এ কে খন্দকারের ভিমরতি হয়েছে: মোহাম্মদ মহিউদ্দিন

মুন্সিগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন। মুন্সিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। পাকিস্তান পর্বের শেষ তিন বছর আওয়ামী লীগের হয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখতেন। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমে প্রধানমন্ত্রী, পরে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তার সরকারি দায়িত্ব পান। প্রায় সাত বছর বঙ্গবন্ধুকে খুব কাছে থেকে দেখেছেন। সেই সময়ের অনেক কথা তিনি ১০ আগস্ট ঢাকাটাইমসকে অকপটে বলেছেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত জীবনের নতুন কিছু দিক উন্মোচন করেছেন। আজ সাক্ষাৎকারের প্রথম কিস্তি ছাপা হলো। মুন্সিগঞ্জ গিয়ে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তায়েব মিল্লাত হোসেন।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রথম দেখা কিভাবে?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : আমি যখন স্কুলছাত্র তখন একবার ময়মনসিংহ গিয়েছিলাম। আমার ভগ্নিপতি এম আর খান সাহেব সেখানে থাকতেন। ওই সময়ে বঙ্গবন্ধু জনসভা করতে সেখানে এসেছিলেন। আমি ছোটবেলা থেকেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধুর ভক্ত। তাই সেই জনসভায় ছুটে যাই। ওখানেই প্রথম বঙ্গবন্ধুকে সচক্ষে দেখলাম। তারও কয়েক বছর পরে ১৯৬৬ সালের দিকে বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ছয় দফা দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। এই জন্য বঙ্গবন্ধুকে জেলে দেয়। পর্যায়ক্রমে আরও অনেক জাতীয় নেতাকে আটক করে জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এ পর্যায়ে আন্দোলন কিছুটা থেমে যায়। আমি তখন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র। ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত। আমাদের নেতা ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ ও সিরাজুল আলম খান। আন্দোলন-সংগ্রাম নিয়ে পরামর্শ করতে প্রায়ই তারা রাজবন্দি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে জেলখানায় যেতেন। তাদের কাছেই কোনো কারণে ছয় দফার আন্দোলনে আমার সক্রিয়তার কথা জানতে পারেন বঙ্গবন্ধু। আমাকে একদিন নিয়ে যেতে বললেন। নেতারা আমাকে নিয়ে গেলেন রাজবন্দি বঙ্গবন্ধুর কাছে। নেতাদের সঙ্গে আলোচনার ফাঁকেই বঙ্গবন্ধু আমাকে লক্ষ্য করে কিছু কথা বললেন। কিছু পরামর্শ দিলেন। তাঁর আচরণে-উপদেশে বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমার ভক্তি-শ্রদ্ধা আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হলেন কখন?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : ১৯৬৬ সালের ছয় দফার পর কয়েক বছর গেল। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হলো। ১৯৬৯ সালে ১১ দফা প্রণয়নের মাধ্যমে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়, উত্তাল আন্দোলন শুরু হয়। গণঅভ্যুত্থানে আইয়ুব খান পদত্যাগে বাধ্য হলেন। জনরোষের কারণে বঙ্গবন্ধুর মামলা প্রত্যাহার করা হয়, তিনি মুক্তিলাভ করেন। এসব আন্দোলনে আমি সক্রিয় ছিলাম।

জেল থেকে বের হওয়ার পর থেকেই বঙ্গবন্ধু আমাকে তাঁর কাছে রেখে দেন। তখন যদিও ইকবাল হলে থাকি (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল)। তবে মিছিল-মিটিংয়ে বঙ্গবন্ধুর পাশেপাশেই থাকতাম। ১৯৭০-এর নির্বাচনি প্রচারণায় সারা দেশে, বিভিন্ন জেলায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গিয়েছি। আমি ওনার সঙ্গেই থাকতাম। যেখানেই যেতেন আমাকে নিয়ে যেতেন। এই সময়ে কর্মতৎপরতা বেড়ে গেলে বঙ্গবন্ধু আমাকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসভবনে নিচের তলায় একটি রুমে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। তখন থেকেই ৩২ নম্বরের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যাই। তখন থেকেই আমি বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তার বিষয়গুলো দেখতাম।

ঐতিহাসিক সাতই মার্চের ভাষণের মঞ্চে বঙ্গবন্ধুর ঠিক পেছনেই আপনাকে দেখা যায়। এ বিষয়টি কেমন লাগে?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব আসলে তখন বুঝতে পারিনি। বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিচ্ছেন, আমি পেছনে দাঁড়িয়ে শুনছি। তাঁর কথাগুলোর দিকেই আমার মনোযোগ ছিল। ভাষণের সময় তিনি অনর্গল কথা বলছেন। ভবিষ্যতের দিনগুলোয় কী করতে হবে, তিনি আজই তা বলে দিচ্ছেন। আমার মনে হলো উনি মানুষ নন, স্বর্গীয় কোনো দেবতা এসব কথা বলছেন। তিনি জনতার উদ্দেশে বললেন… ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। … আমি যদি হুকুম দিবার না পারি…’ পরে কিন্তু এই ভবিষ্যদ্বাণীই বাস্তব হয়েছিল।

এত কাছে থেকে এই ভাষণ শোনার গুরুত্ব ও গভীরতা বুঝতে আমার কয়েক বছর সময় লেগেছে। এখন সাতই মার্চ সম্পর্কে জানতে গবেষকরা, সাংবাদিকরা আমার কাছে আসে। লোকজন বলে, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের ইতিহাস, আপনি তার সাক্ষী।

এ কে খন্দকারের ভিমরতি হয়েছে: মোহাম্মদ মহিউদ্দিন

কেউ কেউ বলতে চান, সাতই মার্চের ভাষণ কোনো নেতা, কোনো ছাত্রনেতা লিখে দিয়েছেন, পরামর্শ দিয়েছেন, এ বিষয়ে কী বলবেন?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলন চলছে, চারদিকে উত্তপ্ত পরিবেশ। সকলের দৃষ্টি বঙ্গবন্ধুর দিকে। সাতই মার্চ নেতা বাঙালি জাতিকে দিকনির্দেশনা দিবেন। সকাল থেকে তিনি বাসায় স্বাভাবিক অবস্থায় থাকলেও পায়চারি করছিলেন। তিনটার দিকে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিতে যাবেন। তার আগ মুহূর্তে প্রথম সারির কয়েকজন ছাত্রনেতা বঙ্গবন্ধু ভাষণে কী বলবেন, তা নিয়ে পরামর্শ করতে এসেছিলেন। সিরাজুল আলম খানও ছিলেন। নেতা ভাষণে কী বলবেন এ বিষয়ে তিনি এটাসেটা বলছিলেন। তিনি বললেন, আপনি আজকে স্বাধীনতা ডিক্লেয়ার করে দেন। একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু তাকে ধমক দিয়ে বললেন,‘Leave it to me’। বঙ্গবন্ধু যদি কারও বুদ্ধি-পরামর্শ নিয়ে ভাষণ দিতেন তাহলে এভাবে ধমক দিতেন না।

সাতই মার্চের ভাষণ নিয়ে গত কয়েক বছর অনেক বিতর্ক হলো। এ নিয়ে কী বলবেন?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : বিএনপি আমাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি ছড়াতে চায়, অনেক মিথ্যাচার করে। কিন্তু এ কে খন্দকার কেন অবান্তর কথা বললেন, তা আমার মাথায় আসে না। তিনি বিএনপির অবস্থানে কেন, আসলে তার ভিমরতি হয়েছে। সাতই মার্চের ভাষণ পুরো রেকর্ড আছে, তা শুনলেই সব পরিষ্কার হয়ে যায়। ভাষণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমি পেছনে ছিলাম। সেখানে ‘জয় পাকিস্তান’ বা ‘জিয়ে পাকিস্তান’ এমন কোনো কিছু ছিল না। ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাংলার মানুষের প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের ২৩ বছরের অত্যাচার-জুলুম, বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেছেন। এরপর আবার তিনি পাকিস্তানের জয়গান কেন গাইবেন?

২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারের সময় আপনি কোথায় ছিলেন?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : ২৫ মার্চ রাতে আমি বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়িতেই ছিলাম। সন্ধ্যার দিকে বাসায় উপস্থিত লোকদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘বাসায় যে কোনো সময় পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করতে পারে। তোমরা এখানে থেকো না।’ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মতো সব কর্মী নিজ নিজ বাসায় চলে গেল। আমি ও বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী হাজী গোলাম মোরশেদ বাড়িতে থেকে গেলাম। বঙ্গবন্ধু আবার আমাদের বললেন, ‘আমার সঙ্গে মরে লাভ কী? বাইরে থাকলে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেশকে মুক্ত করতে পারবে।’

তবু আমরা দুজন থেকে গেলাম। বাসার নিচতলায় অফিস রুমে আমরা বসেছিলাম। বিভিন্ন স্থান থেকে ফোন আসছে। লোকজন জানতে চাইছে বঙ্গবন্ধু কোথায়, কী অবস্থায় আছেন? রাত ১২টার দিকে শেষ ফোন এলো। আমিই ফোন ধরলাম। প্রফেসর ডা. বি. চৌধুরীর বাবা মো. কফিলউদ্দিন চৌধুরী সাহেব ফোনে জানতে চাইলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর কি অবস্থা?’ আমি বললাম,‘বঙ্গবন্ধু বাসায় আছেন।’ এই কথা শুনে তিনি বললেন, ‘জানতে পারলাম বঙ্গবন্ধুর বাসায় হামলা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাহলে কী এসব মিথ্যা কথা?’ তার কথার সময়েই বাইরে গাড়ি ও গুলির শব্দ শোনা গেল। লোকজনেরও চিৎকার শুনতে পেলাম।

‘বাড়িতে হামলা শুরু হয়ে গেছে’- এ কথা বলেই আমি ফোন রেখে দিলাম। দোতলায় গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে জানালাম পাকিস্তানি বাহিনি এসেছে। এই খবর দিয়ে নিচে নামার সঙ্গে সঙ্গে হানাদাররা আমার উপর হামলা শুরু করল। নির্যাতনের একপর্যায়ে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলার ভান করালম। ওরা তখন বলল,‘শালা মর গেয়া’। তারপর আমার চুল ধরে, পা ধরে টেনেহিঁচড়ে ঘরের কোণায় ফেলে রাখল। হানাদাররা রিসিপশন রুমে মোরশেদ সাহেবকে পেয়ে পিটাতে শুরু করে। কাজের ছেলে আবদুল রান্নাঘরের স্টোর রুমে লুকিয়ে ছিল।

গুলি করতে করতে পাকিস্তানি সেনারা দোতলায় বঙ্গবন্ধুর বেডরুমে গিয়ে দরজা ভাঙ্গার জন্য আঘাত করতে লাগল। কেউ কেউ নিচ থেকেই বেডরুমের জানালা লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে লাগল। বঙ্গবন্ধু তখন মাঝের রুমে পায়চারি করছিলেন। চারদিকে গুলির শব্দ। দোতলায় দরজা থেকে বঙ্গবন্ধু বললেন,‘Dont Fire, Dont Fire, I am Coming Out’। এরপর সেনারা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে চলে গেল। এর কিছুক্ষণ পর বঙ্গমাতা (বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব) মোমবাতি জ্বেলে নিচে আসলেন। তাকে দেখে আমি দাঁড়ালাম। তিনি আমাকে বললেন,‘আপনার ভাইকে নিয়ে গেছে।’ আমি বললাম,‘আমি সব দেখেছি।’ বঙ্গমাতা, শেখ রাসেল, গৃহকর্মী আবদুল ও আমি একই সঙ্গে দোতলায় হারিকেন জ্বালিয়ে বসে রাত পার করলাম।

তার পরের দিন কী করলেন?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : ২৬ মার্চ সকালে শেখ কামাল আসলেন। রাতের সব ঘটনা শুনলেন। এই অবস্থায় বঙ্গমাতাকে বাসায় রাখা নিরাপদ হবে না। তাকে নিরাপদ স্থানে রাখতে হবে। বঙ্গবন্ধুর বাসার পাশের বাসায় থাকতেন ডা. সামাদ সাহেব। ওই বিপদের সময় তার ছেলে বঙ্গমাতাকে তাদের বাড়িতে নেয়ার জন্য আসলেন। ডা. সামাদের বাড়ির নাম ছিল ‘সড়ায়েখাম’। এটি উর্দুতে লেখা থাকায় পাকিস্তানিরা এই বাড়িতে কখনো হামলা করেনি। ওই বাসায় যেতে হলে দেয়াল টপকে যেতে হবে। আমি একটি টুল দিয়ে বঙ্গমাতাকে দেয়াল টপকাতে বললাম। দেয়ালের ওপর আমি উপুড় হয়ে বসলাম, এরপর বঙ্গমাতাকে বললাম, ‘আমার পিঠে পা দিয়ে ধীরে ধীরে নামেন।’ তিনি আমার পিঠে সম্পূর্ণ ভার না দিয়ে নামতে গিয়ে নিচে পড়ে গেলেন। পড়ে গিয়ে তিনি ‘মাগো’ বলে আওয়াজ করে উঠলেন। সেই আওয়াজ এখনও আমার কানে বাজে।

২৬ মার্চ সারাদিন আমি ও শেখ কামাল ডা. সামাদ সাহেবের বাসায় ছিলাম। রাতে থাকার জন্য সেখান থেকে ৩২ নম্বরের বাসায় চলে আসি। বাড়ির সমস্ত ফটক লাগিয়ে আমি ও শেখ কামাল দোতলায় ঘুমিয়ে যাই। গভীর রাতে গুলির আওয়াজে আমাদের ঘুম ভেঙে যায়। দোতলা থেকে আমরা বুঝতে পারলাম, পাকিস্তানি কমান্ডোর নিচতলার কলাপসিবল গেট ভাঙছে দোতলায় ওঠার জন্য। আমরা তৎক্ষণাৎ দেয়াল টপকে নিরাপদ স্থান খুঁজতে থাকি। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির পেছনের দিকে কিছুটা দূরে বেতারের কর্মকর্তা বাহাউদ্দিন সাহেবের বাড়ি ছিল। ওই বাসায়ই আশ্রয় নিতে হয় আমাদের। পরদিন সকালে আমি ও শেখ কামাল বঙ্গমাতার সঙ্গে দেখা করার জন্য ডা. সামাদ সাহেবের বাসায় যাই। বঙ্গমাতা আমাদের দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার ধারণা ছিল পাকিস্তানিরা শেখ কামাল ও আমাকে হত্যা করে লাশ নিয়ে চলে গেছে। এমন সময় পাকিস্তানি বাহিনী ডা. সামাদ সাহেবের বাসার গেটের সামনে আসে। বঙ্গমাতা আমাদের বললেন, ‘তোমরা আর এখানে এসো না।’ আমরা তখন সেখান থেকে আবার পালিয়ে যাই।

দ্বিতীয় কিস্তি: বঙ্গবন্ধু বললেন, ফরিদ ঘুমাচ্ছে ওকে ডাকিস না

বঙ্গবন্ধু বললেন, ফরিদ ঘুমাচ্ছে ওকে ডাকিস না
মোহাম্মদ মহিউদ্দিন

মুন্সিগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন। মুন্সিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। পাকিস্তান পর্বের শেষ তিন বছর আওয়ামী লীগের হয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখতেন। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমে প্রধানমন্ত্রী, পরে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তার সরকারি দায়িত্ব পান। প্রায় সাত বছর বঙ্গবন্ধুকে খুব কাছে থেকে দেখেছেন। সেই সময়ের অনেক কথা তিনি ১০ আগস্ট ঢাকাটাইমসকে অকপটে বলেছেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত জীবনের নতুন কিছু দিক উন্মোচন করেছেন। আজ সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় কিস্তি ছাপা হলো। মুন্সিগঞ্জ গিয়ে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তায়েব মিল্লাত হোসেন।

মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেন কিভাবে?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে আমি আগরতলা চলে যাই। সেখানে গ্লাস ফ্যাক্টরিতে ট্রানজিট ক্যাম্প ছিল। একপর্যায়ে এখানে মুজিব বাহিনী (বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট-বিএলএফ) গঠিত হয়। সেখান থেকে দেরাদুনে চাকরাতা ক্যান্টনমেন্টে গেরিলা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় আমাদের। মুজিব বাহিনীকে চার সেক্টরে ভাগ করা হয়। চার সেক্টরে প্রধান হিসেবে ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ। আর্মি ট্রেনিং সেন্টারে তাদের সঙ্গেই আমি ট্রেনিং নেই। তিন মাস ট্রেনিং নিয়ে বৃহত্তর ঢাকা জেলার বিএলএফ প্রধানের দায়িত্ব পাই। আমাদের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি। প্রথমে পদ্মা পারের ফরিদপুরের চরহাট্টা গ্রামে অবস্থান নেই। পরে নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, আড়াইহাজারসহ বিভিন্ন মহকুমায় অবস্থান নিয়ে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেই।

মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তার দায়িত্ব কবে পেলেন?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু যখন প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন, তখন আমি প্রধানমন্ত্রীর প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পাই। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার নিলে আমি রাষ্ট্রপতির প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ে যোগ দেই।

বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর কর্মময় জীবন কেমন দেখেছেন?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : বঙ্গবন্ধু সকাল নয়টার মধ্যেই বাসা থেকে বের হতেন। আমাকে তাই সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে তৈরি থাকতে হতো। ঢাকায় থাকলে প্রায় সময়ই দুপুরের খাবারের জন্য বাসায় আসতেন বঙ্গবন্ধু। ছেলে রাসেল ও নাতি জয়কে নিয়ে সবসময় শিশুসুলভ খেলা করতেন, ওদের আনন্দ দিতেন। দেশের প্রধান হয়েও বঙ্গবন্ধু সাধারণ মানুষ থেকে দূরে সরে যাননি। একটা ছোট ঘটনা থেকে তা বোঝা যায়। বঙ্গবন্ধু প্রায়ই অফিস শেষে করে বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ-ই যেন তাঁর মনে হলো- ‘চল মিরপুরের বস্তির মানুষের অবস্থা কেমন আছে দেখে আসি।’ আবার কখনো কখনো চকবাজারে গিয়ে বাজারের অবস্থা দেখে আসতেন। একদিনের ঘটনা, আমি তখন বঙ্গবন্ধুর সাথে গাড়িতে বসা। তিনি গাড়ি থামাতে বললেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর পাহারায় থাকা পাইলট গাড়ির নিরাপত্তারক্ষীরা তা বুঝতে পারেনি। সেই গাড়ি চলতেই থাকলো। আমি গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে পাইলট গাড়িটিকে নির্দেশ দেই বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছেমতো গন্তব্যস্থলে যাওয়ার জন্য।

একদিন কাজের সুবিধা ও নিরাপত্তার জন্য আমি বঙ্গবন্ধুকে বললাম,‘স্যার আমাকে দুইটি ওয়াকিটকি কিনে দিলে কাজের জন্য খুব সুবিধা হতো।’ বঙ্গবন্ধু আমার কথায় গুরুত্ব দিলেন না। পরে ই. এ. চৌধুরী (সাবেক এসপি) সাহেবকে বিষয়টি আমি জানাই। ই. এ চৌধুরী একদিন বঙ্গবন্ধুকে বললেন, ‘স্যার মহিউদ্দিনকে দুইটা ওয়াকিটকি কিনে দিলে নিরাপত্তার কাজ করতে ওর সুবিধা হয়।’

বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘ঠিক আছে দুইটা ওয়াকিটকির দাম কত?’ তখন তিনি জানালেন, ৩০-৪০ হাজার টাকা হবে। বঙ্গবন্ধু ধমক দিয়ে বললেন, ‘আমার দেশের মানুষ ঠিকমতো দুই বেলা পেট ভরে ভাত খেতে পায় না, আর আমি ওকে ৪০ হাজার টাকা দিয়ে ওয়াকিটকি কিনে দেব? এমন নিরাপত্তা আমার কোনো প্রয়োজন নেই। বিশাল নিরাপত্তার থাকার পরেও কত নেতাকেইতো মেরে ফেলেছে। মৃত্যু আসবে মরব।’

আরো একটি ঘটনার কথা বলি। একদিন দুপুরবেলা, আমার বাসায় যাওয়া দরকার। বঙ্গবন্ধুর অনুমতি নিয়ে যাওয়ার আগে তার ব্যক্তিগত সেবক ফরিদকে বলে গেলাম, ‘তুই স্যারের পায়ের কাছে বসে পা টিপতে থাক, আমি কাজ শেষ করে ফিরছি।’ ফিরে এসে দেখি, ফরিদ বঙ্গবন্ধুর পায়ের উপর ঘুমাচ্ছে। ওর মুখের লালা দিয়ে বঙ্গবন্ধুর পা ভরে গেছে, দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এক কাত হয়ে শুয়ে আছেন, একটুও নড়াচড়া করছেন না। আমি যেই ফরিদকে ওঠাতে গেলাম, বঙ্গবন্ধু হাত দিয়ে ইশারা করে ওকে ডাকতে মানা করছেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘ফরিদ ঘুমাচ্ছে ওকে ডাকিস না।’ আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম। লালা বেয়ে পড়া অস্বস্তিকর বিষয়। অথচ বঙ্গবন্ধুর কাছে কিছুই মনে হলো না। ফরিদের ঘুমের যাতে ব্যাঘাত না ঘটে, এই জন্য একটুও নড়াচড়া করছেন না। বঙ্গবন্ধু মহামানব না হলে আর কী হতে পারেন!

বঙ্গবন্ধুর কোন বিষয়গুলো অন্যদের চেয়ে তাকে আলাদা করে তুলেছিল?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন মহান নেতা। কারও প্রতি তার আদর-স্নেহের কমতি ছিল না। সবসময় সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন তার সঙ্গী-সাথীদের প্রতি। বঙ্গবন্ধু সবার খাওয়া-দাওয়ার বিষয়ে পর্যন্ত নজরে রাখতেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনের সময় বঙ্গবন্ধু গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের কাছে এতই জনপ্রিয় ছিলেন যে, অনেকে শুধু দেখেই নয়, হাত দিয়ে ধরতে চাইতেন। নিরাপত্তার জন্য আমি বাধা দিলে বঙ্গবন্ধু ধমক দিয়ে বলতেন, ‘মহিউদ্দিন তুই কাকে বাধা দিস, গ্রামের এই দরিদ্র মানুষের মধ্যে থেকেই আমার জন্ম, এই মানুষের ভালোবাসার কারণেই আমি আজ নেতা, এরা গ্রামের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে আসে আমাকে দেখতে, হৃদয়ের টানে। এই মাটি ও মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে আমি আন্দোলন-সংগ্রামে সাহস, শক্তি পাই, অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করি। সমাজের এই অবহেলিত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত দরিদ্র মানুষকে সামরিক শাসন ও শোষণের হাত থেকে বাঁচাতে হবে। আমার প্রতি তাদের বিশ্বাস ও আস্থার প্রতি সম্মান দেখা।’ এরপর থেকে বঙ্গবন্ধুকে কখনো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আড়াল করার চেষ্টা করিনি।

যেকোনো নেতাকর্মী এমনকি একজন সমর্থকের কথাও বঙ্গবন্ধু গুরুত্ব দিয়ে শুনতেন এবং সেই বিষয়ে যাচাই-বাছাই করতেন। সকলের মতামত তিনি গভীরভাবে মূল্যায়ন করতেন। যা বঙ্গবন্ধুর মতো মহান নেতার পক্ষেই সম্ভব। বঙ্গবন্ধুর মতো এত বড়মাপের মহান নেতার সংস্পর্শে যাওয়াটা আমার জন্য ভাগ্যের ব্যাপার।

বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষ কোনো ঘটনা মনে পড়ে?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : ১৯৭০ সালে একদিকে নির্বাচনি ব্যস্ততা, অন্যদিকে পাকিস্তানি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধেও আন্দোলন চলছে। এমনি সময়ে এক ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে মারার জন্য বিষ মেশানো ছুরি নিয়ে তার রুমে আসার চেষ্টা করে। আমি লোকটিকে চ্যালেঞ্জ করি। একপর্যায়ে সে আমাকে মারতে উদ্যত হয়। আমি তাকে ধরে ফেলি। তাকে কিছু উত্তম-মধ্যম দেই। বঙ্গবন্ধু এই অবস্থা দেখে উপর থেকে নিচে নেমে আসেন। তিনি উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘ওকে মারছিস কেন? ওর অপরাধ কী?’ বঙ্গবন্ধু জানতে পেরে তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আমাকে মেরে তোর লাভ কী?’ পরে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়। পরের দিন বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যার চেষ্টা’ হেডলাইন দিয়ে বঙ্গবন্ধু, আমার ও দুষ্কৃতকারীর ছবি প্রকাশ করা হয়।

আপনার সঙ্গে বিশেষ কোনো স্মৃতির কথা জানাবেন?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : একবার ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালে মুন্সিগঞ্জে বন্যা দেখতে গিয়েছিলেন। নৌকা থেকে ইয়াহিয়া খান ঘাটে যে জায়গায় নামবেন, সেখানে সবাই দাঁড়িয়ে ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধে আমরা স্লোগান দিচ্ছিলাম- ‘ইয়াহিয়া ফিরে যাও’, ‘Go Back Yeahiya’। ইয়াহিয়ার নৌকা কিছুতেই পারে ভিড়াতে পারছিল না। নৌকা থেকে ইয়াহিয়া হাত উঠিয়ে আমাদের থামানোর চেষ্টা করলেন। আমি সবাইকে চুপ করতে বললাম। ইয়াহিয়া আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন,‘ What is your demand?’ What is your Demand?

আমি বললাম, ‘We dont want request any relief, we want permanent flood control’। ইয়াহিয়া খান বললেন,‘We dont want request any relief, we want permanent flood control।’

নদী থেকে স্পিডবোটে দাঁড়ানো ইয়াহিয়াকে আমি হাত বাড়িয়ে দিয়ে টেনে তুললাম। তার মতো এত স্বাস্থ্যবান মানুষকে টেনে তুলতে দেখে তিনি বললেন, ‘Very Strong man’। এরপর তাকে রিকশায় উঠানো হলো। তিনি রিকশায় আমাকে পাশে বসতে বললেন। আমি তার পাশে না বসে রিকশার সঙ্গে সঙ্গে দলবল নিয়ে আসলাম। বন্যার পানিতে রাস্তা ডুবে গিয়েছিল। ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আহসান সাহেবও ছিলেন। ইয়াহিয়া আহসানকে বললেন, ‘আমার নাম-ঠিকানা দিতে।’

পরে ইয়াহিয়া খানের সাথে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎ হয়। সেখানে তিনি মুন্সিগঞ্জের ঘটনা তুলে ধরে আমার প্রসঙ্গ তুলেন। ইয়াহিয়া খান বললো, ‘I visit monshigonj. I have seen a boy is very strong, energetic, commanding, powerful like a military. Mr Ahshan what is name of the boy? ’ আহসান চিন্তা করার আগেই বঙ্গবন্ধু বলে উঠলেন, ‘I think this name is mohiuddin’।

তখন ইয়াহিয়া খান বললেন, ‘Oh yes yes how you have come to know his name?’

বঙ্গবন্ধু বললেন,‘He is my boy’। ইয়াহিয়া খান বললেন,‘I like to take him make army’। বঙ্গবন্ধু বললেন,‘No no I have a military in my organization. I need him। ইয়াহিয়া খান চলে যাওয়ার পর সবার সঙ্গে আওয়ামী লীগ অফিসে বসে আলোচনার সময় বঙ্গবন্ধু বললেন,‘I feel proud for mohiuddin’। ঘটনাটি সবার মধ্যে বর্ণনা করলেন। একপর্যায়ে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মহিউদ্দিন কী হয়েছে? ইয়াহিয়া খান তোর এত প্রশংসা করল, ইয়াহিয়া খান তোকে নিয়ে যেতে চায়।’ আমি বঙ্গবন্ধুকে বললাম, ‘আপনার পায়ের নিচে আমার অবস্থান, এত বড় অবস্থান ছেড়ে আমি কোথাও যেতে চাই না।’

তৃতীয় কিস্তি: বঙ্গবন্ধু বললেন, আপনিও আমার পেছনে লেগেছেন

মুন্সিগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন। মুন্সিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। পাকিস্তান পর্বের শেষ তিন বছর আওয়ামী লীগের হয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখতেন। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমে প্রধানমন্ত্রী, পরে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তার সরকারি দায়িত্ব পান। প্রায় সাত বছর বঙ্গবন্ধুকে খুব কাছে থেকে দেখেছেন। সেই সময়ের অনেক কথা তিনি ১০ আগস্ট ঢাকাটাইমসকে অকপটে বলেছেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত জীবনের নতুন কিছু দিক উন্মোচন করেছেন। আজ সাক্ষাৎকারের তৃতীয় ও শেষ কিস্তি ছাপা হলো। মুন্সিগঞ্জ গিয়ে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তায়েব মিল্লাত হোসেন।

আপনাকে নিয়ে একটি বই বের হয়েছে- বঙ্গবন্ধুর মহিউদ্দিন। এই নামকরণের কারণ কী?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : এটারও একটা ঘটনা আছে। সকাল সাড়ে আটটায় বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে ডিউটিতে যেতাম। একদিন বঙ্গবন্ধুর বাসার দোতলায় গিয়েছি। দেখি, বঙ্গবন্ধু গোসলখানা থেকে পা মুছতে মুছতে বের হচ্ছেন। আমাকে দেখে বললেন, ‘টেবিলের উপর তোর একটা চিঠি এসেছে, চিঠিটা দেখ।’

চিঠিটা হাতে নিয়ে খামটা খুলতেই বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘চিঠির খামের উপর কি লেখা আছে সেটা পড়।’ আমি খামের উপরের লেখাটি পড়লাম, লেখা ছিল- ‘বঙ্গবন্ধুর মহিউদ্দিন, ৩২ নম্বর ধানমন্ডি।’

আমি বিষয়টি বুঝতে পারলাম না। তখন বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আবার পড়’। লেখাটা আবার পড়লাম, এই লেখাটি উপলব্ধি করতে পারলাম না। এর গভীরতা বুঝতে পারলাম না। বঙ্গবন্ধু তখন বললেন, ‘‘কী লিখেছে, ‘বঙ্গবন্ধুর মহিউদ্দিন’, এটা মেনে চলবি।’’ তখন আমি এর মর্ম বুঝতে পারলাম।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আপনার শেষ কর্মদিবস কবে? এই দিনটি কেমন ছিল?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : বঙ্গবন্ধুর শেষ কর্মদিবস আমারও নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে শেষ কর্মদিবস। দিনটি পঁচাত্তরের ১৪ আগস্ট। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে আসি। অফিস ছিল নতুন গণভবনে, যথারীতি কার্যক্রম শেষ করে বিকালে রাজনৈতিক বিভিন্ন লোকজনের সাথে তিনি সাক্ষাৎ করেন। বিকালে নেতানেত্রীদের সঙ্গে আবদুল মতিন চৌধুরীও (তখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য) ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, ‘আগামীকাল বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ে গুরুত্বপুর্ণ ভাষণ দেবেন। এদিকে সময় নষ্ট না করে বঙ্গবন্ধুকে বাসায় নিয়ে যাও। ওনাকে কালকের অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ভাবতে দাও।’

তার কথা মতো আমি বঙ্গবন্ধুকে বাসায় নেওয়ার জন্য প্রতিদিনের মতো বঙ্গবন্ধুর চশমা, তামাকের বেগ টেবিল থেকে হাতে নেই। তখন বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারলেন, তাকে বাড়ি যাওয়ার জন্য ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধু আমাকে ধমক দিয়ে ওইগুলো টেবিলে রাখতে নির্দেশ দিলেন। আমি বঙ্গবন্ধুকে উঠাতে পারলাম না। মতিন চৌধুরী সাহেব বললেন, ‘কী ব্যাপার?’ আমি বললাম, ‘আমি তো ওঠাতে পারছি না।’ তিনি বললেন ‘আমার সঙ্গে আসো।’ তখন তিনি বঙ্গবন্ধুর সামনে গিয়ে আমাকে জোরে বলতে লাগলেন- ‘হিউদ্দিন গাড়ি লাগিয়েছ।’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ গাড়ি প্রস্তুত।’ বঙ্গবন্ধু তখন তাকে বললেন, ‘আপনিও আমার পেছনে লেগেছেন।’

বঙ্গবন্ধু চেয়ার থেকে উঠে ৩২ নম্বর বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলেন। রাত সাড়ে ৮টা-৯টার দিকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ৩২ নম্বর বাড়িতে গণভবনের দিকে চলে আসলাম। সেখানে এক নৈশভোজে যোগ দিলাম।

নৈশভোজ শেষে আমি ও তোফায়েল আহমেদ ভাই একসঙ্গে গণভবন থেকে বের হলাম। তোফায়েল ভাই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করার কথা বললেন। রাত অনেক হয়েছে বলে আমি আর গেলাম না। কারণ বেশি রাতে আমাকে দেখলে বঙ্গবন্ধু অসন্তুষ্ট হতে পারেন। তোফায়েল ভাই আমাকে ৩২ নম্বর বাসার নিচে রেখে উপরে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। এই সময় আমার সঙ্গে কাজী গোলাম মোস্তফা সাহেবের দেখা হয়। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘লিডার কী করছেন?’ আমি বললাম, ‘স্যার উপরে আছেন।’ তিনি তখন উপরে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর তোফায়েল ভাই নিচে নেমে আসলেন। আমি ও তোফায়েল ভাই বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেই। তাকে তার বাড়িতে নামিয়ে আমি রাত প্রায় একটার দিকে নিজের বাসায় ফিরি।

বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার খবর কখন পেলেন?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : গোলাগুলির আওয়াজে কর্মচারীরা আমাকে ঘুম থেকে উঠায়। রমনা থানার পাশেই ছিল আমার বাসা। আমি ভাবলাম, বঙ্গবন্ধু আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন, এই অনুষ্ঠান বানচাল করার জন্য হয়ত দুষ্কৃতকারীরা অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করছে। সেলিনা হক নামে এক নেত্রী শেষরাতে আমাকে ফোন করে জানালেন, বঙ্গবন্ধুর বাসায় দুষ্কৃতকারীরা হামলা করেছে।

আমি তখন বঙ্গবন্ধুর বাসায় যাওয়ার কোনো পরিবহন না থাকার কারণে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের স্টাফদের ফোন করি। কিন্তু কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। ঘটনা জানতে কিছুক্ষণ পর তৌফিক ইমাম সাহেব ফোন করলেন। আমি ধারণা থেকে বললাম, ‘বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে দুষ্কৃতকারীরা এই কাজ করছে।’

লাল ফোনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ফোন করলাম, কিন্তু কেউ ফোন ধরেনি। তখনি বঙ্গবন্ধুর বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলাম। ২৭ নম্বর ধানমন্ডি বয়েজ স্কুলের সামনে যাওয়ার পর ওখানকার লোকজন আমাকে আর সামনে যেতে দিল না। তারা বললেন, সামনে আর্মি আর রক্ষীবাহিনীদের মধ্যে গোলাগুলি হচ্ছে। আমি ভাবলাম আমাকে দেখলে সবাই চিনতে পারবে, এই ভেবে আমি বাধা থাকার পরও সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। সামনে গিয়ে দেখি বৃষ্টির মতো আগুনের গোলা সামনের দিকে এগিয়ে আসছে। ভাবলাম গুলি তো আর আমাকে চিনবে না। বাসায় ফিরে টেলিফোনে যোগাযোগ করতে লাগলাম। একপর্যায়ে জানতে পারলাম বঙ্গবন্ধুর উপর হামলা হয়েছে। কিছুক্ষণ পর রেডিওর খবরে শোনা গেল, খোন্দকার মুশতাকের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুকে উৎখাত করা হয়েছে। এই সময় ফরাসউদ্দিন সাহেব (বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সচিব) আমাকে ফোন করে বঙ্গবন্ধুর অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তার কিছুক্ষণ পর ড্রইং রুমে রেডিওতে শুনি, ‘আমিমেজর ডালিম বলছি, স্বৈরাচারী সরকার শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে।’

১৯৭৫ সালের ২৮ অক্টোবর আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাখা হয় জেলখানার দুই নম্বর নতুন সেলে। জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে দেখেছি। খাবার দিতে আসা মিঞা সাহেব (জেল পুলিশ) ৩ নভেম্বর চার আঙুলের ইশারায় জানিয়েছিলেন, জাতীয় চার নেতাকে মেরে ফেলা হয়েছে। দুই দিন ধরে তখন কিছুই খেতে পারিনি। চারদিকে লাশের গন্ধ। দুই দিন পর চার নেতার লাশ জেলখানা থেকে সরিয়ে ফেলে। প্রায় সাড়ে ৩ বছর আমাকে কারাগারে কাটাতে হয়। উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়ে এরপর জেলখানা থেকে বের হই। জেলে থাকার সময় তৎকালীন সরকার কখনো লোভ-লালসা, কখনো ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের দলে যোগ দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। তখন আমার একটাই বক্তব্য ছিল, ‘যার পায়ের নিচে থেকেছি, তার পায়ের নিচে থেকে মৃত্যুবরণ করতে পারিনি। এখন কোনো পদ-পদবির লোভ-লালসা কিংবা ভয়ভীতি দেখিয়ে আমাকে বঙ্গবন্ধুর দল থেকে সরাতে পারবেন না।’

রাজনৈতিক জীবনে দীর্ঘ সময় পাড়ি দিয়ে এসে নিজের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব কিভাবে করবেন?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য হলো, বঙ্গবন্ধুর পায়ের তলে স্থান পেয়েছিলাম। আর আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হলো, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মরতে পারি নাই।

আপনাকে ধন্যবাদ।

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : আপনাকেও ধন্যবাদ।

[সমাপ্ত]

ঢাকাটাইমস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.