ফ্যাশন ওয়ার্ল্ড টোকিও ২০১৮

রাহমান মনি: জাপানের রাজধানী টোকিওর ইভেন্ট প্লাজা “টোকিও বিগ সাইট”-এ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল “ফ্যাশন ওয়ার্ল্ড টোকিও ২০১৮”। ৪, ৫ ও ৬ মে ‘১৮ টানা তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত ফ্যাশন জগতের মেলায় ৩৫টি দেশের ৮৩২টি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করেছিল। আয়োজনে ২২,৯০৯ জন ভিজিটরের (দর্শনার্থী এবং ক্রেতা) পদচারণা পড়েছিল। যদিও আয়োজকদের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার ভিজিটরের পদচারনার প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তথাপি এবারের ভিজিটর এর সংখ্যা গত আয়োজনের চেয়ে প্রায় ৫,০০০ বেশি। প্রদর্শকদের সংখ্যা ছিল গত আয়োজনের চেয়ে ৩৫টি বেশি।

টোকিওকে বলা হয়ে থাকে ফ্যাশন ভুবনের অন্যতম বৃহত্তম বাজার। তাই, এই বাজারকে ঘিরে উদ্যোক্তাদের নজর একটু বেশি-ই থাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম ছিল না।

এবারের আয়োজনে কোনো নির্দিষ্ট কোনো দেশকে থীম কান্ট্রি হিসেবে রাখা হয়নি। তবে বাংলাদেশ, জার্মান, চায়না, ভারত এবং আয়োজক দেশ হিসেবে জাপানকে বিশেষ প্রাধান্য দেওয়া হয়। মেইড ইন জাপান এর দিকে সাধারণ দর্শকদের একটু বেশি নজরে পড়লেও বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে আগ্রহী ক্রেতা এবং বিভিন্ন দেশের উদ্যোক্তাদের পদচারণা বেশি-ই ছিল এবং বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নটি ছিল আয়োজন প্রাঙ্গণের সবচেয়ে বড় প্যাভিলিয়ন।

বাংলাদেশ থেকে এবার সর্বাধিকসংখ্যক উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করেছিল। যার বেশিরভাগই ছিল নিটওয়্যার ও চামড়া শিল্পপ্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ থেকে ৪৪টি নিটওয়্যার ও চামড়া শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের উৎপন্ন পণ্যের প্রসার নিয়ে ৬০ জন প্রদর্শক ফ্যাশন ওয়ার্ল্ড টোকিও আয়োজনে অংশ নেন। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অফ কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি অংশ নেয়।

৪ এপ্রিল বুধবার রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা ফিতা কেটে বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নের শুভ উদ্বোধন করেন। এ সময় বাংলাদেশ নিটওয়ার মেন্যুফেকচার এন্ড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) সভাপতি সেলিম ওসমান উপস্থিত ছিলেন। সেলিম ওসমান নিজেও তার প্রতিষ্ঠান ওইসডম আত্তিরেস লিমিটেড এর পণ্যসামগ্রী নিয়ে ফ্যাশন ওয়ার্ল্ড এ সস্ত্রীক অংশগ্রহণ করেছেন।

ফ্যাশন ওয়ার্ল্ড অংশ নেয়া আস্যেলন নীট কম্পজিট লিমিটেড সূত্রে জানা যায় এবারের আয়োজনে তারা তৃতীয় বারের মতো অংশ নিয়েছেন। অন্যান্য বারের তুলনায় এবার তারা বেশি রেসপন্স পেয়েছেন জাপানি ক্রেতাদের কাছ থেকে। তবে, এবার সরাসরি কোনো অর্ডার পাননি। জাপানি ক্রেতারা আগ্রহ প্রকাশ করেছেন,বাংলাদেশ যাবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কেহবা পরে যোগাযোগ বলে জানিয়েছেন। এই বুথে জাপানিদের আগ্রহের অন্যতম কারণ ছিল প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট খান জাকির দীর্ঘদিন জাপানে বসবাস করার কারণে জাপানি ভাষা রপ্ত থাকা।

বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো মেলায় বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের সার্বিক তত্ত্বাবধান ও একই সাথে নেতৃত্ব দিয়েছিল। অংশগ্রহণকারী ব্যবসায়ীরা মতপ্রকাশ করে বলেন, এই আয়োজনে অংশগ্রহণ করার মধ্যে দিয়ে তারা জাপানিসহ অন্যান্য দেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পরিচয়, মতবিনিময় ও অধিকসংখ্যক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। মেলাটি জাপান- বাংলা দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম প্ল্যাটফর্ম হিসেবে রূপ নেবে বলেও বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা মনে করেন।

মেলার পাশাপাশি ৪ এপ্রিল সকালে মেলার সেমিনার ভেন্যুতে বাংলাদেশের নিটওয়্যার ও জাপানে বাংলাদেশের নিটওয়্যারের সম্ভাবনা নিয়ে এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ দূতাবাস, বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়; বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর উদ্যোগে আয়োজিত সেমিনারে সহযোগিতা করে জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো), ইউনাইটেড ন্যাশনস ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইউনিডো) ও টোকিও চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন এবং জাপান টেক্সটাইল ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন। প্রায় এক শ জাপানি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান সেমিনারে যোগদান করেন।

সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা। তিনি বলেন, জাপানে বাংলাদেশি উন্নতমানের পণ্যসামগ্রীর বাজার সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই মেলা জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য সম্পর্ক আরও গভীর করতে সহায়তা করবে বলে রাষ্ট্রদূত দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বিকেএমইএর পক্ষ থেকে বাংলাদেশে নিটওয়্যারের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। এ ছাড়া নিবন্ধ উপস্থাপনা করেন জেট্রোর সিনিয়র পরিচালক তাকাশি সুজুকি ও মারুহিসা কোম্পানির প্রেসিডেন্ট মাশাহিরু হিরাইশি। আলোচকেরা বাংলাদেশে বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ এবং বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধার কথা সবার কাছে তুলে ধরেন।

৭ এপ্রিল শনিবার সন্ধ্যায় ফ্যাশন ওয়ার্ল্ড টোকিও ২০১৮ অংশ নেয়া ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সৌজন্যে বাংলাদেশ চেম্বার অফ কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি ইন জাপান (বিসিসিআইজে) নৈশ ভোজের মাধ্যমে এক অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

টোকিওর অজি হোকু তোপিয়া আসুকা হলে আয়োজিত অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিসিসিআইজে সভাপতি বাদল চাকলাদার। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সফররত বিকেএমইএ সভাপতি সেলিম ওসমান (এমপি)।

অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের সাবেক রাষ্ট্রদূত হোরিগুচি মাতসুশিরো, বাংলাদেশ দূতাবাসের কমার্শিয়াল কাউন্সেলর মোহাম্মদ হাসান আরিফ, প্রেস সচিব মোঃ শিপ্লু রহমান এবং সর্ব স্তরের জাপান প্রবাসী ব্যবসায়ীরা ছাড়াও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন শামীম আহসান জোসেফ। জাপান প্রবাসীদের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন ফজর আলী, সুখেন ব্রহ্ম, এমডি. এস. ইসলাম নান্নু, আব্দুর রাজ্জাক, মীর রেজাউল করিম রেজা, সালেহ মোঃ আরিফ, কাজী ইনসানুল হক, জিয়াউল ইসলাম, বাদল চাকলাদার প্রমুখ। অতিথিদের পক্ষে বক্তব্য রাখেন সেলিম ওসমান (এমপি)।

দূতাবাসের কমার্শিয়াল কাউন্সেলর মোহাম্মদ হাসান আরিফ সাম্প্রতিক সময়ের বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার বিভিন্ন ডাটা তুলে ধরেন। তিনি জাপানে বাংলাদেশ গার্মেন্টস শিল্পের অপার সম্ভাবনার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সেলিম ওসমান (এমপি) বিসিসিআইজে এবং নারায়ণগঞ্জ চেম্বার যৌথভাবে বাংলাদেশে উৎপন্ন পণ্য জাপানের বাজার পাওয়ার জন্য কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.