পাতক্ষীরশা এখনো সমান জনপ্রিয়

পাতক্ষীরশা মুন্সিগঞ্জের বিখ্যাত খাবার। লোকমুখে শোনা যায়, এটি জেলার শতবর্ষী পুরোনো খাবার। বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থ ঘেঁটে এ কথার সত্যতা না মিললেও স্থানীয় লোকজনের মধ্যে এ খাবারের জনপ্রিয়তার কমতি নেই।

মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলা সদরের সন্তোষপাড়া গ্রামের প্রয়াত ইন্দ্রমোহন ঘোষের স্ত্রী রাজলক্ষ্মী ঘোষ প্রথম পাতক্ষীরশা তৈরি করেন। বর্তমানে তাঁদের বংশধর শরৎ ঘোষ, খোকন ঘোষ, জাদব ঘোষ ও মাধব ঘোষ পাতক্ষীরশা তৈরির পেশায় যুক্ত রয়েছেন। উপজেলার অন্য অনেক দোকানেও তৈরি হচ্ছে সিরাজদিখানের পাতক্ষীরশা।

পাতক্ষীরশা তৈরির প্রক্রিয়া হিসেবে সুনীল ঘোষের স্ত্রী নয়নতারা ঘোষ বলেন, একটি পাতক্ষীরশা বানাতে প্রায় তিন লিটার দুধের প্রয়োজন হয়। একটি পাতিলে দুধ ঢেলে অনেকক্ষণ জ্বাল দিতে হয়। জ্বাল দেওয়ার সময় কাঠের তৈরি হাতা (চামচ) দিয়ে নাড়তে হয় যাতে পাতিলের তলায় দুধ লেগে না যায়। এরপর দুধ ঘন হয়ে এলে সামান্য পরিমাণে হলুদ ও চিনি মিশিয়ে চুলা থেকে নামানো হয়। চুলা থেকে নামানোর পর মাটির পাতিলে রেখে ঠান্ডা করা হয়। এরপর কলার পাতায় মুড়িয়ে পাতক্ষীরশা বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়।

খোকন ঘোষের স্ত্রী পারুল ঘোষ দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের দোকানের জন্য বাড়িতে পাতক্ষীরশা ও দই তৈরি করছেন। তিনি বলেন, ‘প্রথম থেকেই আমাদের বাড়িতে পাতক্ষীরশা বানানো হয়। দোকানের কর্মচারীরা বাড়ি থেকে সেগুলো দোকানে নিয়ে যান।’ এ ছাড়া কেউ যদি চিনি ছাড়া পাতক্ষীরশা খেতে চান, সে ক্ষেত্রে চিনি মেশানো হয় না বলে জানান পারুল।

প্রতিদিন ২০-২৫টির মতো পাতক্ষীরশা তৈরি করেন খোকন ঘোষ। একটি পাতক্ষীরশার ওজন আধা কেজি। দুধের দামের ওপর এই খাবারটির দামের পার্থক্য হয়ে থাকে। একটি (স্থানীয়দের ভাষায় এক পাতা) পাতক্ষীরশার দাম ২৫০ টাকা। তবে কেজি ৪৫০ টাকা।

স্থানীয় লোকজন বলেন, পাতক্ষীরশার চাহিদা শীতের মৌসুমে বেড়ে যায়। বিভিন্ন ধরনের পিঠা তৈরিতে পাতক্ষীরশা ব্যবহার করা হয়। সিরাজদিখান বাজারে কথা হচ্ছিল স্থানীয় বাসিন্দা বিপ্লব হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, এলাকায় পাতক্ষীরশা খুবই জনপ্রিয়। আপনি সর্বনিম্ন কত টাকা দামে পাতাক্ষীরশা খেয়েছেন? জানতে চাইলে বিপ্লব বলেন, ‘যত দূর মনে পড়ে ১ পাতা ৬০ টাকায় খাইছি।’

সিরাজদিখান উপজেলা সদরের অন্যান্য মিষ্টির দোকানেও পাতক্ষীরশা তৈরি করা হয়। এমন কয়েকটি দোকানের মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের কারিগরেরা দোকানেই পাতক্ষীরশা বানিয়ে থাকেন। এখন চাহিদা কম থাকায় দিনে ১০ থেকে ১৫টির মতো পাতক্ষীরশা বানান তাঁরা।

মুন্সিগঞ্জ ও এর আশপাশের এলাকার যেসব লোক বিদেশে থাকেন, তাঁরা সেসব দেশেও পাতক্ষীরশাকে পরিচিত করেছেন। অনেকে বিভিন্ন সময় বিদেশে অবস্থানরত স্বজনদের জন্য পাতক্ষীরশা নিয়ে যান। এ বিষয়ে অমল ঘোষ বলেন, ‘আমগো এলাকার কেউ বিদেশে গেলে হেগো আত্মীয়ের লাইগা পাতক্ষীরশা নিয়া যায়।’
গত বুধবার ফেরার সময় সুনীল ঘোষের দোকানে একজন ক্রেতাকে একটি পাতক্ষীরশা চাইতে দেখা গেল। তখন দোকানের মালিক ফ্রিজ খুলে একটি পাতক্ষীরশা নেড়েচেড়ে দেখে বললেন, ‘বিকালে আইসেন। এইটা বাসি, ভালো হইবো না।’

লিংকন মো. লুৎফরজামান সরকার
প্রথম আলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.