মোল্লাকান্দিতে ভয়াবহ নির্বাচনী সহিংসতার আশংকা

আব্দুস সালাম: মুন্সীগঞ্জের চরাঞ্চল মোল্লাকান্দি ইউনিয়নে ভয়াবহতম নির্বাচনী সহিংসতার আশংকা করছেন সাধারণ ভোটাররা। গ্রামবাসীদের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে। উদ্বেগ আর উৎকন্ঠায় নির্ঘুম রাত পার করছেন তারা। ইতিমধ্যে গত ২মে শত শত ককটেল ফাটিয়ে চরডুমুরিয়া ও রাজারচর এলাকায় ত্রাসের সৃষ্টি করে সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় প্রায় ২০ জন আহত হয়। পুলিশের উপরও এসময় ককটেল চার্জ করা হয়েছে।

আগামী ২৮ মে পঞ্চম ধাপের নির্বাচনে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন এবং সদরের ৬টিসহ মোট ১৪টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ চরাঞ্চলের মোল্লাকান্দি ইউনিয়ন। এছাড়া গজারিয়া উপজেলার ইমামপুর, বালুয়াকান্দি ও ভবেরচরসহ একাধিক ইউনিয়ন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

মোল্লাকান্দি ইউনিয়নে আওয়ামীলীগের একাধিক প্রার্থী থাকায় এখানে ভয়াবহ সংঘর্ষের আশংকা করছেন সাধারণ ভোটাররা। সরেজমিনে তার প্রমাণও পাওয়া গেছে। সম্প্রতি এ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামগুলো ঘুরে দেখা গেছে, আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী রিপন হোসেন এর নেতা-কর্মীদের ঘায়েল করতে রণসাজে সজ্জিত হয়ে ক্ষেতের মাঝখানে বালতি ভর্তি ককটেল নিয়ে বসে আছে সন্ত্রাসীরা। মহিলারাও সংঘর্ষের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রামে মওজুদ করা হয়েছে অত্যাধুনিক বিদেশী অস্ত্র। পুলিশ মোতায়েন ছিল। মুন্সীগঞ্জ সদর থানা পুলিশের এস.আই সৈকত জানান, গত ২মে তাদের উপরও ককটেল চার্জ করা হয়। অল্পের জন্য মারাত্মক ক্ষতির থেকে বেঁচে যান পুলিশ বাহিনীর একটি টহল দল। ঘটনার পর্যবেক্ষণে ক্ষেতের দিকে উঁকিঝুঁকি মারছিলেন। কেন উঁকিঝুঁকি মারছিলেন তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি। সেদিন ক্ষেতের মাঝখানে বালতি ভরা ককটেল নিয়ে হামলার অপেক্ষা করতে দেখেছি। এস.আই সৈকত তাদেরকে দেখিয়ে দিলেন। বললেন, ঘরে বাইরে সবাই প্রস্তুত। হামলা আর সংঘর্ষ এড়াতে আমরাও প্রস্তুত। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে ঘটনাস্থলে গিয়েছেন র‌্যাব-১১ দল। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা’র লোকজনের উপস্থিতি দেখা গেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা আর সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে সেদিন আর হামলার ঘটনা ঘটেনি। এদিকে, একই সময় বর্তমান চেয়ারম্যান রিপন হোসেন এর লোকজনকে দেখা গেছে চরডুমুরিয়া বাজারে। উৎকন্ঠা আর হামলা প্রতিহত করার সমস্ত পরিকল্পনা নিয়ে রেখেছিলেন।

তবে, প্রতিদিনই খবর আসছে যেকোন মূহুর্তে সংঘর্ষ অনিবার্য। ভোটকেন্দ্র দখল করে চরাঞ্চলের যে নির্বাচন পদ্ধতি তা বহাল রাখতে বদ্ধপরিকর আওয়ামীলীগের বিদ্রোহীরা। মাকহাটি বাজারে গিয়ে বিদ্রোহী গ্রুপের এক স্থানীয় নেতার সাথে কথা বলে তারই আবাস মিলেছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে এলাকা নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে মরিয়া প্রার্থীদের নেতা-কর্মী-সমর্থকরা। পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের জরো করা হয়েছে।

আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী রিপন হোসেন তাদের নির্বাচনী প্রচারণা জোরদারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এলাকায় নিজেদের নেতা-কর্মী সমর্থকদের রক্ষা করতে পাহাড়া বসিয়েছেন। যেকোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় তারাও প্রস্তুত হয়ে আছেন। তাছাড়া চরাঞ্চলের এই ইউনিয়নে বছরব্যাপী শত শত সংঘর্ষের খবর পত্রিকার শিরোনাম হয়ে থাকে। যেকোন নির্বাচন আসলেই এ অঞ্চলে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠে। সরকার দলীয় দল-উপদল, সরকারী দল- বিরোধীদল, গোষ্ঠীগত সংঘর্ষ লেগেই আছে। তবে, এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বেশীরভাগ সংষর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, বাড়িঘর লুটপাট এবং হতাহতের ঘটনা ঘটে। গ্রামছাড়া হয়ে বাহিরে থাকা স্বাভাবিক ঘটনা বলে মনে করে এ অঞ্চলের মানুষ। থানায় মামলা হয়। গ্রেফতার হয়। তারপরও থেমে নেই সংঘর্ষ। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতিমধ্যে বিবাদমান সরকার দলীয় দুই গ্রুপের সংঘাত-সংঘর্ষ শুরু হয়ে গেছে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে তাদের উপরও ককটেল চার্জ করা হয়েছে।

ইউপি নির্বাচনে মোল্লাকান্দি ইউনিয়নে এবার আওয়ামীলীগ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন মো: রিপন হোসেন। তিনি বর্তমান চেয়ারম্যান। এছাড়া আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন দুইজন। মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহ আলম মল্লিক ও তার ভাগ্নি স্বতন্ত্র প্রার্থী মহসিনা কল্পনা।

স্থানীয় ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান চেয়ারম্যান রিপন হোসেন এর সমর্থক অধ্যুষিত গ্রাম আমঘাটা, চরডুমুরিয়া, কংসপুরা, চৈতারচর, নতুন আমঘাটা, মাকহাটি ও মহেষপুর হামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিদ্রোহী গ্রুপের লোকজন। মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের মহেষপুর গ্রামের কাশেম সরকারের ছেলে জাহাঙ্গীর, পূর্ব মাকহাটি গ্রামের বারেক মল্লিকের ছেলে মিল্টন, রাজারচর গ্রামের মৃত.রশিদ বেপারীর ছেলে আল-আমিন একই গ্রামের নিজাম উদ্দিন শিকদারের ছেলে জুয়েল ও মধ্য মাকহাটি গ্রামের মৃত. ছেনু বেপারীর ছেলে আমিরের নেতৃত্বে পূর্ব মাকহাটির শাহাবুদ্দিনের ছেলে শাহীন, গনি মল্লিকের ছেলে লিমন, বারেক মোল্লার ছেলে ইব্রাহীম মল্লিক, আলী মোল্লার ছেলে ইউনুছ, শাহাবুদ্দিনের ছেলে শাহ আলম, মহেষপুর গ্রামের ছাত্তার ভূঁইয়ার ছেলে পারভেজ, জুলহাস মিজির ছেলে পলাশ ও মাছুম, বাচ্চু মিজির ছেলে শাকিল, মধ্য মাকহাটির মৃত কালাই সরকারের ছেলে কামাল, আতাউর মল্লিকের ছেলে শাহীন, মোস্তফা মাঝির ছেলে জাহাঙ্গীর মাঝি, মৃত কালাই সরকারের ছেলে আরিফ, লিটন মল্লিকের ছেলে সজীব, লিটন মাঝির ছেলে আরিফ, কংসপুরা গ্রামের আব্দুর রব এর ছেলে দিলদার, নতুন আমঘাটার মৃত.গণি বেপারীর ছেলে ফারেজ ও জালাল বেপারী, সুফিয়ান বেপারীর ছেলে আনু , আমঘাটা গ্রামের মৃত. নুরু খালাসীর ছেলে নাসির খালাসি, মৃত. দৌলত খাঁ’র ছেলে সোহেল খাঁ সহযোগিতায় সংশ্লিষ্ট গ্রামগুলোতে অস্ত্র ভান্ডার গড়ে তোলা হয়েছে। হাজার হাজার ককটেল তৈরী করা হয়েছে। বর্তমান চেয়ারম্যান রিপন হোসেন এর লোকজন এবং সাধারণ ভোটারদের প্রতিনিয়ত গ্রামছাড়া করার হুমকি আর মৃত্যুর ভয় দেখানো হচ্ছে।

সহিংসতার বিষয়ে বর্তমান চেয়ারম্যান আলহাজ্ব রিপন হোসেন জানান, স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহ আলম মল্লিক ও মহসিনা কল্পনা তাদের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী নিয়ে সাধারণ ভোটারদের হুমকি-ধমকি দিয়ে বেড়াচ্ছে। আমি একাধিক সূত্রে জানতে পেরেছি, মোল্লাকান্দিতে যেকোন সময় রক্তক্ষয়ী সংষর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে। এ বিষয়ে তিনি পুলিশের বিভিন্ন বিভাগে চিঠি দিয়ে অবগত করেছেন বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ব শেখ হাসিনা আমাকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দিয়েছেন। নৌকা মার্কা প্রতীক দিয়েছেন। আমি জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকতে যেকোন পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে প্রস্তুত।

তবে, এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য দিতে রাজী হননি মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহ আলম মল্লিক ও তার ভাগ্নি স্বতন্ত্র প্রার্থী মহসিনা কল্পনা।

ক্রাইম ভিশন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.