ঘুরে যেতে পারেন সৌন্দর্যের নগর

আরিফ হোসেন-সাধারণ সম্পাদক, শ্রীনগর প্রেস ক্লাবঃ রাজধানী ঢাকার গুলিস্থান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার থেকে সৌন্দর্যের নগরের দুরত্ব প্রায় ৩৪ কিলোমিটার। আপনি চাইলে গুলিস্থান বা যাত্রাবাড়ী থেকে বাসে উঠে এখানে চলে আসতে পারেন এক ঘন্টারও কম সময়ে।

সৌন্দর্যের নগর অর্থাৎ শ্রীনগরের পূর্বের নাম রায়েসবর। নবাব মীর কাসিমের আমলে বাংলা বিহার উড়িশ্যার গভর্নর লালা কীর্তিনারায়ন বসু রায়েসবরের সৌন্দর্যবৃদ্ধি করে নামকরণ করেন শ্রীনগর। প্রাচীন কাল থেকেই এই জনপদ প্রাচুর্যে ভরপুর। মুন্সীগঞ্জ জেলার এই উপজেলার মধ্য দিয়ে চলে গেছে ঢাকা-মাওয়া ছয় লেনের হাইওয়ে। দক্ষিন দিকে প্রমত্তা পদ্মা বহমান। শ্রীনগর বুকে ধারণ করে আছে আড়িয়ল বিলের ধারে অবস্থিত প্রাচ্যের প্যারিস নগরী।

আড়িয়ল বিলঃ বর্ষায় যদি আপনি আড়িয়ল বিলে আসেন আর স্বচ্ছ জলে ¯œান না করেন তাহলে আপনার কাছে বিষয়টি মনে হতে পারে সমুদ্র সৈকতে গিয়ে পা না ভেজানোর মতো। আপনি যদি সকালে নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পরেন তাহলে সন্ধ্যা নেমে গেলেও ফিরতে মন চাইবেনা। শহরের কোলাহল থেকে এখানে চলে আসতে পারেন অনায়াসে। বর্ষার ভোরে পুরো বিল জুড়ে ফুটে থাকে সাদা শাপলা। স্বচ্ছ পানির অনেক ফুট নীচ পর্যন্ত দেখা যাবে লতা গুল্ম। ছোট ছোট মাছ দৌড়াতেও দেখবেন। একটু সময় নিয়ে যদি কোন বেসালের কাছে গিয়ে বসেন দেখতে পারবেন বিলের তাজা মাছ কি ভাবে লাফায়! এই বিলে দশ থেকে বিশ বিঘা আয়তনের জলাশয় রয়েছে প্রায় পাঁচশটি। স্থানীয় ভাষায় এই জলাশয়কে ড্যাঙ্গা বলে। প্রাকৃতিক মাছের এতোবড় বিল ঢাকার কাছে আর পাবেন না। আপনি চাইলে জেলেদের জালে ধরাপরা তাজা মাছ কিনে নিতে পারেন। কোন কারণে রৌদ্রে ঘেমে উঠলে শীতল ছাঁয়া পেয়ে যাবেন বিলের পানিতে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা বড় বড় হিজল গাছের তলে। নৌকায় বসে থাকতে থাকতে এক ঘেয়েমি লগলে ডাঙ্গার পাড়ে নেমে হেঁটে হেঁটে ঘুরে দেখতে পারেন। এখানে নানা রকম গাছের সমারোহ। বিলে নেমে চারদিকের যেদিকেই তাকান না কেন খুব কম সময়ই পাবেন যে আপনার চোখে পাখি পরছে না।

আর শুষ্ক মৌসুমের শুরুতে আপনি আড়িয়ল বিলে প্রবেশ করলে অনায়াসে চোখে পরবে সবুজের সমারোহ। দক্ষিনা বাতাসে খেলা করা কঁচি ধানের ডগা ছুঁয়ে ভেতরে ভেতরে অনুভব করবেন প্রশান্তির ছোঁয়া। ক্ষেতের কোনে কোনে উঁচু ভিটা। ভিটায় চাষ হচ্ছে উছতে, করলা, লাউ,বেগুন সহ নানা রকম শীতের শাক সবজি। ফাল্গুনে গেলে দেখবেন ক্ষিরা, আর দেশখ্যাত বিশাল আকৃতির মিষ্টি কুমড়া। এক একটি বড় আকারের মিষ্টি কুমড়ার ওজন এক’শ থেকে দেড়’শ কেজি পর্যন্ত। এই কুমড়ার আকার ও স্বাদ অন্য কোথাও আপনি পাবেন না। যেমন পাবেন না শীত কালে ধরাপরা বিলের সোনালী কই,শিং ও মাগুর মাছের স্বাদ। বিলের ধারের কোন বাড়ির আতিথীয়তা গ্রহন করলে আপনি দুপুরে পেয়ে যেতে পারেন উছতে ভাজি, লাউ ডগা দিয়ে রান্না করা তাজা বিলের কই মাছ বা ডালের বড়িতে রান্না করা শিং মাগুরের ঝোল। কি খেলেন তা মনে থাকবে জীবনের বাকী দিন। এসব আপনি পাঁচ তারকা হোটেলে পাবেন না।

বড় বড় জলাশয় গুলোর কাছে গেলে দেখবেন মাঝখানে রাখা কচুরি-নলখাগরার ঝোপে পাখা মেলে দিয়ে রোদ পোহাচ্ছে কানিবগ। ড্যাঙ্গার এমাথা ওমাথা চষে বেড়াচ্ছে পানকৌড়ির ঝাক। ডাহুক পাখি দৌড়ে পালাবে যখন তখন।

গ্রীষ্মের পুরোটা বিল জুড়ে খেলা করে পাকা সোনালী ধান। কৃষক-কিষাণীর চোখে তখন পাবেন প্রশান্তির ঝিলিক।

শ্যামসিদ্ধির মঠঃ আড়িয়ল বিলের দক্ষির পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শ্যামসিদ্ধির মঠ। আনুমানিক ২৪৭ বছরের পুরনো এই মঠটি ভারত উপমহাদেশের সর্বোচ্চ মঠ এবং সর্বোচ্চ স্মৃতিস্তম্ভ বলে বিবেচিত।

মঠটির দক্ষিণ দিকের প্রবেশ পথের উপরে রয়েছে বাংলা শিলালিপি। সেখানে লেখা তথ্য থেকে জানা যায়, ১৮৩৬ সালে বিক্রমপুরের ধনাঢ্য ব্যক্তি শম্ভুনাথ মজুমদার এটি নির্মাণ করেন। জনশ্রুতি রয়েছে সম্ভুনাথ স্বপ্নে তার স্বর্গীয় পিতার চিতার উপরে মঠ নির্মাণের নির্দেশ পান। তারপর তিনি এই স্থাপনা তৈরি করেন। মঠটির উচ্চতা প্রায় ২৪০ ফুট, মঠটির গায়ে সোনারং অঞ্চলের কিছু স্থাপত্য কর্মের নমুনা আছে যা দেখতে ঠিক ফনা বিশিষ্ট সর্পমূর্তি ও লতাপাতার অলংকরনের নকশা দিয়ে সজ্জিত।

শ্যামসিদ্ধি গ্রামের মঠটির মধ্যে গৌরিপটে একটি শিব লিঙ্গ ছিল। শিব লিঙ্গটির উচ্চতা ছিল প্রায় ৩ফুট। সনাতন ধর্মালম্বী মানুষ এই মঠটিকে শিব মন্দির বলে থাকে।

ঢাকা-মাওয়া হাইওয়ের ছনবাড়ি বাসস্ট্যান্ডে নেমে রিক্সা নিয়ে শ্যামসিদ্ধির মঠে পৌছে যেতে পারবেন পনের মিনিটের মধ্যে।

আল মদিনা জামে মসজিদঃ ঢাকা-মাওয়া হাইওয়ের পাশে ছনবাড়ি বাসস্ট্যান্ডের একটু আগেই আল মদিনা জামে মসজিদের অবস্থান। এই মসজিদটি আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি হয়েছে। দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে চলাচলকারী অনেকে গাড়ি থামিয়ে নামাজ আদায় করেণ।

স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর পৈত্রিক বাড়িঃ রাড়িখাল ইউনিয়নের ঢাকা-দোহার সড়কের পাশে অবস্থিত বিশ^খ্যাত বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর পৈত্রিক বাড়ি। বিশাল আকারের বাড়িতে রয়েছে দুটো শান বাঁধানো ঘাট। পুরাতন ইমারতের বাড়ির একটি কক্ষে রয়েছে জাদুঘর। জাদুঘরে রক্ষিত আছে কবি গুরু রবীন্দ্র নাথের লেখা চিঠি, বিভিন্ন রকমের ডায়াগ্রাম ও প্রকাশনা। পাশেই বিজ্ঞানীর নামে প্রতিষ্ঠিত স্কুল এন্ড কলেজ।

হুমায়ূন আজাদের বসত বাড়িঃ স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর বাড়ি থেকে ঢাকা-দোহার সড়কে ধরে এক কিলোমিটার পশ্চিম দিকে আগালে ভাষা বিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক হুমায়ূন আজাদের বাড়ি। বাড়িতে ঢোকতেই তার সমাধি।

প্র্যাচ্যের প্যারিস নগরীঃ হূমায়ণ আজাদের বাড়ি দেখে একই পথে আরো এক কিলোমিটার সামনে আগালে বালাশুর বাসস্ট্যান্ড। বাসস্ট্যান্ড থেকে বামদিকের রাস্তা ধরে সামনে এগুলে পদ্মানদী। নদীর পারে ভাগ্যকূল বাজার। যেখান থেকে কোলকাতাগামী জাহাজ থামতো। জমিদার হরেন্দ্রলাল রায়ের বাড়ি ছিল পাশেই। ভাগ্যকূল মাঠে উণবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে খেলতে আসতো কোলকাতার বিখ্যাত ফুটবল ক্লাব ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগান। ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্রতিষ্টাতাও ছিলেন ভাগ্যকূলের জমিদাররা। আপনি ভাগ্যকূল বাজারে খেতে পারেন বিখ্যাত ঘোল। আপনি ঢাকায় বিভিন্ন মানের লাচ্চি খেতে পারেন। কিন্তু এই ঘোল একবার খেলে বুঝবেন ওইসব লাচ্চি এর ধারেকাছেও ভিড়তে পারবেন না। নৌকা ভাড়া করে নদীতে বেরিয়ে পড়তে পারেন। সামান্য দূরে জেগে উঠা বিশাল চরে নামলে দেখবেন কাশফুলের বিশাল বন। কাশবন পেরিয়ে গেলে চোখে বড়বে দিগন্ত জোরা মাঠের অনেকটা জুরে সরষে, মটর ও বাদামের ক্ষেত।



সেখান থেকে ফিরে আপনি পুনরায় বালাশুর বাসস্ট্যান্ড থেকে ডানদিকে আরো কিছুদুর এগুলো দেখবেন আড়িয়ল বিলের ধারে জমিদার যদুনাথ রায়ের বাড়ি। বাড়ির প্রবেশ মুখে দেখা যাবে জমিদারের নাচঘর। ভেতরে দুটো পুরাতন দ্বিতল ও একটি একতলা ভবন। পুরাতন গাছগাছালি। নাগলিঙ্গম গাছের কান্ড ভেত করে বেরিয়ে আসা ফুলও চোখে পরতে পারে। দুটো বড় আকরের দিঘির সান বাঁধানো ঘটে বসে জিরিয়ে নিতে পারেন, চাইলে নেমে পরতে পারেন গভীর জলে। এখানে দেখা যাবে তৎকালীন বরফকল আর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার পুরাতন জেনারেটর। এসব দেখে অনেকে একে প্রাচ্যের প্যারিস নগরী হিসাবে উল্লেখ করেছেন। এখানে গড়ে তোলা হয়েছে বিক্রমপুর জাদুঘর। জাদুঘরের বিভিন্ন কক্ষে রক্ষিত আছে বিক্রমপুরের বিভিন্ন ঐতিহাসিক জিনিস পত্র ও বিখ্যাত ব্যাক্তিদের ছবি সহকারে জীবন বৃত্তান্ত।

সারাদিন ঘুরে আপনি যখন ফিরে যাবেন আপনালয়ে তখন নিজে নিজেই উপলব্ধি করবেন শ্রীনগর আসলেই সৌন্দর্যের নগর।

আরিফ হোসেন-সাধারণ সম্পাদক, শ্রীনগর প্রেস ক্লাবঃ

*** গ্রন্থমেলা ২০২০ এ প্রকাশিত মুন্সীগঞ্জ বিক্রমপুর জার্নাল বইয়ের শেষ নিবন্ধ হিসেবে প্রকাশ করায় ড. সাইদুল ইসলাম খান অপু ভাইয়ের কাছে কৃতজ্ঞতা***

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.