সিরাজদিখানে আলুতে লোকসান, হতাশ কৃষক

সিরাজদিখানে কয়েক দিনের মধ্যে শুরু হবে আলু রোপণ। একসময় এ দেশে আলু বলতে গেলে একনামে মুন্সীগঞ্জ জেলা। জেলার প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে আলুর ব্যাপক চাষ হলেও গত কয়েক বছর ধরে আলুর ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় আলু চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে অধিকাংশ কৃষক। জেলার ৬ টি উপজেলার মধ্যে সিরাজদিখান উপজেলা সব চেয়ে বেশী আলু চাষ হয়। উপজেলার আলু চাষিরা এখন হতাশায় দিন কাটাচ্ছে। বীজ, পরিবহন, শ্রমিক, সার, কীটনাশক, হিমাগার সংরক্ষণসহ উৎপাদন খরচ বাজার মূল্যের বেশী হওয়ায় আলু রোপণ করে লাভের মুখ দেখছেনা এ অঞ্চলের কৃষকরা। উপজেলায় এ বছর আলুতে লোকসান প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা। এ অবস্থা চলমান থাকলে অদূর ভবিষ্যতে জেলা থেকে আলু চাষ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। উপজেলার ১৪ টি ইউনিয়নের কৃষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ জানান আলু চাষে ধারাবাহিক ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে আলু চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে এ অঞ্চলে কৃষকরা।

কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গড় হিসেবে আগাম আলু চাষে ১ কানি (১৪০ শতক) জমিতে ৪শত মণ প্রায় ২শত বস্তা আলু হয়। এক কানি জমিতে আলু রোপণ থেকে শুরু করে কোল্ড স্টোরেজ ভাড়াসহ ২শত বস্তা উৎপাদন খরচ হয় ২ লাখ ৬০ হাজার থেকে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত। বর্তমান ২শত বস্তা আগাম আলুর দাম ২ লক্ষ ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা। আলুর বাজার অনুসারে আগাম আলুতে কানিতে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে। অতিরিক্ত বৃষ্টির কারনে সঠিক সময়ে আলু রোপণ করতে না পারায় লামি জমি আলু উৎপাদন খরচ একই হয়ে থাকে। বর্তমান বাজারে লামি জমির আলু ১ কনিতে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা লোসকান গুনছে কৃষকরা। আবার পাইকাররা লামি আলু কিনতে চাচ্ছেনা।

অন্যদিকে সময় মত কোল্ড স্টেরেজের সংরক্ষণ করতে না পারায় বাধ্য হয়ে স্থানীয় পদ্ধতিতে আলু মজুত করে থাকে। এ পদ্ধতিতে আলু পচাসহ ওজন কমে যায়। এখানেও কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবছর থেকে হিমাগার গুলো নতুন নিয়মে বড় বস্তার পরিবর্তে ছোট বস্তা। ব্যবহার কারায় খরচের পরিমান বাড়বে। তবে বড় সমস্যা কারণ আলুর স্ক্যাব রোগের স্থায়ী সমাধান পায়নি কৃষকরা।

উপজেলার কৃষি অফিস সূত্র জানা যায়, উপজেলার আলু রোপণের আদর্শ সময় নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত। গত বছর আলু চাষ হয়েছে ৯ হাজার ৪ শত ৫০ হেক্টর জমিতে। এবছর ৯ হাজার ২০০ শত হেক্টর লক্ষ্যমাত্র জমিতে আলুচাষ হতে পারে। গত বছরের তুলনায় ২ শত পঞ্চাশ হেক্টর জমি আলু চাষ কম হবে। উপজেলায় এ বছর বীজ আলুর লাগবে ২০ হাজার মেট্রিকটন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলায় ১০টি কোল্ড স্টোরেজ (হিমাগার) এবছর আলু সংরক্ষণ হয়েছে ৮ লক্ষ ৬৪ হাজার বস্তা বা প্রায় ৬৯ হাজার ১২০ মেট্রিকটন। এর মধ্যে খাবার আলু ৭ লক্ষ ৩১ হাজার বস্তা বা প্রায় ৫৮ হাজার ৪৮০ মেট্রিকটন ও বীজ আলু ১ লক্ষ ৩৩ হাজার বস্তা বা প্রায় ১০ হাজার ৪০ মেট্রিকটন। বর্তমানে খাবার আলু কোল্ড স্টোরেজে মজুত রয়ে গেছে ২ লক্ষ ৯৮ হাজার বস্তা বা ২৩ হাজার ৪৬৫ মেট্রিকটন। অন্যদিকে আলু চাষে অতিরিক্ত বালাইনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করছে এবং জৈব সার কম ব্যবহার করছে। একই জমিতে বছরের পর বছর আলু চাষ করছে ফলে জমির একটি নির্দিষ্ট স্থানের উদ্ভিদের জন্য খাবার কমে যাচ্ছে। বিভিন্ন খাল-বীল ভরাট ও সংস্কারের অভাবে বর্ষার মৌসমে জমিতে পানি না উঠায় জমিতে পলিমাটি পরছে না। দিন দিন ফলন কমে যাচ্ছে আলুতে দাউদসহ বিবিন্ন রোগ দেখা দিচ্ছে। উত্তর বঙ্গের বেশ কয়েকটি জেলায় আলু জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আলুর উৎপাদন খরচ কম হয়। ফলে আলু কম দামে বিক্রয় করছে। কৃষক আসরাফুল ইসলাম জন্টু জানান, আমি প্রতি বছর ২০ কানি জমি আলু চাষ করি। গত ৩ বছর ধরে আলুর দাম কম থাকায় আমার প্রায় ১ কোটি টাকার মত লোকসান হয়। এখন আর আলুর উপর ভরসা করা যায় না। তাই গরুর খামার দিয়েছি। একাধিক কৃষক জানান গত কয়েক বছর যাবত এ শত শত কোটি টাকা লোকসান গুনছে অঞ্চলে কৃষকরা।

উপজেলার কৃষি কর্মকতা সুবোধ চন্দ্র রায় বলেন, বাংলাদেশে এখন আলুর চাহিদার চেয়ে উৎপাদন বেশি রয়েছে। এখন আমরা কৃষকদেরকে আলুর পাশা পাশি অন্যআন্য ফসল ও সবজি আবাদ করার জন্য পরামর্শ দিচ্ছি। এখানে একটি সবজির কোল্ড স্টোরেজ থাকলে সবজি আবাদে কৃষক আরো উৎসাহ হত।

ভোরের ডাক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.