বিদ্যুতের দেশে হারিকেন বিলুপ্ত পথে

বিক্রমপুর বাংলার একটি ঐতিহাসিক এলাকা। সুপ্রাচীন কাল থেকেই এই অঞ্চলে বৌদ্ধ জ্ঞান চর্চার জন্য এবং পরবর্তীতে সাংস্কৃতিক প্রভাবের জন্য সুপরিচিত। ধারণা করা হয়, বৈদিক যুগ থেকে ভাওয়াল ও সোনারগাঁও রাজধানী হিসেবে আবির্ভূত হবার আগ পর্যন্ত এটিই ছিল বাংলার প্রাচীনতম রাজধানী। বিক্রমপুর ছিল রাজা বিক্রমাদিত্যের রাজধানী।

এই এলাকায় বাংলার বহু কীর্তিমান ব্যক্তির জন্ম হয়েছে। বর্তমানে এ অঞ্চলটি মুন্সীগঞ্জ জেলার অন্তর্গত। এই অঞ্চলে রাজাদের রাজ্য ছিল, ছিল বড় বড় প্রাসাদ। এই প্রাসাদে আলোর প্রয়োজনে বড় বড় প্রদ্বিপ, লুন্ঠন ও হারিকেনের ব্যবহার ছিল।

একটা সময় ছিল যখন বাহারি ধরনের কুপি ও হারিকেন। ছিল মানুষের অন্ধকার নিবারণের অবলম্বন। কিন্তু কালের বিবর্তনে কুপি বাতি ও হারিকেনের স্থান দখল করে নিয়েছে বৈদ্যুতিক বাল্ব, সৌরবিদ্যুৎ, চার্জার লাইট সহ মোমবাতি আরও অনেক কিছুই। ফলে ক্রমেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে আবহমান গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যময় এই নিদর্শটিও। চলে আসে বিদ্যুতের যুগ।

১৯০১ সালের ৭ই ডিসেম্বর প্রথম ঢাকার রাস্তায় বিদ্যুতের বাতি জ্বলে উঠে। এরপর থেকে ডিজিটাল বিদ্যুতের ছোয়ায় কুপি ও হারিকেনের কদর হারিয়ে যেতে বসে।এখন থেকে বিশ বছর আগেও মুন্সীগঞ্জের ৬ টা উপজেলার বেশিরভাগ ঘরেই ব্যবহার হতো হারিকেন। এখন পুরোটাই পরিবর্তিত হয়েছে।

১৫ বছর আগেও চিত্রটি ছিল এমন যে, সারাদিনের কর্মব্যস্ততা সেরে সন্ধ্যা বেলায় নারীরা ব্যস্ত হয়ে পড়তেন সন্ধ্যায় ঘরের আলো জ্বালানো নিয়ে। হারিকেনের চিমনি খুলে, ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে ছিপি খুলে কেরোসিন তেল ঢেলে আবার ছিপি লাগিয়ে রেশার মধ্যে দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে আগুন ধরিয়ে তা নির্দিষ্ট সীমারেখায় রেখে ঘরের মেঝে জ্বালিয়ে রাখত। এটা ছিল নারীদের সন্ধ্যাবেলার দৈনন্দিন কাজের বিশেষ একটি অংশ।

এই বাতি দিয়ে শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা করতো। এছাড়াও রাতের সকল কাজ, যেমন রান্না-বান্না, কুটির শিল্প, হস্তশিল্প, ধান মাড়ানোসহ সকল চাহিদা মেটানো হতো এই আলো দিয়ে।

রাতের বেলায় নারীরা বেড়াতে গেলে প্রতিবেশী কিংবা আত্মীয়ের বাড়ি তাদের সঙ্গী ছিল একটি হারিকেন। একজন হারিকেন ধরে সামনে হাঁটতো অন্যরা সবাই পেছন পেছন হাঁটতো। এছাড়াও গ্রামীণ প্রতিটি দোকানে সন্ধ্যা-রাতের প্রদীপ হিসেবে হারিকেন ও কুপির কদর ছিল খুব বেশি। দোকানিরা কিংবা পথচারীরা রাতের বেলায় হাঁটাচলা করা কিংবা বাড়ি ফেরার পথের একমাত্র সাথি ছিল হারিকেন। তাছাড়া রিকশার পেছনে এখনো হারিকেনের ব্যবহার চোখে পড়ে।

বর্তমানে গ্রামীণ জীবনে প্রতিটি ঘরে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হয়েছে। যেখানে ছিল না কোন বৈদ্যুতিক লাইট, পাখা, এয়ার কন্ডিশানসহ আরো অনেক কিছু। বর্তমানে বিদ্যুতায়নের ফলে সবকিছুর স্বাদ গ্রহণ করছে গ্রামীণ জনপদের বাসিন্দারা।

এখন দিনের বেলায়ও আলো জ্বালাতে হয়। এখন আর শুধু বিদ্যুতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়ার জন্য আইপিএস ব্যবহার করা হচ্ছে। কেউবা আবার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। হাত পাখার বদলে বৈদ্যুতিক পাখা ও এয়ার কন্ডিশান ব্যবহার করা হচ্ছে।

উপজেলার বাহেরঘাটা গ্রামের রহিরা বেগম ৮৭ বছরের বিদ্ধা বলেন, হারিকেন জ্বালিয়ে রতে আমার বিয়ে দিছে, দেশ যুদ্ধের সময় রাতে হারিকেনের নিবু নিবু আলোতে ঘরে থাকতে হতো।

সিরাজদিখান পল্লী বিদ্যুতের ডি.জি.এম.মো. জাকির হোসেন বলেন, ১৯৯৮ সালে পল্লী বিদ্যুৎ আসে এর পর থেকে হারিকেন, কুপির ব্যবহার কমে যায়। জেলায় বিদ্যুতের গ্রাহক রয়েছে প্রায় ৩,৮৪,০০০ হাজার । এখন এই জেলায় শত ভাগ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় আছে।

আব্দুল্লাহ আল মাসুদ
আমার সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.