হারিয়ে যাচ্ছে মিরকাদিমের ঐতিহ্য ধবল গাভি

মফিজুল সাদিক: মুন্সীগঞ্জের মীরকাদিমের আয়ুব আলী (৬৫)। এক সময় এই গৃহস্থের গোয়ালে ২০টি গাভিসহ ৩৫টি গরু ছিলো। এখন রয়েছে পাঁচটি গাভি, চারটি বাছুর ও একটি ষাঁড়। তবে নেই মীরকাদিমের ঐতিহ্যবাহী ধবল (সাদা) গাভি, যেগুলো রয়েছে সেগুলো শংকর জাতের। কোনোটির রঙ সাদা-কালো, কোনোটির লালচে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে গোয়াল যেন শূন্য হয়ে যাচ্ছে আয়ুব আলীর। তার সন্তান শুকচান আলী ও মতিন আলীও শঙ্কায় পড়েছেন বাবার গরু পালার ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারবেন কি-না।

গৃহস্থরা জানান, চালকল হারিয়ে যাওয়া, দুধের দাম কমে যাওয়া, গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, আবাদি জমি কমে যাওয়া এবং আগের মতো সাদা ধবল জাতের গাভি না পাওয়ায় বিলুপ্তির পথে মীরকাদিমের গাভি।

সরেজমিনে জানা গেছে, এক সময় ভুটানের আবাল ও বুট্টি, ভারতের উড়িষ্যা ও জঙ্গলি এবং নেপালের নেপালি ধবল গরু মীরকাদিমে লালন-পালন করে ঈদে বিক্রি করা হতো। অক্লান্ত পরিশ্রমে সেগুলোকে মীরকাদিমের ধবল গাভি বানানো হতো। কিন্তু এসব জাতের গরু আর খুঁজে পাচ্ছেন না মীরকাদিমের খামারি-গৃহস্থরা। ফলে এখন বাপ-দাদার ঐতিহ্য ধরে রাখতে শংকর জাতের গরু পালন করছেন তারা।

পঞ্চসারের গৃহস্থ ইয়াকুব মুন্সি (৪৫)। এক সময় তার বাবা জালাল মুন্সির ৫০টি গাভি ও বাছুর মিলিয়ে শতাধিক গরু ছিলো। অথচ বর্তমানে মাত্র ৭টি গাভি রয়েছে গোয়ালে। গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধি ও ধবল জাতের গাভি না পাওয়ায় পালন কষ্টসাধ্য হয়ে গেছে বলে জানান ইয়াকুব।

গৃহস্থ-খামারিরা জানান, ৫০ কেজি চালের কুড়া ৮০০ টাকা, ৪০ কেজি খেসারি ১ হাজার ৪০০ টাকা, প্রতি কেজি খুদ ৩০ টাকা, ৩৫ কেজি গমের ভূষি ১ হাজার ৩০০ টাকা ও প্রতি কেজি ভূষি ২৬ টাকা দরে কিনতে হয় গৃহস্থদের। তবে আবাদি জমি থাকলে গরুকে কাঁচা ঘাস খাওয়ানো হয়। তখন কেনা গো-খাদ্যের ওপরে কিছুটা চাপ কমে। কিন্তু বর্তমানে আবাদি জমি হারিয়ে যাওয়ায় কেনা খাবারের ওপর নির্ভর করে গরু পালতে হয় তাদের।

কেনা খাদ্যের ওপরে নির্ভর করে গাভি পালতে দৈনিক ৩০০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকার খাবার প্রয়োজন বলে জানান গৃহস্থরা। অথচ এসব গাভি থেকে দৈনিক দুধ পাওয়া যায় ৮ থেকে ১০ কেজি, যার বাজার মূল্য ৩২০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা। বর্তমানে ৪০ টাকা কেজি দরে দুধ বিক্রি হচ্ছে মীরকাদিমে। ওষুধ ও ডাক্তার, মশার কয়েল, কৃষাণ ও ঘর রক্ষণা-বেক্ষণেও বাড়তি খরচ আছে।

তারা জানান, প্রথম দিকে একটি গাভি ১০ কেজি করে দুধ দিলেও প্রতি মাসে দেড় থেকে দুই কেজি করে পর্যায়ক্রমে কমতে থাকে। এক সময় এটি দেড় থেকে দুই কেজিতে নেমে আসে। ওই সময়টা পার করতে হিমশিম খেতে হয় গৃহস্থদের। কারণ, দুই কেজি দুধ বিক্রি করে আয় হয় ৮০ টাকা। অথচ এসব গাভির তখন খাবার লাগে ৩০০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকার।

মীরকাদিমের গৃহস্থ ইয়াকুব বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমার বাবা-দাদারা যেভাবে গাভি পালন করেছেন, আমরা সেভাবে পেরে উঠছি না। আগের সাদা জাতের সেই ধবল গাভি কিনতে পাওয়া যায় না। সবচেয়ে খারাপ বিষয় হলো- দুধের চেয়ে গো-খাদ্যের দাম বেশি। আবাদি জমিও কমে যাওয়ায় কেনা খাদ্যের ওপর নির্ভর করে গরু পালতে হয়’।

মীরকাদিম ঘুরে দেখা গেছে, নিজের পরিবার ও শরীরের চেয়েও গরুর বেশি যত্ন করেন গৃহস্থরা। গোয়ালের গরুকে সময় মতো খাবার দেন, নতুন গামছা দিয়ে গোসল করান। সব সময় চোখে চোখে রাখা হয় এসব গরুকে।

কোরবানির ঈদে খামার ও গোয়ালের কতোটি গাভি বিক্রি করা হবে- সে পরিকল্পনা তিন মাস আগে থেকেই করে থাকেন গৃহস্থরা। যেসব গাভি দুধ কম দেয়, বাচ্চা দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং বয়স্ক- সেগুলোকে কোরবানির হাটে ওঠানো হয়। এসব গরুকে দামড়ি ও বয়স্ক গরু নামে ডাকা হয় স্থানীয়ভাবে। ওই তিনমাসে এসব গরুর বাড়তি পরিচর্যা ও স্বাস্থ্যসম্মত ভালো খাবার খাওয়ানো হয়।

তবে গৃহস্থরা জানান, সাদা গাভি এখন পাওয়া যায় না। তাই বিভিন্ন রঙের গরু বানানো হয় কোরবানি উপলক্ষে।

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.