পাঠক সংখ্যা

  • 8,168 জন

বিভাগ অনুযায়ী…

পুরনো খবর…

জাপান কাহিনী এবং একজন ডঃ আশির আহমেদ

রাহমান মনি: ডঃ আশির আহমেদ এর সাথে ব্যক্তিগতভাবে অনেকে হয়তো পরিচিত নন, কিন্তু , ডঃ আশির রচিত “জাপান কাহিনী”র সাথে পরিচিত নন, জাপান প্রবাসী বই প্রেমী এমন লোক খুব কম ই আছেন। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক এর কল্যানে বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাংলাভাষী সবাই কম বেশী অবগত আছেন জাপান কাহিনি সম্পর্কে। আন্তর্জালে পাঠক সংখ্যাও কম নয়।

এই ফেসবুক-এ স্ট্যাটাস ( লেখকের স্বীকারোক্তি মোতাবেক ) দিতে গিয়ে তার জাপান কাহিনী লিখা শুরু। প্রথমে নিছক নিজ আনন্দেই লিখা, তারপর পাঠকদের সাড়া, বন্ধুদের কাছ থেকে উৎসাহ পেয়ে আর এখন পাঠকদের চাহিদার প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে।

ঐতিহ্য প্রকাশনা সংস্থা থেকে ২০১৫ সালে বাংলা একাডেমীর বই মেলায় লেখকের জাপান কাহিনি বইটি প্রথম বের হওয়ার পর ২০১৬ সালে ২য় খণ্ড যখন বের হয় তখন একজন পাঠক হিসেবে ‘সাপ্তাহিক’এ বইটি নিয়ে আলোচনায় লিখেছিলাম ‘ডঃ আশির আহমেদ-এর ‘জাপান কাহিনি’ নিছক কোনো গল্প কাহিনি কিংবা কল্প কাহিনিও নয়। জাপান সম্পর্কে, জাপানের সংস্কৃতি, সামাজিক শিক্ষা বোধ, জীবনযাপন, নৈতিক শিক্ষা ব্যবস্থা, দেশপ্রেম,, নিজ ভাষার প্রতি ভালোবাসা, স্থাপনা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, কুসংস্কার বা অন্যান্য বিষয়ে জানতে আগ্রহীদের সম্যক ধারণা দিতে সক্ষম বলে আমার মনে হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা জাপান সম্পর্কে অজানাদের জন্য উইকি পিডিয়ার কাজ দিবে।’

লিখেছিলাম, আমি নিশ্চিত, জাপান কাহিনি একবার পাঠ শুরু করলে শেষ অবধি না পড়া পর্যন্ত কেউ হাতছাড়া করতে চাইবেন না। একটি বই-ই হতে পারে ভালো বন্ধু। বিনোদনের সাথী, জ্ঞান ভাণ্ডার এবং সময় কাটানোর ভালো মাধ্যম ‘জাপান কাহিনি’ তার প্রকৃত উদাহরণ।

আসলেই তাই। ২০১৯ সালে যথারীতি ৫ম খণ্ড বের হওয়ার পর কিছু দিনের মধ্যেই আশির ভাইয়ের মাধ্যমে আমার হস্তগত হয়। ব্যস্ততার জন্য পড়া হয়ে ওঠেনি এমন বলাটা সমীচীন হবে না। ইচ্ছে করেই বইটি ধরিনি। তার কারন, আমি জানি একবার শুরু করলে শেষ না করা পর্যন্ত কখনো তা রাখা যাবেনা।

কিন্তু, এভাবে আর কতোদিন রাখা যায় ! এদিকে পড়ার জন্য মনটাও ব্যাকুল। তাই কর্মক্ষেত্রে যাতায়াত পথেই অর্থাৎ ‘ট্রেন জার্নি’ করার সময়টাকেই যথাপোযুক্ত সময় হিসেবে বেঁছে নিয়ে যথা বিবেচনায় আকাবানে টু আকিহাবারা মাত্র ২২ মিনিটের যাতায়াত পথেই শুরু করলাম জাপান কাহিনি ৫ম খণ্ড পড়া।

ট্রেনে পড়ার সময় ‘জাপানি বাইতো’ লিখাটির একটি স্থানে “পড়াইতে চাই”বিজ্ঞাপনে পড়াইতে শব্দের আগে‘থা’যোগ করার পর যে শব্দটি কি হতে পারে তা ভাবতে হঠাৎ ই নিজের অজানতেই অট্টহাসিতে সহযাত্রীদের উৎসুকের কারন হয়ে দাড়াই। সাধারনত জাপানে পাশের যাত্রীদের প্রতি কারোর কোন আগ্রহ থাকে না। এক্ষেত্রে তার ব্যাতিক্রম ঘটে। আমার হাসি দেখে সহ যাত্রীদের একজন জানতে চাইলেন আমি হাসছি কেন ? ‘ইয়ারাশি’অর্থাৎ বইটিতে কোনো যৌন সুড়সুড়ি লিখা আছে কিনা?

একইভাবে হেসেছি ‘আমেরিকান ইংরেজি শেখা – ২’তে আমেরিকায় রাস্তার ব্রিজের পাশে লিটারিং করার পর ডাবল স্ট্যান্ড করা ছেলে কর্তৃক স্ট্যান্ড অবস্থায় স্ট্যান্ড হওয়া হোস পাইপটি ঝাঁকানো’র বিষয় নিয়ে।

আচ্ছা পাঠকরা-ই বলুন সহজ সরল ভাষায় এমন রম্য অথচ বাস্তব সম্মত এবং বিষয় ভিত্তিক ও শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতার বর্ণনা একবার শুরু করলে কি শেষ না করা পর্যন্ত রাখা যায় ?

ডঃ আশির তার জীবনের প্রায় দুই তৃতীয়াংশের ও বেশী সময় জাপানে অতিবাহিত করেছেন,করছেন। অথচ , তাঁর লিখার ভেতর শেকড়ের টান, মাটির টান, গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সর্বদাই বিদ্যমান। টোকিও , প্যারিস, নিউইয়র্ক ঘুরাঘুরির পরও যখনি সুযোগ পেয়েছেন তখনি তাঁর লিখার মধ্যে তাঁর মনের মধ্যে গেঁথে থাকা এখলাসপুর বার বার চলে এসেছে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত যেমন সুদূর ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে থেকেও কপোতাক্ষ নদ কে মনে গেঁথে রেখেছেন। কপোতাক্ষ নদ কে স্মরন করেছেন তাঁর অমর সৃষ্টি সনেট-এ তেমনি ডঃ আশির আহমেদ তাঁর সৃষ্টি জাপান কাহিনি তে প্রসঙ্গক্রমেই তাঁর স্মৃতিগাঁথা এখলাসপূর কে স্মরণ করেছেন বারবার।

লেখকের মতো জাপানে বিদেশী শিশুদের বড় হওয়া নিয়ে আমার নিজেরও বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। অপ্রিয় হলেও সত্যি জাপানে বেড়ে ওঠা শিশুরা বাংলা ভাষা এবং বাংলা সংস্কৃতির প্রতি অনীহার অন্যতম কারন হচ্ছে তার পিতা-মাতা অর্থাৎ অভিভাবকরা।

শিশুকাল থেকেই অনেক অভিভাবক ই তাদের সন্তানদের জাপানে রেখে বাংলাদেশী স্টাইলে বড় করতে চান। চাপিয়ে দিতে চান অনেক কিছু। চাপিয়ে দিয়ে যে লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানোয় সম্ভব নয় তা তারা বুঝতে চান না।

সন্তানদের নিয়ে অনেক সময় অনেক সময় মিথ্যাচার কিংবা অতি মাত্রায় প্রশংসা তাদের জন্য কাল হয়ে দাড়ায় এ বিষয়টি তারা মাথায় রাখতে চান না। সন্তানদের সামনে তাদের নিয়ে মিথ্যাচার করলে একদিন তা বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে। শিশু প্রশংসা করতে হবে অবশ্যই। তবে অতি রঞ্জিত বা অতিমাত্রায় নয়।

একটি শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিংবা বাহিরে সব কিছুই ঠিকঠাক মতোই করে, কিন্তু বাড়ীতে আসার পর কেন তা আর বজায় থাকেনা এর কারন খুঁজে বের করতে পারলেই বেশীরভাগ সমস্যার ই সমাধান হয়ে যাবে বলে মনে হয়।

লেখকের নিজ জেলার পার্শ্ববর্তী জেলা মুন্সিগঞ্জ জেলায় জন্ম নেয়ায় ‘লুসনি’কথাটির সাথে জন্মলগ্ন থেকেই পরিচিত ছিলাম। জাপানের ব্যাস্ততম জীবনে শব্দটি থেকে অনেকটাই দূরে ছিলাম। জাপান কাহিনী ৫ম খণ্ড তা আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে। এমন অনেক শব্দ ই জাপান কাহিনি’র বদৌলতে স্মৃতির পাতা হাতড়িয়ে বেড়াতে হয়েছে।

মনে দাগ কেটেছে জাপানি প্রফেসরের শেষ লেকচার, জাপানি প্রতিবন্ধী ছাত্র, সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট, আমার জাপানি মা শিরোনামের লিখাগুলো পড়ে।

শিক্ষণীয় ছিল জাপানি নাপিত যখন উদ্যোক্তা, জাপানি ড্রাইভার – দক্ষ না নিরাপদ, Dr. T এর ছোট ডিব্বা, সামাজিক সমস্যা নয় সামাজিক সম্পদ লিখা গুলো।

ভালো লেগেছে জাপানে ইংরেজি শেখা, আমেরিকান ইংরেজি শেখা, প্যারিস ওয়াক, স্টিভ ওয়াহ, ঝুঁকি কমানোর ট্রেনিং, জাপানে ট্যুরিস্ট সংখ্যা, জাপানী নাপিত, জাপানী বাইতো, জাপানে ইংরেজী শেখা, শশী, জাপান বাংলাদেশ যৌথ ব্যবসা, জাপানের অলংকার ওয়ালা লিখাগুলো।

কৌতূহল মিটাবে ‘জাপানের জোজো স্যুট আর বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ’ এবং ‘জাপান শ্রমিক নেবে ৪ লক্ষ, বাংলাদেশ থেকে কতো?’, ‘টোকিও ২০২০ অলিম্পিক বাজেট ৭ বিলিয়ন ডলার বাংলাদেশের জন্য কত ডলার’ শিরোনামের লিখা গুলো ।

বর্তমানে কিছু সংখ্যক দালালের অতি প্রচারে জাপানে আসার জন্য হাজার-লক্ষ তরুণদের স্বপ্নের জাপান আসার কৌতূহল , আকাংখ্যার গাইড হিসেবে অনেকটাই মিটাবে ডঃ আশিরের জাপান কাহিনি ৫ম খণ্ড।

অত্যন্ত সহজ ভাষায় সাবলীলভাবে নিজ অভিজ্ঞতার কথা এমনভাবে উল্লেখ করেছেন যে, পাঠ করার পর মনে হতে পারে পাঠক নিজেও যেন লেখকের সাথে জাপান দেখছেন বা কল্পনা করে নিচ্ছেন। জাপান কাহিনির প্রতিটি গল্প বা কাহিনিতে রয়েছে শিক্ষামূলক তথ্য, যা জাপান না এসেও জাপান সম্পর্কে জানার দ্বার খুলে দিবে।

জাপান আসার জন্য ব্যাকুলরা ডঃ আশির আহমেদ এর জাপান কাহিনি সব গুলি খণ্ড সংগ্রহ করে পড়ে দেখতে পারেন। যাদের জাপান আসার সৌভাগ্য হবে প্রাত্যাহিক জীবনে তাদের তো কাজে আসবেই, যাদের ভাগ্যে জাপান আসার সৌভাগ্য না হয় তারাও জাপান সম্পর্কে সম্যক ধারনা নিতে পারবেন। দুধের স্বাদ অনেকটাই ঘোলে মিটে যাবে।

বুয়েট এর ছাত্রাবস্থায় ডঃ আশির আহমেদ ১৯৮৮ সালে জাপান সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বৃত্তি নিয়ে আন্ডারগ্রাজুয়েট কলেজ অব টেকনোলজি গ্রুপের প্রথম ব্যাচের ছাত্র হিসেবে জাপান আসেন। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা সমাপ্ত করে এন,টি,টি, কমিউনিকেশনস-এ কিছুদিন কাজ করে বরতমানে কিউশু বিশবিদ্যালয় এর সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছেন। গবেষণা করছেন তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে। বাংলাদেশেও তিনি গবেষণাগার খুলেছেন এবং একই সাথে আলোকিত করে চলেছেন তার নিজ জেলা চাঁদপুরের মতলব উপজেলার এখলাসপুর গ্রাম কে। যদিও তার জন্ম সিলেট জেলায়।

একই সাথে তিনি কাজ করছেন সামাজিক সমস্যা সমাধানে। গ্রামীন কমিউনিকেশন্স এর গ্লোবাল কমিউনিকেশন সেন্টার এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক তিনি।

লিখালিখিতে রয়েছে তার নিজস্ব ধারা। যা তিনি জাপান কাহিনি’র ৫টি খণ্ডেই বজায় রেখেছেন। প্রতিটি গল্পেই তার রস বোধ দিয়ে সামান্য ঘটনাকেও পাঠকদের কাছে অসামান্য এবং চলমান করে উপস্থাপন করেছেন। শুধুমাত্র বিনোদন বা প্রচার পাওয়ার জন্য কিংবা আর্থিক লাভবান হওয়ার জন্যই তিনি লিখেন না। নিজস্ব অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ইতিহাস ও তুলে ধরছেন বাংলাভাষীদের জন্য।
rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক এর সৌজন্যে

Leave a Reply

You can use these HTML tags

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

  

  

  

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.