৫০ ভাগ গার্মেন্টস শিল্প বন্ধ থাকায় লাখো পরিবার অনাহারে

শেখ মো. রতন: মুন্সীগঞ্জ জেলার প্রায় ৫০ ভাগ ক্ষুদ্র গার্মেন্টস শিল্প বন্ধ থাকায় লাখো পরিবার অনাহারে দিশেহারা হয়ে গেছে। ব্যাংক ঋনের স্বল্পতা, আকর্ষনীয় মৌলিক ডিজাইনের অভাব, বিপননে মধ্যস্বত্ত্বভোগী আড়ৎদারদের দৌরাত্ম্য এবং আনুষাঙ্গিক খরচ বৃদ্ধি পাওয়া এর অন্যতম কারন বলে সরেজমিনে জানা গেছে। ফলে এ শিল্পে কর্মরত প্রায় এক লাখ শ্রমজীবি মানুষের জীবন-জীবিকা বিপন্ন হয়ে উঠেছে।

সরেজমিনে আরো জানা গেছে, স্বাধীনতা উত্তর কালে দেশে উন্নত ডিজাইন ও সঠিক মানের তৈরি পোশাক আমদানি শুরু হয়। এর প্রধান ক্রেতা ছিল উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ।

নিম্ন আয়ের মানুষের চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রেখে মুন্সীগঞ্জের রামপাল, সিপাহীপাড়া ও দরগাহ বাড়ির কিছু উৎসাহী দর্জি নানা বয়সের ছেলে মেয়েদেও জন্য ফ্রক, সালোয়ার কামিজ, প্যান্ট ও শার্ট তৈরি শুরু করেন এবং সফল হন।

এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে সদর উপজেলার শাখাঁরীবাজার, সুজানগর, বল্লালবাড়ি, দেওভোগ, রতনপুর, পঞ্চসার, চম্পাতলা, এনায়েত নগর, কাজী কসবা গ্রামসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে ক্ষুদ্র গার্মেন্টস শিল্প গড়ে ওঠে। এতে আত্মকর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার উন্মোচিত হয়। এছাড়া স্বল্প পূজিঁতে নিজস্ব মেধা ও শ্রম ব্যবসায়িক সফলতার নিশ্চয়তা থাকায় অনেকেই ক্ষুদ্র গামের্ন্টস শিল্পে এগিয়ে আসে। ফলে এতদঞ্চলের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসে ব্যাপক ভাবে ।

উদাহরণ, এমন এক সময় ছিল ঈদ উল ফিতর, ঈদ উল আযহা ও দূর্গা পূজাকে সামনে রেখে উপরোক্ত এলাকার ক্ষুদ্র গামের্ন্টস শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের কর্মচাঞ্চল্য ছিল চোখে পড়ার মতো। এ সব গামেন্টর্সে তৈরী পোশাক যথাক্রমে-ফ্রক, সালোয়ার কামিজ, শার্ট ও প্যান্টের নিত্য নতুন ডিজাইন, পাকা রঙ ও তুলনামূলক কম দাম হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পোশাক ব্যবসায়ীরা তাদেও চাহিদা অনুযায়ী পোশাক সংগ্রহের জন্য মুন্সীগঞ্জে ভীড় জমে উঠতো।

এছাড়া মুন্সীগঞ্জে ক্ষুদ্র গামেন্টর্স ব্যবসায়ীদের অনেকেই তাদের তৈরী পোশাক রাজধানীর ঢাকার চকবাজার, কালীগঞ্জ, সদরঘাট এলাকাসহ নানা জায়গায় শোরুমে রেখে বিক্রি করতো। এক পর্যায়ে নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র পোশাক শিল্পের অস্তিত্ত্ব আজ বিলীন হতে চলেছে।
ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের দর্জিরা বর্তমানে ভারতীয় ডিজাইন অনুসরন করেন। অথচ ভারতীয় চটকদার পোশাক অনেক কম মূল্যে সহজলভ্য হওয়ায় এ দেশে উৎপাদিত পোশাক খুব একটা গ্রহনযোগ্যতা পায় না। এছাড়া বড় বড় পূজিঁর প্রতিষ্ঠান গুলো আড়তদারদের কাছে বিপুল পরিমান অর্থ দীর্ঘ সময় লগ্নি দিয়ে রাখে। অন্যদিকে স্বল্প পূজিঁর গার্মেন্টস মালিকরা আড়তদারদের এ সুবিধা দিতে ব্যর্থ হয়। যে কারনে পোশাকের আড়তদাররা ক্ষুদ্র গার্মেন্টসের তৈরী পোশাক কিনতে আগ্রহ দেখায় না। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে তার কারখানা বিক্রি করে দিয়ে বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন। কেউ কেউ ব্যবসার পূজিঁ ভেঙ্গে নিদারুন কষ্টে মানবেতর জীবন-জিবিকা নির্বাহ করছেন। এরই মধ্যে অনেকেই ভিন্ন পেশা বেছে নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থায় উচ্চ বেতনে ডিজাইনার কর্মরত আছেন। এদের কাজ হলো নিত্যনতুন ডিজাইন উদ্ভাবন করে দেশীয় পণ্যের উৎকর্ষ সাধন করা এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে দেশীয় পন্য টিকিয়ে রাখা। অথচ ক্ষুদ্র গার্মেন্টস শিল্পে এদের কোন ভুমিকা নেই। সচেতন মহলের মতে, বিভিন্ন এনজিও ও সরকারি সংস্থা সহজ শর্তে বিভিন্ন উৎসবের আগে স্বল্পতম সময়ের জন্য ঋন বরাদ্ধ করে এবং উন্নত যুগোপযোগী প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা হয় তাহলেই ক্ষুদ্র পোশাক শিল্পের এ খাতটি ধংসের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে।

এ প্রসঙ্গে মুন্সীগঞ্জ শহরের উপকন্ঠ মুক্তারপুর বিসিক শিল্প নগরীর উপ-ব্যবস্থাপক এস এম গোলাম ফারুক সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, আর্থিক সঙ্কটের কারনে গার্মেন্টস শিল্পগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তবে এ পর্যন্ত কি পরিমানের ক্ষদ্র গার্মেন্টস বন্ধ হয়েছে তা নিরূপন করা হয়নি। এ শিল্পকে বাচিঁয়ে রাখতে এ পর্যন্ত ২০ থেকে ২৫টি পরিবারকে ঋন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এ শিল্পের মালিকরা দরিদ্র হওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে খুবই কষ্ট সাধ্য হয়ে পরেছে।

টাইমটাচনিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.