খাল খননের নামে বালু লুট!

বাড়িঘর ও ফসলি জমি হুমকির মুখে
মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল: তালতলা-গৌরগঞ্জ (ডহরী) খাল খননের নামে চলছে লুটপাট! বাংলার সুয়েজ খাল নামে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী এ খালে নাব্য ফিরিয়ে আনতে বিআইডব্লিউটিএ ২০ কোটি টাকার টেন্ডার দিয়েছে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এর একাংশের ঠিকাদার খনন তো দূরের কথা, উল্টো ব্যবসা খুলে বসেছে। খালের আশপাশের জমি ও বাড়ি কেটে সাবাড় করে, তা বিক্রি করছে বালুর জাহাজ বাল্কহেডে করে। খাল খননের পরিবর্তে যেখানে বালু পাওয়া যাচ্ছে সেখানেই ছোট ছোট ড্রেজার লাগিয়ে সাধারণের জমিজমা কেটে বালু লুট করা হচ্ছে। এতে দেখা দিয়েছে ভাঙ্গন। অথচ টেন্ডারের সিডিউলে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে- খাল খননের মাটি-বালু ১৫শ’ মিটার পর্যন্ত জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান ভরাট বা পাশে সুবিধাজনক স্থানে রাখা। সরকারের কোষাগারে রয়েলিটি জমা দিয়ে আশপাশের ব্যক্তি মালিকানা সম্পতিতে নেয়ারও বিধান রয়েছে। কিন্তু এভাবে বিক্রির কোন বিধান না থাকা সত্ত্বেও নৌমন্ত্রীর ভাই পরিচয়ে হরিলুট চালাচ্ছে ঠিকাদার। তবে ঠিকাদার বাচ্চু খান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বালু কেটে রাখব কোথায়? তাই মসজিদ, মাদ্রাসা এবং যে যেখানে চাচ্ছে বালু দেয়া হচ্ছে। এক লোক কবরস্থান বানানোর কথা বলেছেন- সেখানেও চার কোটি ফুট বালু দেয়া হয়েছে। বালু রাখার জায়গা তো নেই। আর পোলাপানরা কে কী করে ওদিকে তাকাইও না। গেল কাইল বালু বিক্রির তিন হাজার টাকা আসছে বিকাশে। আমি ওই টাকা নেই নাই, পোলাপানগোই ফিরাই দিছি।’ মন্ত্রীর ভাই হিসেবে অতিরিক্ত সুবিধা নেয়া প্রসঙ্গে বাচ্চু খান বলেন, ‘এটা কেউ বলতে পারবে না। ডহরী খালের এ কাজটাও আমি অন্য কন্ট্রাক্টরের কাছ থেইকা এক কোটি টাকায় কিনে নিছি। ২০ বছর ধরে এই লাইনে কাজ করি। কেউ বলতে পারবে না কোথাও ভাইয়ের প্রভাব দেখাইছি।’অপরিকল্পিতভাবে এ বালু উত্তোলনে বাড়িঘর ও ফসলি জমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এ ভাঙ্গনরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা এলাকা পরিদর্শন করে বিস্মিত হয়েছেন। প্রকৌশলীরা বলেন, খালটির মুখে সামুরবাড়িতে ৩০-৪০ ফুট যথাযথভাবে কেটে দিলে ওই ভাঙ্গন বন্ধ হয়ে যায় এবং খালের গতিও ঠিক থাকে।

এলাকাবাসী জানান, কিন্তু তা না করে তীর, ফসলি জমি ও বাড়ি কেটে নেয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। কারণ বিআইডব্লিউটিএ হচ্ছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিষ্ঠান। তাই মন্ত্রীর ভাই ঠিকাদার বাচ্চু খানকে খুশি করতে লোপাটে কোন বাধা নেই। বিআইডব্লিউটিএর এ নির্লিপ্ততার কারণে বাড়িঘর ও ফসলি জমি হারাতে বসেছে সাধারণ মানুষ। তাই বাধ্য হয়ে মন্ত্রণালয়ের পানি উন্নয়ন বোর্ড নদী ভাঙ্গন রোধে এখন প্রকল্প নিতে বাধ্য হচ্ছে। এতে জনসাধারণ এবং সরকারের ক্ষতি আরও বাড়ছে। অপরিকল্পিত এ বালু উত্তোলনে গত কয়েক দিনের ভাঙ্গনে বিলীন হয়েছে- সামুরবাড়ির শাহিন ফকির, সেন্টু ফকির, মনির শেখ, আবুল হোসেন হাওলাদার, লতিফ শিকদার, আবুল হোসেন শিকদারের বাড়ির একাংশ। বালুখোররা কেটে নিয়েছে হাড়িদিয়া গ্রামের হালিম শিকদার ও সারোয়ার শিকদারের ফসলি জমি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আমজাদ হোসেন এবং উপসহকারী প্রকৌশলী রকিবুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল আউয়াল মিয়া সোমবার জনকণ্ঠকে জানান, ভাঙ্গন রোধে জরুরীভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যেই কোটি টাকার টেন্ডার করা হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা যায়, খালটির সামুরবাড়ি মুখ থেকে (ডহরী-গৌরগঞ্জ) উত্তরদিকে তালতলা হয়ে মিরকাদিম লঞ্চঘাট পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার খননের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এ ১৮ কিলোমিটার তিনটি প্যাকেজে টেন্ডার করা হয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণাংশের সামুরবাড়ি থেকে সুবচনী পর্যন্ত ছয় কিলোমিটারের কাজটি নিয়েছেন মন্ত্রীর ভাই বাচ্চু খান। এটির প্রাক্কলন ব্যয় বাকি দুটির চেয়ে বেশি। প্রায় সাত কোটি টাকা।

ভুক্তভোগী এলাকাবাসী শেখ আসলাম জানান, অন্য দুটি প্যাকেজে কিছু খনন হচ্ছে কিন্তু এই প্রান্তে অভিযোগের ইয়ত্তা নেই। গত মাসতিনেক ধরে কাজ শুরু করে ডহরী কুদ অফিস পর্যন্ত মাত্র পৌনে এক কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত কেটে চলেছে। ছোট ড্রেজার দিয়ে ঘুরেফিরে এ এলাকায়ই লুটপাট চলছে।

সামুরবাড়ির বাসিন্দা ইউনুচ ব্যাপারী বলেন, ‘বিআইডব্লিউটিএ সীমানা নির্ধারণ করে দিলেও তার ধারেপাশেও নেই, যেখানে বালু পাচ্ছে সেখানেই কাটা হচ্ছে। নেই খাল খননের আলামত। তিনি বলেন, খননের নামে রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে টাকা নিচ্ছে, আর খনন না করে মানুষের জমির বালু বেচে এর চেয়ে বেশি কামাই করছে, চারিদিকেই লাভ। অন্যদিকে মানুষ উপকারের পরিবর্তে সর্বস্ব হারাচ্ছে। এ যেন কারও পৌষ মাস আর কারও সর্বনাশ অবস্থা।

এ অংশের বাইরেও নানাভাবে বালু লুটের ঘটনা চলছে। খালটির সিরাজদিখান উপজেলার নাটেশ্বর গ্রামের কাছে আলমগীর মোল্লা মাটি লুট করে নিচ্ছে। এতে ভাঙ্গন সৃষ্টি হচ্ছে। সুবচনীর আলেয়া হিমাগারের কাছেও অপরিকল্পিতভাবে বালু লুট হচ্ছে। কাইচ্চাইল গ্রামে বাবু হালদারও বালু লুটে নিচ্ছে। টঙ্গীবাড়ি, লৌহজং ও সিরাজদিখান উপজেলার অন্তর্ভুক্ত অন্তত ১৫টি পয়েন্টে অপরিকল্পিতভাবে এরকম অবৈধভাবে বালু লুট করে নেয়া হচ্ছে। এতে খালের তীরের নিরীহ মানুষ ভাঙ্গন আতঙ্কে রয়েছে।

বালিগাঁও বাসিন্দা সাইদুর রহমান জানান, খাল খননের নামে ব্যবহার করা হচ্ছে বালু ব্যবসায়ীদের ছোট ছোট ড্রেজার। এর আগেও যতবারই এ খাল খনন হয়, ততবারই বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজার ব্যবহার করা হয়; কিন্তু ব্যতিক্রম এবার। বালুর জাহাজ বাল্কহেড ব্যবহার করে কাটা বালু বিক্রি করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে বিআইডব্লিউটিএর উপসহকারী প্রকৌশলী কামাল পাশা জানান, ড্রেজারের বিষয়টি ঠিকাদারদের নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি। আর খননের বালু আশপাশে ফ্রি দেয়ার বিধান ছাড়াও বিক্রি করার বিধানও রয়েছে। তবে এ বিক্রীত অর্থ বিআইডব্লিউটিএর মাধ্যমে সরকারী কোষাগারে জমা হবে। তবে এ পর্যন্ত বিক্রীত বালুর কী পরিমাণ অর্থ সরকারী কোষাগারে জমা হয়েছেÑ এ প্রশ্ন এড়িয়ে যান। কাজের তদারকির দায়িত্বে পাশা জানান, মন্ত্রীর ভাই বলে বাচ্চু খানকে বাড়তি কোন সুবিধা দেয়া হয়নি।

১২ নৌপথ প্রকল্পের আওতায় মিরকাদিম-তালতলা-ডহরী খালের খনন কাজ চলছে। এটির প্রকল্প পরিচালক তারিকুল হাসান জানান, কবরস্থান, স্কুল, ঈদগাঁসহ জনকল্যাণমূলক কোন প্রতিষ্ঠান ছাড়া ড্রেজিংয়ের বালু-মাটি বিনাপয়সায় কাউকে দেয়ার বিধান নেই। আশপাশের কেউ খননের বালু নেয়ার আগ্রহী হলে আগে সরকারের কোষাগারে রয়েলিটি জমা দিতে হবে। তবে ঠিকাদারের খাল খননের পরিবর্তে তীর, ফসলি জমি ও বাড়ি কেটে বালু উত্তোলন এবং বালুর জাহাজে করে বিক্রি করে দেয়ার বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান।

জনকন্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.