মুন্সীগঞ্জে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে

কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু: গত কয়েক বছরে মুন্সীগঞ্জে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও স্থানীয় একাধিক সন্ত্রাসী বাহিনীর মধ্যে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। অস্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি জেলায় অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ফলে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষে প্রকাশ্যেই অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করতে দেখা গেছে। পৃথক ঘটনায় আধিপত্য নিয়ে প্রতিপক্ষের গুলিতে ফয়েজ মিজি, মোহন বেপারী, মাসুদ ঢালী, জনি নিহত হয়। অন্যদিকে গ্রেফতার অভিযানে র‌্যাব ও পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ১২ সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে দেশি-বিদেশি একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি। তবে এখনও বিপুল পরিমাণে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। অস্ত্র ব্যবসায়ীরাও রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এসব সন্ত্রাসী সুযোগ পেলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন শ্রেণির পেশার মানুষ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সদরের বণিক্যপাড়ায় অভিযান চালিয়ে একটি শটগানসহ ইকবাল নামের এক সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। একই বছরের ৯ নভেম্বর একটি বিদেশি পিস্তলসহ যুবক এবং ১৫ অক্টোবর ৪ রাউন্ড গুলিসহ পরে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত শাহজালাল মিজিকে গ্রেফতার করা হয়। ২০১৪ সালের ২০ নভেম্বর শহরের গনকপাড়ায় পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের গোলাগুলি হয়।

২০১৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি সদরের কালীরচর গ্রামে দু’পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে ফয়েজ মিজি ও মোহন বেপারী নিহত হয়। ৫ নভেম্বর পুলিশ-সন্ত্রাসী বন্দুকযুদ্ধে অস্ত্র মামলার আসামি পিচ্চি সেন্টু নিহত ও ঘটনাস্থল থেকে গুলিসহ ১টি রিভলবার উদ্ধার করা হয়। এ বছর বিভিন্ন এলাকা থেকে ১২টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতার করা হয় অস্ত্র ব্যবসায়ী বিল্লালসহ একাধিক সন্ত্রাসীকে। ২০১৬ সালের ১১ জুন রাতে গুলিতে জনি নামের কিশোর নিহত ও দু’জন গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় পুলিশ ৩টি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করে। ২৫ ডিসেম্বর সরকারি হরগঙ্গা কলেজ ছাত্রাবাসের ছাত্রলীগ নেতা নিবিরের কক্ষ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, ১টি দেশি পাইপগান উদ্ধার করা হয়। এ নিয়ে একই বছরে জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে ১৫টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ১৩৭ রাউন্ড গুলি এবং ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়।

২০১৭ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সদর থানা পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহজালাল মিজি পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়। এ সময় ২টি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। ২৪ এপ্রিল সন্ত্রাসী মিল্টন মল্লিক ও তার সহযোগীরা প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে আওয়ামী লীগ কর্মীদের বাড়িতে গিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে বাড়িঘর ছেড়ে চলে যেতে হুমকি দেয়। ২ ও ৩ মে মোল্লাকান্দিতে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধসহ ৩০ জন আহত হয়। ওই সংঘর্ষে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে একাধিক সন্ত্রাসী গুলিবর্ষণ করলেও আজও তারা গ্রেফতার হয়নি। ১০ জুন দু’পক্ষের গোলাগুলিতে মাসুদ ঢালী নিহত ও গুলিবিদ্ধ হয় ১০ জন। এ বছর পৃথক অভিযানে ৫টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ।

২০১৮ সালের ৩ জানুয়ারি পরিত্যক্ত ১টি একনলা বন্দুক উদ্ধার, ২ ফেব্রুয়ারি পুলিশ ও নৌ-ডাকাতদের বন্দুকযুদ্ধে তারেক রহমান রিংকু নামের নৌ-ডাকাত নিহত ও এসআই গুলিবিদ্ধসহ ৫ পুলিশ আহত হন। ৪ ফেব্রুয়ারি জাহাঙ্গীর সরকারকে ১টি শটগান ও ১টি বিদেশি পিস্তলসহ গ্রেফতার করে র‌্যাব। ১২ ফেব্রুয়ারি গজারিয়াকান্দি গ্রামে অস্ত্র তৈরির কারখানার সন্ধান এবং ১টি স্নাইপার রাইফেল, ২টি দেশি ওয়ান শুট্যার গানসহ আগ্নেয়াস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। ২৫ এপ্রিল পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ সাইফুল ইসলাম আরিফ ওরফে বাবা আরিফ নিহত ও ঘটনাস্থল থেকে ১টি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। ১১ জুন গুলি করে লেখক-প্রকাশক শাহজাহান বাচ্চুকে গুলি করে হত্যা করে জেএমবির জঙ্গিরা। ২৭ জুন মাদক ব্যবসায়ীদের দুই গ্রুপের বন্দুকযুদ্ধে সুমন বিশ্বাস ওরফে কানা সুমন নিহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে ২টি দেশি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। একই দিন ১টি পিস্তল ও ৪টি তাজা হ্যান্ডগ্রেনেড উদ্ধার করে ফেরার পথে জঙ্গিদের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ জেএমবির নেতা আব্দুর রহমান নিহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হয় ১টি পিস্তল ও গুলি। ১০ আগস্ট র‌্যাব-মাদক সিন্ডিকেটের বন্দুকযুদ্ধে মুকবুল নিহত ও ১টি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। ৬ নভেম্বর বোমা শামীম ও এখলাসুর নামের জেএমবির দুই জঙ্গি পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়। এ সময় ১টি পিস্তল উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম পিপিএম জানান, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অব্যাহত রয়েছে। অস্ত্রধারীদের কোনোভাবে ছাড় দেওয়া হবে না।

সমকাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.