অরক্ষিত মুন্সীগঞ্জের বদ্ধভূমি, শনাক্ত হয়নি অনেক

baddabhumuMunshigonjমোজাম্মেল হোসেন সজল: অরক্ষিত ও অবহেলিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে মুন্সীগঞ্জের বদ্ধভূমিগুলো। বিজয়ের ৪৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও অনেক বদ্ধভূমি শনাক্ত করা হয়নি।

শহরের কেন্দ্রীয় বদ্ধভূমিটিও অযত্ন অবহেলায় অরক্ষিত হয়ে পড়ে রয়েছে। মুন্সীগঞ্জ সরকারি হরগঙ্গা কলেজ ক্যাম্পাসের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে এ বদ্ধভূমিটি রয়েছে। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে ১৪ ডিসেম্বর এই বদ্ধভূমির স্মৃতি সৌধে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হয়।

২০০৬ সালে এই বদ্ধভূমিতে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। ২০ শতাংশ জায়গার ওপর এ বদ্ধভূমির স্মৃতিসৌধটি নির্মাণ করে গণপূর্ত বিভাগ। জায়গাটি হরগঙ্গা কলেজ বদ্ধভূমির স্মৃতিসৌধের জন্য দান করেছে। এর নির্মাণ ব্যয় হয়েছিল ২৭ লাখ টাকা। আগে পুরাতন স্মৃতি ফলকটি বদ্ধভূমির পাশে এনে স্থাপন করা হয়।
baddabhumuMunshigonj
বর্তমানে বদ্ধভূমিটি অরক্ষিত ও অবহেলিত অবস্থায় আছে। কোন পাহারাদার নেই এর রক্ষণাবেক্ষণে। এর বাউন্ডারি দেয়ালের অধিকাংশ ভেঙ্গে গেছে বা ভেঙ্গে ফেলেছে। প্রধান ফটকটি অনেকটা ভাঙ্গা-অরক্ষিত।

এখানে রাতের অন্ধকারে চলে মাদক সেবন আর অনৈতিক কাজ। আর দিনের বেলাতে পরিণত হয় কলেজ পড়–য়া শিক্ষার্থী ও বহিরাগত প্রেমিক-প্রেমিকাদের আড্ডা। এখানে জুতো-পাদুকা পরে ছেলে-মেয়েদের ফটো-সেশনের স্থানে পরিণত হয়েছে।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর ভোরে মুন্সীগঞ্জ শহর ত্যাগ করলে এখানে ৩৬ জনের লাশ পাওয়া যায়। ১৯৭২ সালে এই জায়গাটি বদ্ধভূমি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়।
baddabhumuMunshigonj1
স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে শুরু থেকে এই স্মৃতিফলকে পুস্পার্ঘ নিবদেন করা হতো। পরে শহরের জুবলি রোডের পাশে বিজয় স্তম্ভ নির্মাণ হলে গত ১০ বছর স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে।

১৯৭১ সালের ৯ মে ২০০ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্য এক মেজরের নেতৃত্বে শহরে প্রবেশ করে হরগঙ্গা কলেজে ক্যাম্প স্থাপন করে। এই কলেজের তিনতলা বিশিষ্ট ছাত্রাবাসে পাকসেনারা থাকতো। বিভিন্ন জায়গা থেকে মুক্তিযোদ্ধা বা স্বাধীনতাকামী মানুষদের ধরে এনে এখানে নির্যাতন চালাতো। নির্যাতন শেষে তাদের গুলি করে হত্যা করার পর কলেজ ক্যাম্পাসের দক্ষিণ পূর্ব একটি গর্তের মধ্যে লাশগুলো ফেলা হতো।

প্রত্যক্ষদর্শী সরকারি হরগঙ্গা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর সুখেন চন্দ্র ব্যাণার্জী বলেন, একাত্তরে পাকিস্তানি সৈন্যরা যখন ক্যাম্প স্থাপন করতে এই কলেজে আসে তখন আমি এই কলেজের ছাত্রাবাসে থাকতাম। তখন এসব দৃশ্য দেখে চোখের জল ফেলা ছাড়া আমার আর কিছুই করার ছিল না। নিরুপায় ছিলাম।

শনাক্ত হয়নি এখনও সাতানিখীল ও পাঁচঘড়িয়াকান্দি বদ্ধভূমি:
baddabhumuMunshigonj2
মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার পাচঘড়িয়াকান্দি (চরশিলমন্ডি) ও কেওয়ার সাতানিখীল গ্রামের বদ্ধভূমি দুটি এখনো শনাক্ত করা হয়নি। এখানে এখন আর কোন স্মৃতিচিহ্ন না থাকায় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এই বদ্ধভূমিগুলো সংরক্ষণে এখন পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে কালের আবর্তে এগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে।

মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার কেওয়ার চৌধুরী বাড়ি পাকিস্তানি সেনারা ১৯৭১ সালের ১৩ মে দিবাগত রাত সাড়ে ৩ টায় ঘেরাও করে। ওই চৌধুরী বাড়ি থেকে ডা. সুরেন্দ্র চন্দ্র সাহা ও তার দুই ছেলে শিক্ষক সুনিল কুমার সাহা, দ্বিজেন্দ্র লাল সাহা এবং প্রফেসর সুরেস ভট্টাচার্য, শিক্ষক দেব প্রসাদ ভট্টাচার্য, পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর শচীন্দ্র নাথ মুখার্জীসহ ১৭ জন বুদ্ধিজীবীকে ধরে নিয়ে আসে এবং ১৪ মে সকাল ১০টায় কেওয়ার সাতানিখীল গ্রামের খালের পাড়ে নিয়ে চোঁখ বেঁধে ১৬ জনকে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে ফেলে রেখে যায়। আর ডা. সুরেন্দ্র চন্দ্র সাহাকে ধরে নিয়ে যায় শহরের হরগঙ্গা কলেজের পাক সেনাক্যাম্পে।

সেখানে নির্যাতনে পর কলেজের পিছনে পাচঘড়িয়াকান্দি (চর শিলমন্ডি) গ্রামের একটি বাগানবাড়ির গাছে ঝুলিয়ে ব্রাশফায়ার করে তাকে হত্যা করে পাকিস্তানি-নরপশুরা। এরপর ওই বাগানবাড়িতে আরো জানা-অজানা বুদ্ধিজীবীকে এনে হত্যা করে বলে জানা গেছে।

শহীদ ডা. সুরেন্দ্র চন্দ্র সাহার ছোট ছেলে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা সুভাষ চন্দ্র সাহা বলেন, মনে বড় কষ্ট। ৪৫ বছরে একটি ইটও গাথা হয়নি ওই বদ্ধভূমিগুলোতে। এটা আমাদের জেলাবাসীর চরম ব্যর্থতা এবং কষ্টদায়ক আরেকটি ইতিহাস হয়ে থাকবে।

আব্দুল্লাপুরের পালবাড়ি বদ্ধভূমিটির নামটি এখনো ইতিহাসের পাতায় স্থান পায়নি
পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণের রক্তাক্ত চিহ্ন বইছে এই মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার আব্দুল্লাহপুরের বাড়িটি। ইতিহাসের পাতায় এখনও স্থান পায়নি।

মুন্সীগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে টঙ্গীবাড়ী উপজেলার আব্দুল¬াহপুরের পালবাড়ি। এই পালবাড়িটি মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকসেনাদের আক্রমণের রক্তাক্ত স্মৃতি বইছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকসেনারা এক বৃষ্টিভেজা দিনে আক্রমণ চালিয়ে ওইবাড়ির মালিক ও আশ্রিতসহ ১৯ জনকে হত্যা করে।

বাড়ির মালিক অমূল্যধন পাল, তার ভাই মনরঞ্জন পাল, মিহির পালসহ আত্মীয়স্বজন ওই বাড়িতে ছিল। দিন-দুপুরে পাকসেনারা ওই বাড়ির দরজা ভেঙ্গে ভিতরে ঢুকে লুটপাট ও হত্যাসহ তা-বলীলা চালায়। পরে মৃত দেহগুলো বাড়ির পুকুরে পাড়ে ফেলে রেখে চলে যায়।

পালবাড়ির লোকজন তখন ওই এলাকার বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। বাংলাদেশের সর্ব-বৃহত বানিজ্যিক এলাকা মিরকাদিমে তাদের চালসহ বিভিন্ন দ্রব্যের আড়ৎ ছিল বলে জানা যায়। নারায়ণগঞ্জ জেলায়ও তাদের ব্যবসা ছিল। বর্তমানে শহীদ অমূল্যধন পালদের নাতিসহ তার আত্মীয় স্বজনরা ওই বাড়িতে বসবাস করছে।

দীর্ঘ প্রায় ২৮ বছর পর আব্দুল্লাপুর ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. শহীদ মোল্লা একটি স্মৃতি ফলক নির্মাণ করে পালবাড়ির পুকুর পাড়ে। ১৯৯৮ সালের মহান স্বাধীনতা দিবসে এই স্মৃতিস্তম্ভটি উদ্বোধন করেছিলেন প্রধান অতিথি হিসেবে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মুক্তিযোদ্ধা মো. লুৎফর রহমান। এর পর থেকে স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে ওই এলাকার স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, স্থানীয় নেতাকর্মী ও জনগণ এই স্মৃতিস্তম্ভের বেদিতে পুস্পার্ঘ নিবেদন করেন শহীদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে।

এই বদ্ধভূমিটির ইতিহাস সংরক্ষণ ও উন্নয়নে সরকারি পর্যায়ে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি বলে শহীদ অমূল্যধনের নাতি-নাতনিরা জানান। এই পালবাড়িতে পাকসেনাদের হত্যাকান্ড ঘটানোর বিস্তারিত তথ্য এখন কেউ বলতে পারে না। অনেকটা অজানা রয়ে গেছে এই বদ্ধভূমিটি। ইতিহাসের পাতায় এর স্থান হয়নি।

এ প্রসঙ্গে শহীদ অমূল্যধন পালের নাতি-নাতনিরা বলেন, আমার বয়স তখন ৫-৬ বছর হবে। ১৯৭১ সালে বৃষ্টির দিনে বর্ষা মৌসুমে দিনের বেলায় এই বাড়িতে পাকসেনারা আক্রমণ চালিয়ে আমার দাদাকে হত্যা করে। আব্দুল¬াহপুর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলেন, এখানে আমরা বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবসে শ্রদ্ধা নিবদেন করতে আসি। তবে বর্তমান সরকারের উচিত যদি তারা এ স্বাধীন দেশের সন্তান হয়ে থাকেন তাহলে তারা এ বদ্ধভূমিটির ইতিহাস সংরক্ষণ ও উন্নয়নের পদক্ষেপ নিবেন।

পূর্বপশ্চিম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.