাকা, আট আনা বকশিশ—সব মিলিয়ে ভালোই লাগত।

পরের পর্বটি ছিল খানা–খাবারের। কয়েকজন বন্ধুসহ আমি পাটি বিছিয়ে বসে পড়তাম ভাবির ঘরে। আমাদের সামনে ভাবির হাতের আশ্চর্য সুঘ্রাণময় খানা—সাদা পোলাও, আলু দিয়ে মুরগির সাদা কোরমা, কখনো মুগডাল ঘিয়ে বাঘার দেওয়া। এই আনন্দের দিনে শাকসবজি, তরকারি নিষিদ্ধ। এটা হলো পোলাও–মাংস খাওয়ার দিন। সকালের ফিরনিও আবার ফিরে আসত।

খাওয়া–দাওয়া কিন্তু এখানেই শেষ নয়। মেজো চাচা-চাচির ঘরে বড় বড় মুরগির কোরমা, সাদা পোলাও এবং ঘিয়ে বাঘার দেওয়া মুগডাল—এসবের কথা তো বলাই হলো না।

খাওয়া শেষে গন্তব্য ফুফুর বাড়ি, উত্তর দয়হাটা। ঈদের দিন সেখানে যেতেই হবে, ফুফু–ফুফাকে সালাম করে কিছু না–কিছু খেতে হবে—রীতি ছিল এমনই।
এরপর সারা দিন কেবলই খাওয়া—পুরো গ্রামে একই খানা। পাড়া-প্রতিবেশী কেউ কেউ খাবারের সঙ্গে আরও দিতেন কাচের বয়ামে রাখা নিজের হাতে তৈরি আমের মোরব্বা; শুকনা লাল মরিচ, টুকরা করা চিকন চিকন আমের টুকরা একত্রে প্রচুর চিনিসহ জ্বাল দিয়ে রান্না করা, মা-চাচিরা একে বলতেন ‘জিলি’। গরম সাদা পোলাওয়ের সঙ্গে এগুলো খাওয়ার পর মনে হতো, এটাই বুঝি অমৃতের স্বাদ।

ঈদের দিন এভাবে ১২–১৪ বাড়িতে খাওয়ার রেকর্ড থাকত আমাদের দখলে। সন্ধ্যাবেলা মাকে যখন বলতাম, ওই বাড়ি ওই বাড়ি থেকে খেয়ে এসেছি, মা হাসতেন, তাঁর গলায় কৃত্রিম রাগ, বলতেন ‘পেটুক ছেলে কোথাকার!’

এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী

সাবেক রাষ্ট্রপতি, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ

প্রথম আলো

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.