জাপানে ৩৯টি প্রিফেকচার ( প্রদেশ ) থেকে জরুরী অবস্থা প্রত্যাহার

রাহমান মনি: বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া কোভিড-১৯ মহামারী সংক্রমণের আশঙ্কায় জাপানব্যাপী ঘোষিত মোট ৪৭টি প্রিফেকচারের ( প্রশাসনিক প্রদেশ ) এর মধ্যে ৮টি তে বহাল রেখে বাকী ৩৯টি প্রিফেকচার থেকে জরুরী অবস্থা প্রত্যাহার করে নিয়েছে জাপান।

প্রধানমন্ত্রী শিনযো আবে ১৪ই মে বৃহস্পতিবার বিকেলে নিজ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের এ সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন। একই সাথে ১৫ই মে থেকেই এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করার কথা ঘোষণা দেন আবে।

যে ৩৯টি প্রিফেকচার থেকে জরুরি অবস্থা তুলে নেয়া হয়েছে সেগুলোয় দেশের মোট জনসংখ্যার ৫৪ শতাংশ লোকের বসবাস রয়েছে।

এপ্রিলের শুরুতে করোনাভাইরাস সংক্রমণ বৃদ্ধি পেলে এপ্রিল মাসে ৭ তারিখে রাজধানী সাতটি প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারি করে জাপান সরকার। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির অবনতি হয়ে চলার মুখে জরুরি অবস্থা সারা দেশে সম্প্রসারিত করে নেওয়া হয় এবং চলতি মাসের ৩১ তারিখ পর্যন্ত তা বলবৎ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। একইদিন বিশ্বব্যাপী করোনা (কোভিড ১৯) মহামারির প্রেক্ষাপটে থমকে যাওয়া অর্থনীতিকে কিছুটা হলেও চাঙা করে তুলতে জাপান সরকার জাপানে বসবাসরত প্রত্যেক নাগরিককে নগদ এক লাখ (১,০০,০০০)ইয়েন দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়। জাপানে বসবাস বিদেশী নাগরিকরাও এই আর্থিক সাহায্য পাবেন বলে ঘোষণা উল্লেখ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে আবে বলেন, কোভিড ১৯ মোকাবেলায় জাপান সরকার গৃহীত তহবিল ৬ লাখ কোটি ইয়েন থেকে ১৪ লাখ কোটি ইয়েন এ উন্নীত করার ঘোষিত অতিরিক্ত ৮ লাখ কোটি ইয়েন বরাদ্ধে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। বড় ,মাঝারি, ক্ষুদ্র এবং এস,এম,ই সব ধরনের প্রতিষ্ঠানই করোনার কারনে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন। সব ধরনের প্রতিষ্ঠানকেই সরকার আর্থিক সহযোগিতা করবে। বিশেষ করে এস,এম,ই’র প্রতি নজর দিতে হবে বেশী করে। কর্মহারা মায়েদের প্রতিদিন হিসেবে ৮,০০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৫,০০০ ইয়েন পর্যন্ত দেয়া হবে। যেসব পরিবারে উভয়ে কর্মহীন অথবা এককভাবে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, তাদের তিন মাসের বাড়ি ভাড়া বাবদ অফেরতযোগ্য আর্থিক সহযোগিতা এবং শিক্ষারথীদেরকেও সহযোগিতা করা হবে।

তিনি বলেন, একটি দুর্যোগ মোকাবেলায় সার্বিক বিবেচনায় সরকারকে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু তা বাস্তবায়নে সংসদ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বিচার বিভাগ সহ বেশ কয়েকটি ধাপ পার হতে হয়। এই জন্য একটু সময় লেগে যায়। সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্রাপ্তিতে জনসাধারণকে ধৈর্য ধারনের পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী আবে।

এরই মধ্যে করোনাভাইরাস সামাল দেওয়ার প্রচেষ্টায় বিগত কয়েক সপ্তাহের অগ্রগতির মুখে শেষ ২ সপ্তাহ বিশেষ করে জাপানব্যাপী গোল্ডেন এর ছুটিতে অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটলে সরকার এখন দেশের ৪৭টি জেলার মধ্যে ৩৯টি জেলায় জরুরি অবস্থা তুলে নেয়ার ঘোষণা দেয়া হলো। এর আগে এর আগে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা প্যানেল প্রধান অমি শিগেরুর নেতৃত্বে সরকারের একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জাপানের ৩৯টি জেলায় জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়ার সুপারিশ করে।

যে ৮টি প্রিফেকচারে ( রাজধানী টোকিও, বাণিজ্যিক রাজধানী ওসাকা প্রাক্তন রাজধানী কিয়োতো, হোক্কাইদো, হিয়োগো, সাইতামা, কানাগাওয়া ও চিবা ) জরুরি অবস্থা এখনো বহাল রয়েছে, সেই সব এলাকায়ও পরিস্থিতির অগ্রগতি বিবেচনা করে আগামী সপ্তাহে জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়ার ইঙ্গিত প্রধানমন্ত্রী আবে। তিনি বলেন, করোনাতে জাপানে মোট আক্রান্তের ৬০% হলো টোকিও এবং ওসাকা শহরে। মোট আক্রান্তের এক তৃতীয়াংশ শুধুমাত্র টোকিওতে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জীবনযাত্রায় সচল রাখা এবং চিকিৎসায় সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়ে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আনায় জাপানের এ সাফল্যের পেছনে জনগণের অবদানের উল্লেখ করে আবে বলেন, সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে লোকজন ঘরে অবস্থান করায় এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার পরামর্শ মেনে চলায় নতুন সংক্রমণের সংখ্যা হ্রাস পাওয়া লক্ষ করা গেছে। তবে জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়া হলেও এসব পদক্ষেপ বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা নাগরিকদের তিনি স্মরণ করিয়ে তিনি বলেন, আক্রান্তের সংখ্যা কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে, জাপান করোনা মুক্ত হয়েছে বা আমরা নিরাপদ অবস্থানে পৌঁছে গেছি। জাতীয় প্রয়োজনে জরুরী অবস্থা তুলতে হলেও ব্যক্তিগত সাবধানতা, সতর্কতা, সাম্প্রতিক জীবনযাত্রা যেন অপরিবর্তনীয় থাকে আমাদের সবার।

একই সঙ্গে করোনাভাইরাসের আরেকটি ঢেউ আঘাত হানার আশঙ্কাও তিনি নাকচ করে দেননি। তিনি বলেছেন, সে রকম অবস্থা দেখা দিলে সরকার আবারও জরুরি অবস্থা ঘোষণা করবে। এই ব্যাপারে আমাদেরকে চীন , জার্মান, সিঙ্গাপুর কিংবা কোরিয়া থেকে শিক্ষা নিতে হবে।

১৫ মে ‘২০ পর্যন্ত জাপানজুড়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ১৬,২০৩ জন। এর মধ্যে ১০,৩৮০ জন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ী ফিরেছেন এবং ৭১৩ জন মারা গেছেন । এরমধ্যে টোকিওতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৫,০৩০ জন এবং মারা গেছেন ২১২ জন।

তবে দিন দশেক ধরে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যার হিসাবে লাগাম টেনে ধরা—উভয় ক্ষেত্রেই আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি লক্ষ করা যায়। টোকিওতে যেমন আজ ৩০টি নতুন সংক্রমণ শনাক্ত করা হয়েছে। ১১ই মে ছিল ৩৬ জন, ১২ই মে ২২ জন এবং ১৩ই মে ১৫ জন। এ নিয়ে পরপর ১২ দিন ধরে সারাদেশে নতুন সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার সংখ্যা শতকের নিচে সীমাবদ্ধ আছে।

সংবাদ সম্মেলনে, নাগরিকদের কেনাকাটা, গণ পরিবহন ব্যবহার, খাদ্যাভাস, খেলাধূলার আসর, বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজনসহ অন্যান্য আয়োজনে পরিবর্তন আনার অনুরোধ জানান প্রধান মন্ত্রী আবে। এছাড়াও, জরুরী অবস্থামুক্ত ৩৯টি প্রিফেকচারের সবাইকে আগের মতোই মাস্ক পরা, ২ মিটার দূরে থাকা, ঘন ঘন হাত ধোয়া, ঘরে ফেরার পর কাপড় পরিবর্তন করা, দূরে থেকে কাজ করা এবং ভিড়ের সময়ে গণপরিবহন এড়িয়ে চলার আহ্বান জানানো হয়।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা প্যানেল প্রধান অমি শিগেরু সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে একই সাথে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হন।

rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.