ভালো নেই প্রতিমা কারিগররা : শারদীয় দুর্গোৎসব

দীপন নন্দী: কাগজে-কলমে নাম মুন্সীগঞ্জ। তবে সবাই বিক্রমপুর নামেই চেনে এ এলাকাকে। ঢাকা থেকে যাওয়ার বাহনটির নামও ছিল গ্রেট বিক্রমপুর পরিবহন। বাসে পাশের আসনের তরুণী রাফিয়া আহমেদ জানালেন, বিক্রমপুরের শ্রীনগরে প্রতিমা কারিগররা এখন আর ভালো নেই। তার কথার সত্যতা মিলল শ্রীনগরের ষোলঘরের প্রতিমা কারিগর নিরঞ্জন পালের সঙ্গে আলাপ করে। তিনি বললেন, ‘দুর্গাপূজার আগের দুই-তিন মাস হাতে কাজ থাকে, বাকিটা সময় বলা যায় একরকম বেকারই থাকি।’

নিরঞ্জনের কথা শোনার পর চারপাশে পূজার উৎসবের আমেজ বেশ ফিকেই মনে হলো। আলোকসজ্জিত নয়নাভিরাম প্রতিমা দেখতে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর মহাষষ্ঠীর দিন থেকেই ম-পে ম-পে ভিড় জমাবেন ভক্তরা। অথচ সেসব প্রতিমার কারিগররাই ভালো নেই। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, প্রতিমা নির্মাণের খরচ বাড়ছে; কিন্তু সে হারে বাড়েনি পারিশ্রমিক। প্রতিমা শিল্পীরা জানালেন, পূজার আগে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা; কিন্তু দিন-রাত খেটেও মনমতো পারিশ্রমিক না পাওয়ায় হতাশ তারা। আয়-রোজগারের নিশ্চয়তা না থাকায় শ্রমিক সংকটও রয়েছে এ শিল্পে। তরুণরা এ পেশা থেকে বলতে গেলে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। বাবা-ঠাকুরদার পেশাকে ত্যাগ করে চলে যাচ্ছেন অন্য পেশায়। তাই প্রতিমা কারিগরও কমছে।

শ্রীনগরের ষোলঘর সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরে প্রতিমায় রঙের আঁচড় দিতে ব্যস্ত সময় পার করছিলেন নিরঞ্জন পাল। তিনি জানান, চলতি বছর ১২টি প্রতিমা তৈরি করেছেন তিনি। এর মধ্যে মুন্সীগঞ্জে নয়টি এবং নারায়ণগঞ্জে তিনটি। প্রতিটি প্রতিমায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা লাভ থাকে। তবে বছরের বাকিটা সময় বলা যায়, কোনো কাজই থাকে না। বছরের বাকি সময়ের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, মাটির ফল বানিয়ে কিংবা সরস্বতী পূজার সময় প্রতিমা তৈরি করে কোনোমতে দিন চলে যাচ্ছে। এ কষ্টের জীবন আর সহ্য হয় না। বাপ-কাকা আর বড় ভাইয়ের হাত ধরে এ পেশায় এসেছিলাম, জানি না কত দিন ধরে রাখতে পারব। আগে নিজেই প্রতিমার অর্ডার নিতাম, গত বছর থেকে ছেড়ে দিয়েছি। লাভ থাকে না, চলতে পারি না।

নিরঞ্জন পালের মতোই ক্ষেদোক্তি করলেন শ্রীনগরের আরেক প্রতিমা কারিগর ফটিক চন্দ্র দাস। বললেন, ওস্তাদ ধীরেন পালের হাত ধরে ২৫ বছর আগে থেকে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। প্রতিমা বানানোর খরচ বেড়েছে বলে তেমন লাভ থাকে না। তার ছেলে হূদয় চন্দ্র দাস কাজ শিখছে, তবে নতুন লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন। কেউ এখন আর এ পেশায় আসতে চায় না।

ফটিক চন্দ্র দাসের কাছ থেকে জানা গেল বৈশাখ, পৌষ, মাঘ ও চৈত্র- এ চার মাস তাদের মন্দা মৌসুম চলে। তখন কী করে সংসার চলে?- জানতে চাইলে তিনি বললেন, কী আর করব! কাজ নেই বলে তো পেট থেমে থাকবে না। ছোটখাটো মাটির অথবা কারও বাড়ির প্রতিমা বানানোর কাজ আর ঋণ করে দিন চালাতে হয়।

ষোলঘরের পথ ধরে রাঢ়িখালের দিকে যেতে ধীরেন পালের বাড়ি। তাকে ঘরে পাওয়া গেল না। তবে দেখা হলো তার ভাই দীনেশ পালের ছেলে অজয় পালের সঙ্গে। আগে টুকটাক স্বর্ণের ব্যবসা করলেও এখন শুধুই প্রতিমা বানান তিনি। জানালেন, এবার সব মিলিয়ে নয়টি প্রতিমা নির্মাণ করেছেন তিনি ও তার দল। বললেন, লাভের হার খুবই কম। কারণ প্রতিনিয়তই বাড়ছে প্রতিমা নির্মাণের ব্যয়। ধরেন, পাঁচ লাখ টাকার প্রতিমা বানালে এক লাখ টাকাও ঘরে থাকে না। বলা যায়, এটাই সারা বছরের আয়। তিনিও জানালেন, দুর্গাপূজার মৌসুমে কোনোমতে চলতে পারলেও বাকি সময়টা অন্য কাজ করে চলতে হয়।

এত সংকট তবু কেন এ পেশায়- এ নিয়ে সম্প্রতি কথা হয় ৭০ বছর বয়সী হরিপদ পালের সঙ্গে। শাঁখারিবাজারে অর্ধশতাব্দীকাল ধরে প্রতিমা বানিয়ে চলছেন তিনি। বললেন, ‘অনেক কষ্টে আছি। তবু এ পেশা ছাড়তে পারি না। আমাদের দেহ চলে গেলে মাটিই সব। আমি তো মাটি নিয়েই থাকি। এর মধ্যেই মাকে উপলব্ধি করি। যখন দুঃখ বেড়ে যায়, কাজে হাত দেই, সান্ত্বনা খুঁজে পাই।’

সমকাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.