৪ বছর অতিবাহিত: মুসা মিজির সন্ধান আজও পায়নি পরিবার ও স্বজনরা

কাজী সাব্বির আহমেদ দীপুঃ ঘটনার সময় গভীর রাত পৌনে ২টা। ইউপি নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার ও ত্রাস সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বিপুল পরিমানের বিস্ফোরক ও স্প্রিন্টার দিয়ে তৈরী করা হচ্ছিল ককটেল। এমন সময় বিকট শব্দে বোমার বিস্ফোরন। মুর্হুতেই ঘটনাস্থল চৌচালা বসতঘরটি বেড়া, দড়জাসহ পুরো ঘরটি ধ্বংসস্তুুপ। ঘরের মেঝে ও আশেপাশে ছোঁপ ছোঁপ তাজা রক্তের দাগ। খবর পেয়ে পুলিশ যাওয়ার আগেই ককটেল বিস্ফোরনে হতাহতদের নিয়ে জড়িতরা আতœগোপনে। ২০১৬ সালের ১১ মে দিনগত গভীর রাতে মুন্সীগঞ্জ সদর ও টঙ্গিবাড়ীর সীমান্তবর্তী দরজারপাড় গ্রামের জামালউদ্দিন সর্দারের প্রবাসী ছেলে শিপন সর্দারের বসতঘরে এমন ভয়ঙ্কর ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল।

এদিকে ঘটনার পরপরই চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে ককটেল তৈরীর কারিগর মুসা মিজি ঘটনাস্থলেই নিহত এবং ৬ থেকে ৭ জন গুরুতর রক্তাক্ত জখম। ঘটনা ধামাচাপা দিতে পদ্মা নদীতে ফেলে দিয়ে নিহত মুসা মিজির লাশ গুম করার খবর। সেদিনের ঘটনার কথা মনে হলে এখনও আতঙ্কিত হয়ে ওঠে স্থানীয় গ্রামবাসী। আলোচিত সেই ককটেল বিস্ফোরনের ঘটনার ৪ বছর অতিবাহিত হয়েছে গত ১১ মে। কিন্তুু এখনও মুসা মিজির হদিস পাওয়া যায়নি। সে জীবিত আছে না ককটেল বিস্ফোরনে নিহত হয়েছে তাও শতভাগ নিশ্চিত হতে পারেনি কেউ। তবে মুসা মিজি জীবিত থাকলে পরিবার ও সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ করতো-এমন কথাই জানালেন স্ত্রী তাসলিমা বেগম।

মুসা মিজির স্ত্রী তাসলিম বেগম জানান, দুই মেয়ে সুমী ও চাদঁনীকে নিয়ে ঢাকায় ভাড়া বাসায় থেকে গার্মেন্টেসে চাকুরী করতেন তিনি। ২০১৬ সালের ১১ মে রাতে ককটেল বিস্ফোরনের ঘটনায় স্বামী মুসা মিজি নিহত হওয়ার খবর শুনে মুন্সীগঞ্জ সদরের মোল্লাকান্দি ইউপির পূর্ব মাকহাটী গ্রামের স্বামীর বাড়ীতে চলে আসেন। এখানে এসে জানতে পারেন, “ঘটনার পর পুলিশের ঝামেলা এড়াতে স্বামী মুসা মিজির লাশ পদ্মা নদীতে ফেলে দেওয়ার কথা”। কিন্তুু একই গ্রামের বারেক মল্লিক ও তার ছেলে মিল্টন মল্লিক গংদের হুমকির কারনে পুলিশকেও কিছু বলতে পারিনি।

তাসলিমা বেগম জানান, অপরাধমূলক কাজ করতে গিয়ে ঘটনাস্থলেই তার স্বামী নিহত হয় শুনেছি। সেই ঘটনার ৪ বছর অতিবাহিত হলেও জীবিত আছে না মারা গেছে, তা এখনও শতভাগ নিশ্চিত করেনি কেউ। তবে জীবিত থাকলে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতো দাবী করে বলেন, যেহেতু সে মারা গেছে, তাই লাশটি ফিরে পেলে অন্তত শান্তি পেতাম। স্বামীর কবরে গিয়ে দোয়া করতে পারতাম। সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ায় স্ত্রী তাসলিমার অভিযোগের সুরে প্রশ্ন, আমি এবং দুই সন্তান সুমী ও চাদঁনীতো কোন অপরাধ করেনি। তাসলিমা বেগম আরও জানান, শুনেছি, পূর্ব মাকহাটী গ্রামের বারেক মল্লিকের ছেলে মিল্টন মল্লিক তার বোন নিপা বেগমের নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের জন্য টঙ্গিবাড়ীর যশলং ইউনিয়নের দড়জারপাড় গ্রামের প্রবাসী শিপনের বসতঘরে ককটেল তৈরী করতে তার স্বামীকে নিয়ে যায়। এরপর বিস্ফোরনে ঘটনাস্থলেই মুসা মিজি নিহত হওয়ার খবর জানতে পারে তারা। ঘটনার পর পুলিশ যাওয়ার আগেই আইনী ঝামেলা এড়াতে হতাহতদের সরিয়ে ফেলা হয়। এর ফলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ককটেল তৈরীর আলামতসহ তাজা রক্তের দাগের দেখলেও হতাহতদের সনাক্ত করতে পারেনি।

মুসা মিজির স্বজনরা জানান, শীর্ষ এক রাজনৈতিক নেতা এবং মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের একাধিক নেতার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ এবং মাকহাটী গ্রামের বারেক মল্লিক ও তার ছেলে মিল্টন মল্লিক গংদের হুমকির কারনে ঘটনার তদন্তকালে পুলিশের কাছেও মুসা মিজি নিহত হওয়া এবং লাশ ফিরে পাওয়ার কথা জানাতে পারেনি তারা। এমনকি রাজনৈতিক প্রভাবের কারনে টঙ্গিবাড়ী ও সদর থানা পুলিশও ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম সঠিক ভাবে চালাতে পারেনি। স্বজনরা আরও জানান, দুই মেয়ে বিয়ে দেওয়ার পর এখন স্বামী মুসা মিজির ছোট্ট্র একটি টিনের ঘরে বসবাস করছে স্ত্রী তাসলিমা বেগম। সেখানে একটি লোহার খাট, একটি ওয়াড্রব ও একটি হাড়িপাতিল রাখার আলমারি ছাড়া আর কোন আসবাবপত্র নেই। সাংবাদিক আসার খবর পেয়ে এগিয়ে আসে মুসা মিজির স্বজনরা। তারা জানান, পূর্ব মাকহাটী গ্রামের মৃত মজিত মিজির তিন ছেলের মধ্যে মোসলেম মিজি ওরফে মুসা মিজি বড় ছেলে। তার ছোট দুই ভাই মোস্তফা মিজি ও দীন ইসলাম মিজি অটোবাইক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে। আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় বড় ভাইয়ের স্ত্রীকে তেমন সাহায্য করতে পারেনা। এ জন্য বিভিন্ন বাড়ীতে কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে তাসলিমা বেগমের।

পূর্ব মাকহাটী গ্রামের মিল্টন মল্লিকের স্বজনরা জানান, ঘটনা ঘটেছে টঙ্গিবাড়ীর দড়জারপাড় গ্রামে। ওই ঘটনায় মিল্টন মল্লিককে ষড়যন্ত্রমূলক আসামী করা হয়েছে। এছাড়া মুসা মিজির পরিবারকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট। মুসা মিজি মারা গেছে, না নিখোঁজ আছে-সে বিষয়টি মামলার সাক্ষীরা বলতে পারবে।

টঙ্গিবাড়ীর যশলং ইউপির মহিলা সদস্য প্রার্থী নিপা বেগম জানিয়েছিলেন, প্রতিপক্ষ প্রার্থী ষড়যন্ত্র করে ককটেল বিস্ফোরনের ঘটনায় তার ভাই মিল্টন মল্লিক ও ভাতিজা রিমন মল্লিককে মামলার আসামী করেছে। তার ভাই মিল্টন মল্লিক নির্বাচন দেখতে ইতালী থেকে এসেছিল। এ ঘটনায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও ঘটনার সঙ্গে কোন সম্পৃক্ততা পায়নি।

টঙ্গিবাড়ী থানা পুলিশ জানায়, তদন্ত শেষে ঘটনার ৪ মাসের মাথায় আদালতে চার্জশীট দাখিল করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬ জনকে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার প্রমান পাওয়া গেছে। সদরের মোল্লাকান্দি ইউপির পূর্ব মাকহাটী গ্রামের মিল্টন মল্লিক ও তার ভাতিজা রিমন মল্লিক মামলার অন্যতম আসামী। মুসা মিজি প্রসঙ্গে পুলিশ জানায়, ককটেল তৈরীকালে বিস্ফোরনের ঘটনায় কেউ নিখোঁজ থাকলে পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় জিডি করার সুযোগ ছিল। তারপরও তদন্তকালে মুসা মিজির স্ত্রী তাসলিমা বেগমসহ স্বজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেও বিষয়টি তারা পুলিশকে বলেনি।

মামলার বাদী এস আই এবিএম শাহ আলম এজাহারে উল্লেখ করেছেন, ঘটনাস্থল দড়জারপাড় গ্রামের জামালউদ্দিন সর্দারের সৌদি প্রবাসী ছেলে শিপন সর্দারের বসতঘরে তৈরীর সময় ককটেল বিস্ফোরনে চৌচালা টিনের ঘরের বেড়া, দড়জা, টিনসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র উড়ে গিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। চালের টিনের বিভিন্ন স্থানে স্প্রিন্টারের আঘাতে টিন ছিদ্র হয়ে গেছে। ঘরের মেঝেতে এবং আশেপাশে রক্ত জমাট বেধেঁ আছে। ঘর তল্লাসী করে বিপুল পরিমানের ককটেল তৈরীর সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। সৌদি প্রবাসী শিপনের ভাগ্নে মামলার এক নম্বর আসামী রকিব পরস্পর যোগসাজশে এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও জনমনে ত্রাস সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ককটেল তৈরীর সময় বিস্ফোরন হলে হতাহতদের আসামীরাই ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়।

গ্রাম নগর বার্তা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.