বর্ষার শুরু আষাঢ়ে, যার শেষ শ্রাবনে: শ্রাবনের ধারার মতো পড়ুক ঝরে

বীরমুক্তিযোদ্ধা কামাল উদ্দিন আহাম্মেদ: আষাঢ়ের কদম ফুল আর শ্রাবনের ধারা, আষাঢ় শ্রাবন দুই মাস বর্ষাকাল, বর্ষা মানে বৃষ্টি আর হাঊর-বিল-খাল-নদী-নালায় থৈ থৈ স্বচ্ছ পানি, বর্ষার আগমনী মাস আষাঢ়, আষাঢ়ের অজরধারা বৃষ্টির ঢলের পানিতে খাল-বিল-হাউর ভরে উঠে- রাস্তা ঘাট পানিতে তলিয়ে যায়, মাঝে মাঝে চলে রোদ-বৃষ্টির লোকোচুরি খেলা। শ্রাবন মাসে আকাশ ভরে থাকে মেঘে, ৫/৭ দিন ধরে চলে বৃষ্টির অজরধারা, ভারতীয় পঞ্জিকা মতে রথযাত্রা থেকে বৃষ্টিপাত শুরু, রথের বৃষ্টি পথে পথে, রথের পর এক নাগাড়ে সাত দিন বৃষ্টি, দেব-দেবীর সাত কন্যার পাড়ি জমায় শশুর বাড়ি, তারপর আমাবিচি পুরো শ্রাবন মাস জুড়ে বৃষ্টি, এই ক্লান্তহীন বৃষ্টিই শ্রাবনের ধারা, বিশ্বকবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের কবিতায় বলে ছিলেন, শ্রারনের ধারার মতো পড়ুক ঝরে। শ্রাবনের শেষে ভেলা ভাসানোর মধ্যদিয়ে নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করে, সাথে সাথে বৃষ্টির পরিমানও কমে আসে।

আসলে বর্ষাকাল বাংলা সাঁজে প্রাকৃতির ভিন্ন এক অপরুপ সাঁজে, শহরজীবনে ততটা অনুভব করা যায় না,শহরের ইট পাথরের খুপরিতে বসে বৃষ্টির রিমিঝিমি শব্দ যানবাহনের বিকট শব্দে বিলীন হয়, চলার পখে যানঝটে আটকে পড়া,বাড়ি ফেরার তাড়া, কখনও হাটার পথে দ্রুতযান ছুটে চলার সময় আপনার গতর ময়লা পানিতে সয়লাপ করে দিয়ে যাবে, আপনার মন বিষাদে ভরে যাবে, বর্ষাকে নিয়ে ভাববার কিছু থাকবে না মনে। শহরের অপ্রতুল ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারনে বৃষ্টির পানি ড্রেনের দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে মিশে পীচডালা পথ ভাসিয়ে দিয়ে যাবে, এই ময়লা পানিতে কখনও পায়ে হেঁটে, রিস্কায়,অটো,বাস বা নিজস্ব গাড়ীতে চড়ে জরুরী কাজে নাকে কাপড় দিয়ে চলাফেলা করতে হয়, বর্ষা তখন আপনার কাছে আর্শিবাদ না হয়ে অভিশাপ হয়ে ধরা দেয়। তাই শহুরে জীবনে অধিকাংশ মানুষ বিশ্বকবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের কবিতার শ্রারনের ধারার মতো পড়ুক ঝরে- অর্থহীন হয়ে পড়ে। তারপরও কিছু সংগঠন রমনা বটমুলসহ বিভিন্ন স্থানে বর্ষা উৎসব করে শহুরে জীবনেও বর্ষাকে, শ্রাবনের অপরুপ ধারাকে ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে, তবে আমার কাছে এই উৎসব মনে হয়, কাকের ময়ুর পুচ্ছ ধারন।

বাংলার প্রাকৃতির বর্ষা- “শ্রাবনের ধারার মতো পড়ুক ঝরে” এর চোখ জুড়ানো মন ভুলানো অপরুপ দৃশ্যেকে খুঁজে পেতে আপনাকে গ্রাম-বাংলায় যেতে হবে, যেখানে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দের সাথে বাঁজবে ব্যঙের ঘ্যানর ঘ্যান শব্দ আর সন্ধায় ঝি ঝি পোকার সুর লহরী, টিনের চালে বৃষ্টির টাপুর টুপুর শব্দ, উঠুনে জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে শিশুরা ভাসাবে কাগজের নৌকা, মায়ের বকনী ঐ খোকা ঘরে আয়- পানিতে ভিজলে জ্বর আসবে। কৃষক বৃষ্টিতে জমিতে নালা কেটে বৃষ্টির জমে থাকা পানি নামাতে চেষ্টা করছে, বৃষ্টিতে ভিজে রাখাল গরুর পাল নিয়ে বাড়ি ফিরছে, বেদেরা-জেলেরা বৃষ্টিতে ভিজে নদী-খাল-বিলে মাছ ধরছে, সাপলা কুড়াতে কোষা নোকায় চড়ে হাউর-বিলে ডুবে ডুবে সাপলা তুলে নৌকায় ভরছে, এই দৃশ্য গ্রাম বাংলা ছাড়া উপভোগ করা সম্ভব নয়। শ্রাবনের অজরধারায় যখন ঘরে বন্ধি, তখন মায়ের হাতের তৈরী ভর্তার দিয়ে গরম গরম খিচরী, কখনও চাউল-খুঁদ ভাঁজা- আবার কখনও চাউলের তৈরী পাতা পিঠা ভাঁজা গরম গরম খেতে কি মজা, শহরের ফাষ্ট ফুডের চেয়ে ঢের মজা।

বর্ষার পানিতে বিলে-নদৗতে নৌকায় চড়ে ঘুড়ে বেড়ানো, তখন নদীর ধারে-জংলী ফুলেরা মিষ্টি হাঁসিতে আপনাকে স্বাগত জানাবে। বর্ষায় গ্রাম বাংলা সাঁজে এক বৈচিত্রময় অপরুপ সাঁজে যা বহে চলে শ্রাবনের ধারার মতো বর্ষাকাল জুড়ে।

লেখক: সম্পাদক, চেতনায় একাত্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.