মুন্সীগঞ্জে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ক্ষোভ আ’লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবিতে আগের বিএনপি-জামায়াত

মুন্সীগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচিত ঘটনা ছিল ২০১৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল হাইয়ের চাচাতো ভাই ও দলের শীর্ষ ক্যাডার গোলাম মোস্তফাসহ সহস্রাধিক নেতাকর্মীর আওয়ামী লীগে যোগদান। এ ঘটনার আগে-পরে ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ বছরে জেলায় বিএনপির সাড়ে চার হাজার নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন। দলে টানার তখনকার খুশি এখন ক্ষোভের সাগরে পরিণত হয়েছে মুন্সীগঞ্জ আওয়ামী লীগের তৃণমূলে। এ ক্ষোভের কারণ, দলবদলে আসা সেই বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীরাই এখন জেলার ছয়টি উপজেলায় গঠিত ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কমিটিতে বাগিয়ে নিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি। এতে বঞ্চিত হয়েছেন ত্যাগী নেতাকর্মীরা। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ কর্মসূচি ও মানববন্ধন কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছেন এসব নেতাকর্মী।

টঙ্গিবাড়ী উপজেলার কামারখাড়া ইউনিয়নের ১ ও ২ নম্বর ওয়ার্ড কমিটি গঠন নিয়ে সৃষ্ট বিরোধে গত ১ নভেম্বর আওয়ামী লীগের দু’পক্ষের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষণায় কামারখাড়া বাজার ও এর আশপাশ এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে উপজেলা প্রশাসন। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আমির হোসেন বেপারীসহ নেতাকর্মীদের অভিযোগ, অর্থের বিনিময়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের পদ দিয়ে ওই কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে তারা মানববন্ধন কর্মসূচির ডাক দিলে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জগলুল হালদার ভুতুর পক্ষের নেতাকর্মীরা পাল্টা কর্মসূচি দেন। এতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে।

জানা গেছে, এক সময়ের ইউনিয়ন যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আ. ছাত্তার দেওয়ান এখন টঙ্গিবাড়ীর বেতকা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। অথচ ২০১২ সালের ডিসেম্বরে ছাত্তার দেওয়ান বেতকা ইউনিয়ন যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক হন এবং আওয়ামী লীগের সরকার বিরোধী কর্মকাে লিপ্ত ছিলেন।

এর আগে ১৪ অক্টোবর শ্রীনগরের ভাগ্যকুল ইউনিয়নের নয়টি ওয়ার্ডে বিএনপি ও হাইব্রিডদের যুক্ত করে কমিটি গঠন করায় প্রতিবাদ সভা করে তৃণমূল আওয়ামী লীগ। তৃণমূল নেতাকর্মীরা জানান, নয়টি ওয়ার্ডের ১৮ জন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে নয়জনই বিএনপি, বিকল্পধারার নেতা ও ডাকাতি মামলার আসামি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লৌহজং বিএনপির সাবেক সভাপতি গিয়াসউদ্দিন বেপারী এখন উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। উপজেলা বিএনপির আরেক সাবেক সভাপতি সিরাজুল আলম ফুকু উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী সদস্য। একইভাবে উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি লুৎফর রহমান এখন কুমারভোগ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি।

অন্যদিকে সিরাজদীখান উপজেলার কোলা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়েছেন ছাত্রলীগ নেতা আসিফ হাসান হত্যা মামলার আসামি তরুণ তপন দেওয়ান। একই কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুস সালাম খানও হত্যা মামলার আসামির ভাই। বালুচর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন জামায়াত কর্মী মফিজুল ইসলাম। হেফাজতে ইসলামের নেতা আফজাল এখন ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি। মরিচা গ্রামের পাকিস্তানি হানাদারদের সহযোগী পীর বক্সের ছেলে আবদুর রব এখন চিত্রকোর্ট ইউনিয়ন ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি।

গত ৭ নভেম্বর ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে তৃণমূল আওয়ামী লীগের ব্যানারে মুন্সীগঞ্জ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে কোটি টাকায় পদ-পদবি বিক্রির অভিযোগে মানববন্ধন করা হয়। যদিও পরদিন মুন্সীগঞ্জ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে জেলা আওয়ামী লীগ ওই মানববন্ধনে করা অভিযোগ নাকচ করে দেয়। সংবাদ সম্মেলনে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মো. লুৎফর রহমান চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেন, কমিটি গঠনসহ বিভিন্ন কাজে অবৈধ অর্থ নেওয়ার প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না।

জেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট সোহানা মহিউদ্দিন বলেন, জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে কিছু ব্যক্তি মানববন্ধন করে জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে কোটি টাকায় পদ বিক্রির যে অভিযোগ তুলেছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট।

এর আগে ৭ অক্টোবর সদরের মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের চরডুমুরিয়া বাজারে আওয়ামী লীগের সম্মেলন চলাকালে দুই সভাপতি প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে নারীসহ ৫০ জন আহত হন। এতে সহিংসতা এড়াতে সম্মেলন স্থগিত করা হয় বলে জানিয়েছেন সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আফসারউদ্দিন ভূঁইয়া।

অন্যদিকে ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটি গঠনের পর হামলার আশঙ্কায় মুন্সীগঞ্জ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পঞ্চসার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটি ঘোষণা করেন সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আফসার উদ্দিন ভূঁইয়া ও সাধারণ সম্পাদক সামছুল কবিরসহ নেতারা।

তবে টঙ্গিবাড়ীর কাঠাদিয়া শিমুলিয়া ইউনিয়নে সম্মেলনের মাধ্যমে নয়টি ওয়ার্ড কমিটি সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে ইউনিয়ন কমিটির সভাপতি শাহ আলম মাদবর ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হাওলাদারের নেতৃত্বে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে বলে জানান সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ও জেলা পরিষদ সদস্য মো. আনিসুর রহমান। এ ছাড়া ধীপুর ইউনিয়নে নয়টি ওয়ার্ড কমিটিও গঠনতন্ত্র মেনেই সম্পন্ন হয়েছে বলে নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াহিদ বলেন, দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া জেলায় সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন করা হয়েছে। যে দু-একটিতে সমস্যা হয়েছে, তা নিরসনে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী মনিটরিং কমিটি ব্যবস্থা নিতে সংশ্নিষ্টদের চিঠি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।

বিএনপির সাড়ে চার হাজার নেতাকর্মীর আওয়ামী লীগে যোগদান প্রসঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান বলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাে আকৃষ্ট হয়ে এবং বিএনপির নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারিয়ে দলটির নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগে যোগদান করেছে। এখন তারা আওয়ামী লীগেরই।

সমকাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.