মুন্সিগঞ্জসহ সারাদেশে আওয়ামী লীগ নেতারা নজরদারিতে

বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পেলেই শাস্তি
আওয়ামী লীগের হাই কমান্ড নজর রাখছে দলটির নেতাদের ওপর। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে পৌর নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে দহরম-মহরমের কারণেই হাই কমান্ড এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে আওয়ামী লীগ সূত্রে। এক্ষেত্রে সদ্য বহিষ্কৃত পৌর প্রার্থীদের সঙ্গে স্থানীয় এমপি, মন্ত্রী ও প্রভাবশালী কোনো নেতার জড়িতের অভিযোগ পেলেই তাৎক্ষণিক তাদের স্ব-স্ব পদ ও সম্মান কেড়ে নেওয়া হবে। এ বিষয়ে দলটির সভাপতিম-লীর সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বিদ্রোহীদের সঙ্গে এমপি, মন্ত্রী ও প্রভাবশালীদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাদেরও বহিষ্কার করা হবে। এ ব্যাপারে দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। তবে আশা করছি, ভোটের আগেই বিদ্রোহী প্রার্থীরা দলের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানিয়ে সরে দাঁড়াবেন।

আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে প্রথম থেকেই বিদ্রোহী প্রার্থীর ব্যাপারে সচেতন আওয়ামী লীগ। এরপরও ৭০টি পৌরসভায় আশির বেশি বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে দলটির। এসব প্রার্থী আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের জন্য ফ্যাক্টর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির এক সদস্য বলেন, ওইসব পৌরসভায় প্রতিপক্ষের নৌকা ঠেকাও আন্দোলন জোরদার হবে। অনেক জায়গায় নৌকা ঠেকাতে বিএনপি প্রার্থীদের পক্ষের জনগণও বিদ্রোহী প্রার্থীকে ভোট দেবে।

এদিকে দলের একক প্রার্থী জিতিয়ে আনতে ও দলের ভেতরকার বিদ্রোহ দমনে প্রথম থেকেই অনড় অবস্থানে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা। গত কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় তিনি বিদ্রোহী প্রার্থী ও তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, এমপি ও প্রভাবশালী নেতাদের বহিষ্কারের বিষয়টি স্পষ্ট করেন। এর পরপরই দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের সতর্ক করে দলের সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত চিঠি ইস্যু করা হয়। সেই সঙ্গে বিদ্রোহী প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করা নেতাদেরও এ বিষয়ে সতর্ক করে দেওয়া হয়।

বিদ্রোহী প্রার্থী দমনের ডেটলাইন গত রোববার শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এখনো নির্বাচনী মাঠে থাকা এসব প্রার্থীকে আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কার করে আওয়ামী লীগ। আগামী কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় এসব বিদ্রোহী প্রার্থী ও তাদের মদদদাতা মন্ত্রী, এমপি ও প্রভাবশালী নেতাদেরও স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে বলে জানান দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী শেখ নূরুন্নবী অপু। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ইশতিয়াক হোসেন দিদারের আস্থাভাজন। মূলত তারই নির্দেশনায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন। শরীয়তপুরের নড়িয়ায় শহীদুল ইসলাম বাবু। জেলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান একেএম ইসমাইল হকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী তিনি। জাজিরায় আবুল খায়ের ফকির উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মোবারক আলী সিকদারের লোক। খোকন তালুকদার এবং আনিসুর রহমান সাবেক এমপি ও বর্তমান জেলা পরিষদ প্রশাসক মাস্টার মজিবর রহমানের আস্থাভাজন। কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জের বর্তমান মেয়র আবদুল কাইয়ুমের পক্ষে কাজ করছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতিসহ স্থানীয় নেতারা। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে শওকত আকবর। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আলাওল হকের অনুসারী। এই বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি অজয় কর খোকন, যুবলীগের বর্তমান সভাপতি গোলাম রসুল দৌলতসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতাকর্মী। মুন্সীগঞ্জ সদরের বিদ্রোহী প্রার্থী রেজাউল ইসলাম সংগ্রাম। তিনি মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের উপদপ্তর সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাসের অনুসারী। জেলার মীরকাদিমে পৌর প্রার্থী মনসুর আহমেদ কালাম। তিনি মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের একান্ত লোক। কুমারখালীতে জাকারিয়া খান জেমস। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও চেয়ারম্যান মান্নান খানের ভাতিজা। কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আলাউদ্দিন পিন্টু জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সদর উদ্দিন খানের লোক। বরগুনা সদরে জেলার আওয়ামী লীগ সভাপতি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর আস্থাভাজন বর্তমান মেয়র ও দলের বিদ্রোহী প্রার্থী শাহাদাত হোসেন। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে দেবাশীষ চন্দ্র সাহা, শাহীন আহম্মেদ সবুজ কিছুদিন আগের স্থানীয় সংসদ সদস্য লিটনের অনুসারী ছিলেন। কিন্তু এখন এ কথা স্বীকার না করলেও গোপনে তারই আশীর্বাদে নির্বাচনী মাঠে আছেন বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের গত রোববার সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হলেও বিদ্রোহীদের মদদদাতা ভিআইপি নেতারা এখন পর্দার অন্তরালে থেকে কাজ করছেন। মূলত স্থানীয় সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও প্রভাবশালী নেতাদের মধ্যে দ্বিমুখী-ত্রিমুখী দ্বন্দ্বের কারণেই বিদ্রোহীরা মাঠে থাকার সাহস পেয়েছেন।

জানা গেছে, সবচেয়ে কম বিদ্রোহী প্রার্থী রংপুর বিভাগে আর বেশি ঢাকা বিভাগে। রংপুর বিভাগে দলের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করছেন কুড়িগ্রামের উলিপুরে সাজ্জাদুর রহমান, নীলফামারীর জলঢাকায় বর্তমান মেয়র ইলিয়াছ হোসেন বাবলু, ঠাকুরগাঁও সদরে এসএম সোলায়মান আলী, রানীশংকৈলে ইফতেখার আলী, দিনাজপুরের বিরামপুরে লিয়াকত হোসেন টুটুল এবং লালমনিরহাট সদরে এমএম ওয়াহেদুল হাসান সেনা ও একেএম হুমায়ুন আক্তার শিমুল। দু-একদিনের মধ্যে জেলা নেতারা বসে এসব বিদ্রোহী প্রার্থীকে বহিষ্কার করবেন বলে জেলা আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে।

এ ছাড়া অন্যান্য পৌরসভার বিদ্রোহী প্রার্থীরা হলেনÑ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে সাদেকুর রহমান, ময়মনসিংহের ফুলপুরে বর্তমান মেয়র শাজাহান, গৌরীপুরে শফিকুল ইসলাম হবি, ঈশ্বরগঞ্জে দেলোয়ার হোসেন রিপন ও আবদুস সাত্তার, ভালুকায় শেখ মো. ওমর ফারুক মাস্টার, ত্রিশালে বর্তমান মেয়র এবিএম আনিছুজ্জামান আনিছ, মুক্তাগাছায় দেবাশীষ ঘোষ বাপ্পী, টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে হুমায়ুন খালিদ, গোপালপুরে বেলায়েত হোসেন, ভুঞাপুরে আজহারুল ইসলাম, ধনবাড়ীতে জহুরুল হক বকুল, শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে আবদুল হালিম উকিল, নেত্রকোনার মদনে আবদুল হান্নান শামীম, মোহনগঞ্জে জহিরুল ইসলাম জহির, ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে মোজাফফর হোসেন বাবলু মিয়া, নগরকান্দায় মুরাদ হোসেন বিকুল, গোপালগঞ্জ সদরে মুশফিকুর রহমান লিটন, মাদারীপুরের কালকিনিতে আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহীর পুঠিয়ায় জিএম হিরা বাচ্চু, চারঘাটে গোলাম কিবরিয়া বিপ্লব, বগুড়ার ধুনটে এজিএম বাদশা, জয়পুরহাটের কালাইয়ে সাজ্জাদুর রহমান কাজল, আক্কেলপুরে এনায়েতুর রহমান আখন্দ স্বপন, পাবনার সুজানগরে তোফাজ্জল হোসেন তোফা, সাঁথিয়ায় নফিজ উদ্দিন, চাটমোহরে মির্জা রেজাউল করিম দুলাল, ভাঙ্গুরায় আজাদ খান, ফরিদপুরে জাহাঙ্গীর আলম ও আসাদুজ্জামান আলাল এবং সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে আবদুর রহিম।

কুমিল্লার চান্দিনায় আবদুল মান্নান সরকার, চৌদ্দগ্রামে ইমাম হোসেন পাটোয়ারী, নোয়াখালীর হাতিয়ায় অ্যাডভোকেট ছাইফ উদ্দিন আহম্মেদ, লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মাঈনুল ইসলাম, চট্টগ্রামের সীতাকু-ে নায়েক (অব.) শফিউল আলম ও সিরাজ উদ দৌলা ছুট্ট এবং রাঙামাটি সদরে হাবিবুর রহমান হাবিব ও অমর কুমার দে।
সিলেটের কানাইঘাটে নিজাম উদ্দিন আল মিজান, জকিগঞ্জে ফারুক আহমদ, গোলাপগঞ্জে সিরাজুল জব্বার চৌধুরী ও আমিনুল ইসলাম রাবেল, হবিগঞ্জ সদরে মিজানুর রহমান মিজান, শায়েস্তাগঞ্জে আতাউর রহমান মাসুক, মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় শফি আলম ইউনুছ এবং বড়লেখায় আবদুন নুর। সাতক্ষীরার কলারোয়ায় আরাফাত হোসেন, কুষ্টিয়ার মিরপুরে আতাহার আলী। চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে জাহাঙ্গীর আলম, বাগেরহাট সদরে মীনা হাসিবুল হাসান শিপন, মেহেরপুরের গাংনীতে আশরাফুল ইসলাম ভেন্ডার, নড়াইল সদরে সোহরাব হোসেন বিশ্বাস ও সরদার আলমগীর হোসেন, কালিয়ায় বর্তমান মেয়র বি এম এমদাদুল হক টুলু, শেখ লায়েক হোসেন, সোহেলী পারভীন নিরি ও ফকির মো. মুশফিকুর রহমান লিটন, যশোর সদরে এস এম কামরুজ্জামান চুন্নু, নওয়াপাড়ায় ফারুক হোসেন, চৌগাছায় এস এম বাবুল, মনিরামপুরে জি এম মজিদ এবং ঝিনাইদহের শৈলকূপায় তৈয়েবুর রহমান।

দৈনিক আমাদের সময়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.