পঞ্চগড় থেকেই পিছু নেয় খুনিরা, জড়িত জেএমবি: প্রকাশক বাচ্চু হত্যা

মঠের অধ্যক্ষ খুনের পর বাড়ি বিক্রি করে মুন্সীগঞ্জে চলে আসেন
মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত লেখক, প্রকাশক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও সাবেক সিপিবি নেতা শাহজাহান বাচ্চুকে প্রায় দুই বছর আগে পঞ্চগড়ে হত্যার টার্গেট করে জঙ্গিরা। আনসার আল ইসলাম নয়, জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) জঙ্গিরাই তাঁকে হত্যা করেছে। কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের ছায়াতদন্তে চাঞ্চল্যকর এই হত্যার রহস্য নতুন মোড় নিয়েছে। তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, পুরনো জেএমবির সদস্যরা জড়িত বলেই কোনো গোষ্ঠী এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেনি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রাথমিকভাবে এই হত্যাকাণ্ডে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলাম (সাবেক এবিটি) জড়িত বলে ধারণা করা হয়। তবে বাচ্চুকে একা পেয়েও জঙ্গি সংগঠনটির নিজস্ব পদ্ধতির (গলা কেটে) পরিবর্তে গুলি করায় সন্দেহ তৈরি হয়। পরে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এলআইসি শাখা, সিটিটিসি ও বগুড়া জেলা পুলিশের যৌথ দল এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে পুরনো জেএমবি জড়িত বলে কিছু তথ্য পায়। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় শাহজাহান বাচ্চু ‘শুদ্ধ চর্চা কেন্দ্র’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন। সেখান থেকেই জেএমবি তাঁকে টার্গেট করে। এসব তথ্যের সূত্র ধরেই রবিবার ভোরে গাজীপুরের মাওনার একটি বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। সেখানে আব্দুর রহমান পরিচয় দিয়ে বাড়ি ভাড়া নেওয়া এক জঙ্গি বাচ্চু খুনের সঙ্গে জড়িত। তার গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে।

সিটিটিসির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অভিযানে জঙ্গিদের গ্রেপ্তার না করা গেলেও জেএমবির বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। নব্য জেএমবি কোনো ঘটনা ঘটালে দায় স্বীকার করে। পুরনো জেএমবি দায় স্বীকার করে ঘোষণা দেয় না।’

বাচ্চুর দ্বিতীয় স্ত্রী আফসানা জাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁর বাবার গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়। তাঁদের বাড়ির পাশে অনেক বছর আগেই জমি কিনেছিলেন বাচ্চু। এরপর সেখানে বাড়িও করেন। ওই বাড়িতে আফসানা জাহানের মা (বাচ্চুর শাশুড়ি) স্থায়ীভাবে থাকতেন। সেখানেই তিনি লাইব্রেরির মতো লেখাপড়ার প্রতিষ্ঠান শুদ্ধ চর্চা কেন্দ্র চালাতেন। ২০১৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পাশের উপজেলা দেবীগঞ্জে মঠের অধ্যক্ষকে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনার পর জেএমবির তিন জঙ্গি ধরা পড়ে। এরপর বাচ্চু স্বজনদের কাছে তাঁর ওপর হুমকি আছে বলে জানান। একপর্যায়ে জমি বিক্রি করে নিজ গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জে চলে আসেন।

হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘তদন্তে শতভাগ অগ্রগতি এখনো নেই। তবে কিছু ক্লু নিয়ে আমরা কাজ করছি। উগ্রপন্থীদের বিষয়েই কাজ চলছে।’ সিটিটিসির এক কর্মকর্তা বলেন, মাওনা থেকে পালিয়ে যাওয়া জঙ্গিসহ কয়েকজন বাচ্চু খুনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। এরা নতুন কৌশলে হামলাটি চালিয়েছে। হামলাকারীদের মধ্যে নব্য জেএমবিসহ ভিন্ন সংগঠনের জঙ্গিরাও থাকতে পারে। কারণ সম্প্রতি জঙ্গি সংগঠনগুলো একসঙ্গে মিলে হামলা করছে বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।

মানববন্ধন : এদিকে শাহজাহান বাচ্চুর হত্যা এবং বিক্রমপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও কালের কণ্ঠ’র মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি মাসুদ খানের ওপর মাদকসেবীদের হামলার প্রতিবাদ ও দোষীদের বিচার দাবিতে গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করা হয়েছে। ঢাকাস্থ মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর সাংবাদিক ফোরাম ও বিক্রমপুর প্রেস ক্লাবের আয়োজনে এ কর্মসূচি পালিত হয়। মানববন্ধনে মুন্সীগঞ্জের দৈনিক সভ্যতার আলোর সম্পাদক মীর নাসির উদ্দিন উজ্জ্বল ও ভোরের কাগজ শ্রীনগর প্রতিনিধি অধীর রাজবংশীর ওপর হামলাকারীদেরও বিচার দাবি করা হয়।

কালের কন্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.