আড়িয়াল বিলের নজরকাড়া মিষ্টিকুমড়া

মঈনউদ্দিন সুমন: মুন্সীগঞ্জের আড়িয়াল বিল বললেই চোখের সামনে ভেসে উঠবে বড় আকৃতির একেকটি মিষ্টিকুমড়া। স্বাদে অতুলনীয় এই মিষ্টিকুমড়াগুলোর একেকটি ওজন দুই মণের বেশি। তাই সারা দেশেই ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করে আসছে এই মিষ্টিকুমড়াগুলো।

শীতের শেষে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার মানুষ আড়িয়াল বিলের সৌন্দর্য এবং এখানকার মিষ্টিকুমড়া দেখতে আসেন। বাড়ি ফেরার সময় এখানকার মিষ্টিকুমড়া নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর বাজার থেকে সাড়ে চার কিলোমিটার পথ পার হলেই গাদিঘাট গ্রাম। আড়িয়াল বিলের শুরুটা মূলত এই গাদিঘাট থেকেই। আড়িয়াল বিলে এখন গেলে চোখে পড়বে বৃহৎ আকারের মিষ্টিকুমড়া এবং কৃষকের ব্যস্ততা। স্থানীয় বাজারগুলোতে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা তাঁদের গাড়ি থামিয়ে নিয়ে যান ওই মিষ্টিকুমড়া। ঢাকার মিরপুর, কারওয়ান বাজার, সাভার, সদরঘাটসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্রির জন্য ব্যবসায়ীরা চলে আসেন এখানে। তাঁদের জন্য রাস্তার দুপাশে সারিবদ্ধভাবে সাজানো হয় মিষ্টিকুমড়াগুলো। এরপর মোটরযান ও নৌকায় করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যায় এগুলো। কেজি ও পিস অনুযায়ী বিক্রি করা হয় এই মিষ্টিকুমড়াগুলো। পিস হিসেবে ২০০ থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত এবং কেজি হিসেবে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয় এই মিষ্টিকুমড়া।

আড়িয়াল বিলের চাষি আলী হোসেন জানান, আড়িয়াল বিলে তাঁর চার একর জমিতে এবার ৭০টি বীজ রোপণ করেছেন। ওই বীজ থেকে হওয়া মিষ্টিকুমড়া বিক্রি করে তিন থেকে চার লাখ টাকা পাবেন বলে আশা করছেন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পণ্যবাহী যানবাহনের মাধ্যমে এসব মিষ্টিকুমড়া নিয়ে যান ব্যবসায়ীরা। কিন্তু সার, ওষুধ, পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে যাওয়ায় নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যে পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে, তাতে সবকিছু বাদ দিয়ে লাভের টাকা আসবে কি না তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।

মিষ্টিকুমড়া আনা-নেওয়ার কাজে ব্যস্ত দীন ইসলাম জানান, দূর-দূরান্তের জমি থেকে বিশাল ওজনের কুমড়া নিয়ে আসেন তিনি। এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক পান। দুই মাসের জন্য শরীয়তপুর থেকে এসেছেন। চুক্তি হিসেবে এ পর্যন্ত সাত হাজার টাকা পেয়েছেন।

স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, বিলে প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে ধান চাষ করা হয়। এখানকার কুমড়া প্রসিদ্ধ। বর্ষায় ডুবে থেকে এখানে পড়ে পলির আস্তর, তাই ভূমি খুব উর্বর। মুন্সীগঞ্জের অন্যান্য এলাকা থেকে এখানে খাদ্যশস্যের উৎপাদন তুলনামূলক বেশি। বর্ষায় এ বিল হয়ে ওঠে মাছের ভাণ্ডার। আড়িয়াল বিলের সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষের সম্পর্ক কেবল চাষাবাদের জন্য নয়, শত বছরের আড়িয়াল বিলের সঙ্গে মিশে আছে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার চিত্র।

মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক শৈবাল বশাক বলেন, মিষ্টিকুমড়ায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ। বিটাক্যারোটিন সমৃদ্ধ এই সবজিটি তাই চোখের জন্য খুবই ভালো। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ মিষ্টিকুমড়া ক্যানসার প্রতিরোধে সাহায্য করে। খাদ্যতালিকায় নিয়মিত মিষ্টিকুমড়ার উপস্থিতি আপনাকে রাখতে পারে অনেক অসুখ-বিসুখ মুক্ত। এ ছাড়া মিষ্টিকুমড়ায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলে সর্দি-কাশি, ঠান্ডা লাগা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। শরীরের ফ্রি রেডিক্যাল ড্যামেজ প্রতিরোধে মিষ্টিকুমড়া ভূমিকা পালন করে। ফ্রি রেডিক্যাল ড্যামেজের ফলে শরীরের ভালো কোষগুলো নষ্ট হতে শুরু করে এবং খারাপ কোষের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। বিভিন্ন দূষণ, স্ট্রেস ও খাবারে যেসব কেমিক্যাল ও ক্ষতিকর উপাদান থাকে, সেগুলোর কারণে ফ্রি রেডিক্যাল ড্যামেজ হতে শুরু করে।

মুন্সীগঞ্জে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. হুমায়ূন কবীর বলেন, শীত মৌসুমে আড়িয়াল বিলের মিষ্টিকুমড়ার চাহিদা অনেক বেশি থাকে। যেকোনো সমস্যা সমাধানে কৃষি অধিদপ্তর পাশে আছে চাষিদের। যেকোনো রকমের পরামর্শ দিয়ে তাদের সহায়তা করা হয়ে থাকে।

হুমায়ূন কবীর বলেন, আড়িয়াল বিলের বেশিরভাগই চাষি মিষ্টিকুমড়ার আবাদ করে থাকেন। বর্ষার পানি নেমে গেলে কচুড়িপানা স্তূপ করে কুমড়ার চারা লাগানো হয়। আশ্বিন মাস থেকে শুরু হয় এর চাষাবাদ। ফাল্গুন মাসের শেষ পর্যন্ত চলে কুমড়া বিক্রি। অনেকেই বীজ সংরক্ষণের জন্য নিজ বাড়িতেও কুমড়া সংরক্ষণ করে থাকেন। জমিতে কুমড়ার সঙ্গে অন্যান্য সবজিও এর সঙ্গে চাষ করা হয়। এখানকার মিষ্টিকুমড়া ৮০ থেকে ৮৫ কেজি পর্যন্ত ওজন হয়ে থাকে। পরিপক্ব হলে বিক্রির উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় চলে যায়। গাদিঘাটের আড়িয়াল বিল অংশে ২৭০ হেক্টর জমিতে এসব কুমড়া চাষ হয়। গত বছর আড়িয়াল বিল থেকে ১১ হাজার ৩৪০ টন কুমড়া উৎপাদন হয়েছে।

এনটিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.