মুন্সীগঞ্জে নিষিদ্ধ ব্যবসায় অবৈধ আয়

মোজাম্মেল হোসেন সজলঃ মুন্সীগঞ্জে রাঘববোয়াল ও নৌ-পুলিশের নিয়ন্ত্রণে চলছে অবৈধ কারেন্টজাল ব্যবসা। নিষিদ্ধ ব্যবসায় অবৈধ আয়ে মেতেছে মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুর নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ।

অবৈধ কারেন্টজাল উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে পরিচিত মুন্সীগঞ্জ। জেলা প্রশাসন, র‌্যাব, কোস্টগার্ড, জেলা মৎস্য বিভাগ, নৌ-ফাঁড়ি এবং ডিবি পুলিশের উদ্যোগে কারেন্টজাল দিনের পর দিন জব্দ করা হচ্ছে, আগুনে পোড়ানো হচ্ছে কিন্তু উৎপাদন বন্ধ হচ্ছে না। রাঘববোয়াল সিন্ডিকেটের তালিকানুযায়ী একপক্ষের লোকদের ফ্যাক্টরিতে অভিযান এবং অন্যপক্ষের লোকদের সুবিধা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে মুক্তারপুর নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সিন্ডিকেটের কাছ থেকে তিনি বিপুল পরিমাণ টাকা মাসোহারা এবং অভিযানে কারেন্টজাল জব্দের পর সামান্য পরিমাণ রেখে সেই জাল আবার সিন্ডিকেটদের কাছে বিক্রি দেয়ার। আর ওই বস্তাগুলোর মুখে কিছু কারেন্টজাল রেখে এবং ভেতরে নষ্ট মালামাল রেখে তা পুড়িয়ে ফেলা হয় অন্যত্র নিয়ে।

কিন্তু কারেন্টজাল একেবারে নিষিদ্ধ বা তা উৎপাদন ও বিপননের ক্ষেত্রে সরকারের তরফ থেকে কড়াকড়ি আইন না করা হলে এই ব্যবসায় চাঁদাবাজি এবং ব্যবসা বন্ধ হবে না বলে জানিয়েছে পঞ্চসারের সাধারণ মানুষ।

তারা জানিয়েছেন, ভারত, সিঙ্গাপুরসহ পৃথিবীর বহুদেশে কারেন্টজাল উৎপাদন হয়। কিন্তু সেসব দেশের আইন কড়াকড়ি এবং সুনিদিষ্ট থাকায় মৎস্য আহরণে কোন ক্ষতি হচ্ছেনা। কিন্তু বাংলাদেশে আইন শক্তিশালী না হওয়ায় নিষিদ্ধ কারেন্ট জালের ব্যবসা নিয়ে প্রশাসনের কেউ কেউ ও স্থানীয় রাঘববোয়াল সিন্ডিকেট সদস্যরা একচেটিয়া অবৈধ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। রাঘববোয়ালদের সাধারণ ব্যবসায়ীরা মাসিক চাঁদা দিয়েও রক্ষা হচ্ছে না। আবার রাবঘবোয়ালদের মাসিক চাঁদা না দিলেও সাধারণ ব্যবসায়ীদের নানা হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে, উদ্ধার অভিযানে জব্দ হওয়া কারেন্টজাল সরকারি কোষাগারে রক্ষিতা রাখার আইন না থাকায় অভিযানকারীরা এক টাকার জাল ১শ’ টাকা দেখানোর অভিযোগ আছে। পরে এসব জাল পুড়িয়ে বিনষ্ট করা হয়।

এদিকে, মুক্তারপুর নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি সরকারি নিয়ম উপেক্ষা করে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। সিন্ডিকেটদের তালিকানুযায়ী দিনে রাতে অভিযান চালাচ্ছেন। অভিযানের পর মাঝেমধ্যে স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তাদের ডেকে নিয়ে জব্দকৃত অধিকাংশ কারেন্টজাল সরিয়ে বাকিটা পুড়ে ফেলছেন। এসব জাল একটি সিন্ডিকেটের কাছেও বিক্রির অভিযোগ আছে। ৪-৫ জনের সিন্ডিকেটটির ব্যবসা কারেন্টজাল আয়রন করা। অন্যরা ইচ্ছে করলেও আয়রন মেশিন বসাতে পারেনা তাদের দৌরাত্মে। এই সুযোগে জাল আয়রনে আকাশচুম্বী টাকা রেট করেছে সিন্ডিকেটটি।

এদিকে, ২০২০ সালের ১০ মার্চ সরকারি গেজেটের দফা (ক)-তে উল্লেখ করা হয়েছে নদী, হ্রদ বা নৌপথের সর্ব্বোচ পানি স্তর যে স্থানে ভূমি স্পর্শ করে সে স্থান থেকে ভূ-ভাগের দিকে ৫০ মিটারের বেশি নৌপুলিশ অভিযানে যেতে পারবে না। এই আদেশ অমান্য করে মুক্তারপুর নৌ-পুলিশ ফাঁড়ি শত শত মিটার দূরের ভূমিতে গিয়ে অভিযান চালানোর অভিযোগ উঠেছে।

দুর্গাবাড়ির চুমকি বেগম জানান, মুক্তারপুর নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ কবির হোসেন অভিযান চালিয়ে অবৈধ কারেন্টজাল জব্দ করেন। ৫০ বস্তা জব্দ করলে ২০ বস্তা দিয়ে মামলা করা হয়।

জোড়পুকুরপাড়ের রনি জানায়, গত ১২ জুন রাত ৯টায় দুর্গাবাড়িতে নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ৬৫ বস্তা কারেন্টজাল জব্দ করে। পরে ২০ বস্তা দিয়ে মামলা দেখায়। বাকি জাল কোথায় গেল? অবৈধ কারেন্ট জাল মুক্তারপুরেই পুড়িয়ে বিনষ্ট করা হতো। এখন আর বিনষ্ট করা হয় না। এই জাল নিয়ে তারা কোথায় যায়? কী করে আমরা কিছুই জানি না? এছাড়া নৌপথেও তার বিরুদ্ধে বালুবাহী বাল্কহেড, কয়লাবোঝাই ট্রলারসহ নৌপথে চলাচলরত বিভিন্ন মালবাহী নৌযান থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে।

অবৈধ কারেন্টজাল ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, প্রশাসনকে ম্যানেজ করাসহ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে আয়রন খরচ বৃদ্ধি করা হয়েছে। যেখানে গত মাস-দেড়েক আগে হাফপাউন্ড জাল আয়রন করতে ৩৫-৪০ টাকা নেয়া হতো সেখানে এখন ২৫০-২৬০ টাকা করে নেয়া হচ্ছে। তাদের আয়রন খরচ দিয়ে লাভ থাকে ২-৩ টাকা। তারপর প্রশাসনকে ম্যানেজের নামে মাসোহারাতো আছেই। কিন্তু তারাতো কোন ম্যানেজ করতে পারছে না।

বর্তমানে ৪-৫ জনের রাঘববোয়ালই আয়রন ফ্যাক্টরিগুলো চালায়। আয়রন ফ্যাক্টরিতে অভিযান চালানো হলে ক্ষতিও হয় কারেন্টজাল ব্যবসায়ীদের। কারেন্টজাল জব্দ করে নিয়ে গেলেও রাঘববোয়ালদের আয়রন মেশিন জব্দ বা সিলগালাও করা হয়না।

এই বিষয়ে মুক্তারপুর নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কবির হোসেন খান জানান, নিয়মতান্ত্রিকভাবেই নিয়মিত অভিযান চলছে। জাল সরিয়ে ফেলা হলে আমরা যে জাল পুড়াচ্ছি সেগুলো কোথা থেকে আসে? আমরা কারেন্টজাল উদ্ধারে কারো পক্ষে-বিপক্ষে নেই। রাঘববোয়ালদেরও ছাড় দিচ্ছি না। তাদের সবার বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছি।

তিনি ৫০ মিটার প্রসঙ্গে বলেন, নদীতে ক্রাইম হয়েছে, কিন্তু উৎস বা আসামি-অস্ত্র অনেকদূরে। সেখানে আমাদের যেতে হবে। উৎপত্তি-গোডাউন সবখানেই যেতে বাঁধা নেই।

অবজারভার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.