জাপানের ইতিহাসে গ্রামীণ সংস্কৃতি

রাহমান মনি: বাহ্যিক চাকচিক্যে যেমন মানুষের আসল রূপ চেনা যায় না, প্রকৃত মূল্যায়ন হয় না, তেমনি কোনো দেশের শহরকেন্দ্রিক চাকচিক্যে সেই দেশকে প্রকৃতভাবে জানা যায় না। যেতে হয় গ্রামে, মিশতে হয় গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে। জাপানের বেলাতেও তাই-ই।

২০১৯ সালে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপ রাগবী প্রতিযোগিতা এবং ২০২০ সালে টোকিওতে অনুষ্ঠিতব্য গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক এবং প্যারা অলিম্পিক আসরকে সামনে রেখে জাপান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং স্থানীয় সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় জাপানে বহির্বিশ্বের পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বিভিন্ন প্রিফেকচার (প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে জাপানি প্রদেশ বা স্বনির্ভর সরকার)-এর পরিচিতি ক্যাম্পেইন শুরু হয় ২০১৬ সাল থেকে।

‘দি ফার্স্ট রিজিওনাল প্রমোশন সেমিনার ইন ফিসক্যাল ২০১৮’ নামে অভিহিত ধারাবাহিক সেমিনারে এবারে পরিচিত করানো হয় ইয়ামাগুচি প্রদেশের হাগি শহর, নিগাতা প্রদেশ, নাগাসাকি প্রদেশের গোতো দ্বীপপুঞ্জ এবং হিয়োগো প্রদেশের ইয়াবু শহরকে।

২১ জুন ২০১৮ বৃহস্পতিবার জাপানের অভিজাত হোটেল ‘চিনজানসো’তে আয়োজিত সেমিনারে জাপানে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, কূটনীতিকবৃন্দ, বিশ্ব মিডিয়ার জাপান প্রতিনিধিগণ, সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধিগণ, জাপান মিডিয়া এবং সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্মকর্তা ওকাদা স্বাগতিক এবং সূচনা বক্তব্য রাখেন।

বিদেশি মিডিয়া বন্ধুদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বিলেন, মিডিয়া বন্ধুদের কাছে আমাদের আহ্বান থাকবে আপনারা আপনাদের মিডিয়াসহ টুইটার, ইন্সটাগ্রাম, ভাইভার, ফেসবুক সামাজিক মাধ্যমেও তা প্রচার করার ব্যবস্থা নেবেন দয়া করে।

এরপর হাগি সিটি, নিগাতা প্রদেশ, গোতো দ্বীপপুঞ্জ এবং ইয়াবু সিটিকে তুলে ধরেন স্ব স্ব প্রতিনিধিগণ।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনযো আবের জন্ম শহর ইয়ামাগুচি প্রদেশের হাগি সিটির রয়েছে ৪০০ বছরের ইতিহাস। ১৬০৮ সালে সম্রাট মোরি ক্লেন (জাপানিজ নাম ‘গেনজি’) এঁদো যুগে মাউন্ট শিযুকির প্রাদদেশে হাগি দুর্গ স্থাপন করেন।

জাপান মৃৎ শিল্পের স্বর্গ হিসেবে হাগি সিটি এখনো প্রসিদ্ধ। এছাড়া গ্রীষ্মকালীন কমলা (জাপানিজ নাতসুমিকান) এবং জাপানিজ সুশির হামাদাই জাপানের এক নাম্বার স্থানে রয়েছে হাগি শহর।

প্রতি বর্গকিলোমিটার এ মাত্র ৬৭.৩ জন বসবাসকারী হাগি সিটিতে বছরে ২৪,০০,০০০ পর্যটকের পদধূলি পড়ে। এখানকার ঐতিহাসিক স্থানগুলো দর্শন করতেই এত বিপুলসংখ্যক পর্যটক হাগি শহরে যান।

জাপানের সবচেয়ে সুপেয় পানির উৎস হচ্ছে নিগাতা প্রদেশ। ‘বিশ্বের কৃষি গবেষণার অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠান নিগাতা বিশ্ববিদ্যালয়’। নিগাতার কোশী হিকারি ব্র্যান্ডের চাল জাপানজুড়ে বিখ্যাত। কৃষি সম্পদের ভা-ার হিসেবে দেখা হয় নিগাতাকে।

নিগাতা প্রদেশ জাপানের এলকোহল উৎপাদনে তৃতীয় স্থান দখল করে আছে। জাপান সরকার দ্বারা পরিচালনার বাহিরে নিগাতা হচ্ছে একমাত্র প্রদেশ যেখানে স্বতন্ত্রভাবে এলকোহল নিয়ে গবেষণাগার রয়েছে। নিগাতা প্রাদেশীয় সরকার এবং নিগাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ পরিচালনায় সাকে ফ্রম নিগাতা টু দ্যা ওয়ার্ল্ড : দ্যা বার্থ অফ ‘সাকেওলজি’তে দেশি বিদেশি বহুসংখ্যক শিক্ষার্থী এলকোহল নিয়ে গবেষণা করে থাকেন। বর্তমানে ৮২০ জন বিদেশি শিক্ষার্থী সেখানে গবেষণারত।

নিগাতা প্রদেশটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে বিখ্যাত আরেকটি কারণে। টোকিওতে পশু জবাই নিষেধ থাকার কারণে নিকটে নিগাতাতে বেশ খামার থাকার কারণে কোরবানির ব্যবস্থাটি সেখানেই করা হয়ে থাকে। এছাড়াও সেখানে প্রচুর ‘রিসোর্ট’ রয়েছে।

জাপানের নাগাসাকির কথা শোনেননি এমন লোক খুব কমই রয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসাবলি নাগাসাকিকে বিশেষ পরিচিতি এনে দিয়েছে। পশ্চিম জাপানের গোতো দ্বীপপুঞ্জ নাগাসাকি প্রদেশেরই অন্তর্ভুক্ত।

গোতো দ্বীপপুঞ্জকে জাপানের খ্রিস্টান তীর্থভূমি হিসেবে দেখা হয়। যার সূচনা হয়েছিল ১৫৮৭ সালে। জাপানে খ্রিস্টানদের সবচেয়ে বেশি প্রার্থনালয় এই দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত, এই জন্য গোতো দ্বীপপুঞ্জকে প্রার্থনার পুণ্যভূমি হিসেবে বলা হয়ে থাকে। ১৬ শতাব্দীতে তা পূর্ণতা লাভ করে। একপর্যায়ে স্থানীয়দের বাধার কারণে ধর্ম প্রচারকারীরা ১৭ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে মূল ভূখ- কিয়ুশুতে পালিয়ে আসা শুরু করে এবং ১৮ শতাব্দীতে সম্পূর্ণভাবে পালাতে সক্ষম হন।

গোতো দ্বীপপুঞ্জর মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি ৬৫ বৎসর বা তারও বেশি। বয়স্ক জনসংখ্যার ভারে কর্মক্ষমতাসম্পন্ন জনসংখ্যা ক্রমাগতভাবে হ্রাস স্থানীয় প্রশাসনকে ভাবিয়ে তুলেছে।

জাপানের সমুদ্রবন্দর খ্যাত হিয়োগো প্রদেশে ছোট্ট ছিমছাম শহরের নাম ইয়াবু। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা সবুজ শহর ইয়াবু সিটিকে বলা হয় ‘ম্যাজিক অব স্পাইস’-এর শহর।

প্রতি কিলোমিটারে ৫৮ জন বসতির ইয়াবু শহর ‘আসাকুরা সানশো’ (অংধশঁৎধ ঝধহংযড়) নামক একটি মসলা যা খাবারে স্বাদে ভিন্নতা এনে দেয়, তা উৎপাদনে জাপান খ্যাত। সবুজ ছোট দানাদার (অনেকটা ধনের মতো দেখতে) এই শস্য, স্থানীয়রা যাকে ‘গ্রিন ডায়মন্ড’ হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে।
সেমিনারে ১৭০ জন প্রতিনিধি অংশ নিয়ে থাকে। যার মধ্যে ৬০ জন কূটনীতিক উপস্থিত ছিলেন।

rahmanmoni@kym.biglobe.ne.jp

সাপ্তাহিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.