ছন্দ নেই অনেক অভিবাসী পরিবারে, সচ্ছলতা আছে!

১৩ বছর বয়সে বিয়ে হয় সুরভি আক্তারের (২৫)। বিয়ের এক বছর পর স্বামী শেখ উজ্জ্বল (৩৫) পাড়ি জমান সৌদি আরবে। সে সময় সুরভি এক মাসের অন্তঃসত্ত্বা। স্বামী দেশে না থাকায় গর্ভকালীন একবারও চিকিৎসকের কাছে যাওয়া হয়নি তার। সন্তানের বয়স যখন ছয়, তখন প্রথম দেশে আসেন উজ্জ্বল। বিদেশে যাওয়ার পর প্রতি মাসে নিয়মিত টাকা এসেছে। কিন্তু ১২ বছরের বিবাহিত জীবনে তিনি দেশে এসেছেন মাত্র তিনবার। দুই সন্তান নিয়ে একাই সংসার সামলাতে হচ্ছে সুরভি আক্তারকে।

নার্সারিতে পড়ার সময় প্রথম বাবাকে দেখে জান্নাতুল ফেরদৌস (১১)। এতদিন পর্যন্ত তার কাছে ‘আব্বা’ মানে ছিল ছবি। আকাশ দিয়ে উড়োজাহাজ গেলেই চিত্কার করে বলত, নামো, আমাকে আব্বার কাছে নিয়ে যাও। এখন জান্নাতুল পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। এখন জানে, বাবা মানে ছবি নয়, মোবাইলের অন্য পাশের একটা কণ্ঠ। তবে উড়োজাহাজের পেছনে ছোটা এখনো বন্ধ হয়নি তার।

অভিবাসীদের পাঠানো টাকায় এসব পরিবারে সচ্ছলতা এসেছে ঠিক। তবে বছরের পর বছর ছন্দহীন জীবন কাটাচ্ছেন সুরভি আক্তার, জান্নাতুল ফেরদৌসের মতো অভিবাসী পরিবারগুলোর সদস্যরা। ছোট-বড় নানা প্রতিকূলতার মধ্যেই চলতে হচ্ছে তাদের।

সবচেয়ে বেশি অভিবাসন হয়েছে দেশের যেসব জেলা থেকে, সেগুলোর একটি মুন্সীগঞ্জ। যে ২০টি জেলা থেকে সবচেয়ে বেশি মানষ বিদেশে গেছেন মুন্সীগঞ্জ তার মধ্যে ১৫তম। জেলার শ্রীনগর উপজেলার পশ্চিম পাউসার প্রায় সব বাড়িরই কেউ না কেউ কোনো না কোনো দেশে কাজের খোঁজে গেছেন। এ গ্রামেরই মেয়ে সুরভি আক্তার। স্বামী শেখ উজ্জ্বল আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ঋণ করে বিদেশে গেছেন। প্রথম দিকে আর্থিক অনটন থাকলেও এখন সেটি নেই। ধীরে ধীরে সংসারে সচ্ছলতা এসেছে। তবে দুই মেয়ের পড়াশোনা ও সংসার একা সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। মেয়েকে স্কুল-প্রাইভেট কিংবা চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হয় তাকে। অনেক সময় নেয়াও হয় না।

বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, সংসারটা ঠিকমতো হলো না। কিন্তু অন্যদের চেয়ে একটু ভালোভাবে চলতে পারি। প্রতি মাসে নিয়মিত টাকা পাঠায়। মোবাইলে প্রায়ই কথা হয়। বড় মেয়ে বাবাকে চিনলেও ছোটটা এখনো চেনে না।

অভিবাসীর রেখে যাওয়া স্বামী-স্ত্রী-সন্তানদের সামাজিক মূল্য নিরূপণে একটি গবেষণা প্রকাশ করেছে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)। ২০১৪-১৭ সাল পর্যন্ত দেশের ১২টি জেলায় ১ হাজার ৭৪১টি পরিবারের ৪ হাজার ৮৮৪ জনের ওপর গবেষণাটি চালানো হয়।

তাতে দেখা যায়, বাবা বা মা, কখনো দুজনের অনুপস্থিতিতে দেশে যে শিশু থাকে, তারা এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও একাকিত্বে ভোগে। বিশেষ করে অসুখ-বিসুখে চিকিৎসাপ্রাপ্তিতে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় এসব পরিবারের শিশুদের।

একাকিত্বে ভোগা শিশুদের একজন জান্নাতুল ফেরদৌস। তার সঙ্গে কথা হয় মুন্সীগঞ্জের বাড়ৈখালীতে নানার বাড়িতে। বণিক বার্তাকে সে বলে, স্কুলে বিশেষ দিনগুলোয় অন্য বন্ধুরা যখন বাবার সঙ্গে আসে, তখন মন খারাপ হয়। ১১ বছরের জীবনে বাবার সঙ্গে দেখা হয়েছে মোটে দুবার। আকাশ দিয়ে উড়োজাহাজ গেলেই মনে হয়, উড়োজাহাজটা যদি বাবার কাছে নিয়ে যেত। ঈদে বাবার জন্য খুব মন খারাপ হয়। মাস দুয়েক আগে বাবা যখন কাতার চলে গেলেন, তখন মন খারাপ করে চারদিন স্কুলে যাইনি। বড় হয়ে পুলিশ হব। আমি চাকরি করলে বাবাকে আর বিদেশে যেতে হবে না।

দেড় বছর আগে কাতার গেছেন মুন্সীগঞ্জের পশ্চিম পাউসা গ্রামের দেলোয়ারা বেগমের (২৮) স্বামী দুলাল হোসেন। স্বামী দেশে থাকতে অন্যের জমিতে বর্গাচাষ ও গরু পালন করে সংসার চলত তাদের। স্বামী চলে যাওয়ায় তিন সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে উঠেছেন দেলোয়ারা বেগম। পঞ্চম শ্রেণী পড়ুয়া ছেলের পড়ালেখাও অনিয়মিত হওয়ার জোগাড়।

অভিবাসীদের পরিবারের সদস্যদের শুধু সামাজিক বিভিন্ন মূল্য দিতে হয় তা নয়, অনেক সময় তা এর চেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয়। বিদেশ থেকে মরণ ব্যাধি সঙ্গে করেও আসেন অনেকে। সরকারি গবেষণার তথ্য বলছে, দেশে এইডস আক্রান্তদের ৩১ শতাংশ বিদেশ ফেরত। প্রবাসী স্বামীর কাছ থেকে এইচআইভি সংক্রমিত হচ্ছে স্ত্রীর শরীরেও।

শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছেন প্রায় এক কোটি বাংলাদেশী অভিবাসী। প্রতি বছর বড় অংকের অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন তারা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে অভিবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ১ হাজার ৪৯৮ কোটি ডলার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নানা পেশায় জড়িত অভিবাসীদের পাঠানো অর্থে চলছে তাদের পরিবার। পাশাপাশি গতিশীল হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। তবে অভিবাসী সদস্যের অনুপস্থিতিতে এসব পরিবারকে প্রতিনিয়ত নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, যার কোনো হিসাব থাকে না গণনার মধ্যে। অভিবাসীর পরিবারের এসব সামাজিক মূল্যকে বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।

অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ মহিলা অভিবাসী শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশন (বমসা)। এর পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, অভিবাসীদের পরিবারকে মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এ সমস্যা সমাধানে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু কত অভিবাসী পাঠানো হলো আর কত রেমিট্যান্স এল, সেদিকে দৃষ্টি দিলে চলবে না। অভিবাসী পরিবারের সদস্যদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিবাসী কল্যাণ ডেস্কের অর্থ শুধু দাফন ও বৃত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সব অভিবাসীর পরিবারের সুরক্ষায় ব্যয় করতে হবে।

বনিক বার্তা
তাওছিয়া তাজমিম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.