মিরকাদিমের ধবল গরুর ঐতিহ্য প্রায় বিলীন

মঈনউদ্দিন সুমন: কোরবানির ঈদে পুরান ঢাকাবাসীর রসনা বিলাসে আর কিছু থাকুক বা নাই থাকুক, মুন্সীগঞ্জের মীরকাদিমের ধবল (সাদা) গরুর মাংস থাকা চাই। কিন্তু দিন দিন সাদা গরুর ঐতিহ্য বিলীন হতে বসেছে।

কোরবানির ঈদ উপলক্ষে সবেমাত্র এক সপ্তাহের জন্য ঢাকার রহমতগঞ্জ মাঠে (গনিমিয়ার হাট পুরনো নাম) মীরকাদিমের সাদা গরুর হাট বসে। মীরকাদিমের গরুর কদর ও দাম একটু বেশি। ৮০ হাজার থেকে ৮ লাখ টাকা গরুর মূল্য হয়ে থাকে। তবে মীরকাদিমের গরু মুন্সীগঞ্জের কোনো হাটে বিক্রি হয় না। ভারতের উরিষ্যা, জঙ্গলি, নেপালের নেপালি, ভুটানের বুট্টি গরু মীরকাদিমে লালন-পালন করা হয়।

মীরকাদিমের ব্যাংক কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেন জানান, আগের মত ঘরে ঘরে মীরকাদিমে গরু কেউ বানায় না। রহমতগঞ্জের গনিমিয়ার হাট বলতে মীরকাদিমের গরুকে বোঝাত। এখন হাতেগোনা কয়েকজন গরু পালে।

গরু খামার মালিক বাচ্চু মিয়া দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘মীরকাদিমে গরু বানানো এখন প্রায় বন্ধ। সামনের বছর নাও পেতে পারেন। আগের বছর ৫০টা গরু বানাইছিলাম, এবার ২২টা। সাদা বুট্টি গরু এখন পাওয়া যায় না, আগের বছর লোকসান খাইছি।’

তিনি বলেন, ‘মীরকাদিমের গরুর একটা ঐতিহ্য ছিল। এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে আমরা পঙ্গু হইয়া যাইতাছি। ঢাকা থেকে কসম কাইটা আসি আর গরু পালুম না। দুই-তিন মাস পরে মন মানাইতে পারি না। ঢাকার হাটে এক ঘণ্টার বেচাকেনা। আমরা গরু নামাই যার ভাগ্য ভালো সে দাম ভালো পায়।’

গরুকে খাওয়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে বাচ্চু মিয়া দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘মিনিকেট চালের খুদ, এক নাম্বার খৈল, ভাতের মার, সিদ্ধ ভাত, খেসারির ভুসি, গমের ভুসি, বুটের ভুসি গরুকে খাওয়ানো হয়।’

খামার মালিক লতিফ মেম্বার দ্য রিপোর্টকে জানান, বিভিন্ন দেশ খেকে দেশে আসা গরু কিনে এনে লালন করে থাকেন। ছোট বুট্টি গরু ১০-২০ হাজার টাকায় কিনে আনি ৪-৫ মাস লালন করে ৫০-৬০ হাজার টাকা বিক্রি হয়ে থাকে। এই গরু বেশি বড় হয় না। দেখতে গোলগাল। আর নেপালী ও ভারতের অন্য প্রজাতির বড় গরু কিনি প্রায় লাখ টাকা আর ছয় মাস লালন পালন করে বিক্রি হয় ২ থেকে ৬ লাখ টাকা।

প্রতি গরুর পিছনে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয় বলে জানান তিনি।

খামার শ্রমিক জিন্নাহ দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘মীরকাদিমের ধবল গরু বানাতে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়। ভারত ও ভুটানের আবাল-পশ্চিমা সাদা ষাঁড় ও সাদা গাভীর বাচ্চা কিনে আনেন মীরকাদিমের খামারিরা। নিজের বাচ্চার মতো লালন করি। নতুন গামছা দিয়ে গোসল করাই। সব সময় চোখে চোখে রাখি। প্রতিটি গরু বড় করতে ও কোরবানির হাটে বিক্রি করার জন্য উপযোগী করে তুলতে ৪-৬ মাস সময় লাগে।’

তিনি বলেন, ‘ইনজেকশন বা গরু মোটাতাজার কোনো ওষুধ ব্যবহার করা হয় না। সাদা গরু এখন পাওয়া যায় না তাই বিভিন্ন রংয়ের গরু বানানো হয়। খামারের ভেতরের পরিবেশ বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হয়। বাইরের কাউকে খামারের ভেতর ঢুকতে পর্যন্ত দেওয়া হয় না।’

দ্য রিপোর্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.