মুন্সীগঞ্জে পদ্মাপাড়ের বানভাসীদের ঈদ ভাবনা

‘তিন বেলা খাইতে পারলেই ঈদ হইয়্যা যাইবো’
কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু, পদ্মার পাড় থেকে ফিরে: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসে লিখেছেন, ‘ঈশ্বর থাকেন ভদ্র পল্লীতে’। মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী ও লৌহজং উপজেলার ভাঙ্গন কবলিত পদ্মা তীরের গ্রামে গিয়ে ভিটেমাটিহারা মানুষের হাহাকার দেখে মনে হবে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওই উপন্যাসের কথা। পদ্মাতীরের মানুষজন তাদের ঘর সরাচ্ছেন, গাছ কাটছেন। প্রিয় পৈত্রিক ভিটা চোখের সামনে পদ্মার গর্ভে বিলীন হওয়ার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছেন। পদ্মার ভাঙ্গন তান্ডবে এলাকার বিত্তবান পরিবারগুলো মুর্হুতেই পথে নামছে ভিটেমাটি হারিয়ে। এসব মোনুষের কাছে পবিত্র ঈদ-উল-আযহা নিয়ে কথা বলতে বিবেকে বাঁধছিল। তারপরও ঈদ প্রসঙ্গে কথা হয় বানভাসি লৌহজংয়ের যশলদিয়া গ্রামের মো হুমায়ুন মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন,“কোমর সমান বন্যার পানিতে থৈ থৈ করছে তার বসতবাড়ী। আর বন্যা পরিস্থিতির যেই অবস্থা, তাই পরিবার নিয়্যা তিন বেলা ভাত খাইতে পারলেই ঈদ হইয়্যা যাইবো”।

“দিনমজুর স্বামীর পৈত্রিক বাড়িঘর পদ্মায় ভাঙগা নেয় আগেই। পরে পিতার বাড়ী টঙ্গিবাড়ীর বড়াইল গ্রামে ঘর তুইল্যা আশ্রয় নিছিলাম। এইবার সেই আশ্রয়স্থলটিও পদ্মায় লইয়্যা গেছে। এহন, একটা ঘর তুইল্যা থাহনের ল্যাইগা জায়গা খুজতাছে দিনমজুর স্বামী তোফাজ্জল মিয়া। এর মধ্যে ক্যামনে ঈদ করমু ভাই” কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বললেন দরিদ্র গৃহবধু সীমা বেগম।

টঙ্গিবাড়ী উপজেলার পাচঁগাও ইউনিয়নের বড়াইল গ্রামের বৃদ্ধা আলেয়া বেগম জানালেন, ‘পদ্মার বড় বড় ঢেউ ও ¯্রােতের সো সো শব্দে ঘুম নাই তাগো, ঘুমন্ত অবস্থায় বিভিন্ন বসতবাড়ি মতো তারাও যদি পদ্মার ঘুর্নায়মান ¯্রােতে তলাইয়্যা যাই, এ ভয়ে রাতে না ঘুমাইয়্যা জাইগ্যা থাহেন তারা। আগে চাইচ্চ্যা লই, তারপর ঈদ করন যাইবো’।

এদিকে বৃদ্ধা আলেয়া বেগমের সঙ্গে কথা বলার সময় এগিয়ে আসে রহিমা বেগম, শাহের বানু, বিউটি আক্তার নামের তিন নারী। ঈদ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তারা বলেন,‘ গত ঈদে সরকার চাউল দিছে, এইব্যার দিবো কিনা জানি না’।

এদিকে নদীর পাড় ভেঙ্গে যাওয়ার আগে ফাটল দেখা দেয়। এ রকম ফাটল ধরা মাটির একটি খন্ডের ওপর দাড়িয়ে গেল লৌহজংয়ের খড়িয়া গ্রামের বৃদ্ধা হেনা বেগম। তাকে সরে আসতে বললে ওই বৃদ্ধা বললেন, ‘ফাটল ধরা মাটির সঙ্গে পইড়্যা গেলে ভালো হয়, এতো কষ্ট থাহে না। পদ্মার ভাঙ্গনের যেই খেলা দেহা যাইতাছে, মনে হইতাছে, স্বামীর পৈত্রিক ভিটা এবার রক্ষা করতে পারুম না। আগে ঘরবাড়ী বাচাঁইয়া লই, নিজেরা বাইচ্যা লই, তহন ঈদ করতে পারমু’।

একই গ্রামের বৃদ্ধা ররুনি বেগমের বয়স ১১০ বছর, বয়সের ভাড়ে চলতে পারে না ঠিকমতো। ঈদের কথ শুনে তিনি কাপা কণ্ঠে বলেন,‘বাবা রে, অনেক কষ্টে মাথা গোঁজার পাই পাইছিলাম এহানে। পদ্মায় হেইডাও কাইড়া লইয়া গেল, অহন যে কই যাইমু তা ঠাহর করতে পারতাছি না, ঈদ কইর‌্যা কি থাহনের জায়গা পামু’।

সদর উপজেলার পদ্মার তীরের বানিয়াল মহেশপুর গ্রামের বানভাসী দিনমজুর আলাউদ্দিন মিয়ার বাড়ীর উঠানে হাটু পানি। ঈদ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দিনমজুরের স্ত্রী শ্যামলী বেগম বলেন,‘হুনতাছি বন্যার পানি বাড়বো, তাই হেরে কইছি ঢাকায় বইনের বাড়ীতে যাওনের লেইগ্যা। চারিদিকে পানি থৈ থৈ করতাছে। দিনমজুর স্বামীর কাম-কাইজ বন্ধ থাকায় সংসার চালাইতেও হিমশিম খাইতে হইতাছে। ঈদ আইলেও কি হইব, তিন বেলা যাতে খাইতে পারি এহন এই চিন্তায় আছি।’

লৌহজংয়ের হলদিয়া ইউনিয়নের শিমুলিয়া গ্রামের শাহিন মিয়া বলেন, করোনার কারনে দীর্ঘদিন ধরে কর্মহীন মানুষ। এর মধ্যে বন্যায় পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর দিন কাটছে। তবে সামান্য কিছু সরকারি সহযোগিতা পেয়েছে তারা।

সোমবার টঙ্গিবাড়ী ও লৌহজং উপজেলার পদ্মা তীরের গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, উত্তাল পদ্মার বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরবর্তী গ্রামগুলোতে। সঙ্গে প্রচন্ড গতিতে ঘুর্নায়মান ¯্রােতের সো সো শব্দ। এই স্রোতের শব্দের ভয়ে রাতে জেগে থাকছে পদ্মার তীরের শত শত মানুষ। এর মধ্যে বানের পানি এসে চারিদিকে এখন থৈ থৈই অবস্থা। গত দুই সপ্তাহ ধরে বানের পানিতে ভাসছে পদ্মা পাড়ের হাজার হাজার পরিবার। পানিবন্দি অবস্থায় এসব পরিবার এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে।

পদ্মার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সোমবারও মুন্সীগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। উজান থেকে ধেয়ে আসা পানি প্রবাহের কারণে সোমবার শ্রীনগরের ভাগ্যকুল পয়েন্টে বিপদসীমার ৭৮ সেন্টিমিটার ও লৌহজংয়ের মাওয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৬৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পদ্মার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। মাওয়া পয়েন্টে সোমবার আরও ২ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের মধ্যঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিলে মুন্সীগঞ্জের নদী তীরবর্তী ১৫০টি গ্রাম বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়ে পড়ে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অর্ধলক্ষাধিক পরিবার। অনেক গ্রামে বসতঘরের মধ্যেই কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও বুক সমান পানি। এসব বসতঘরে থাকা মানুষজনের সঙ্গে বিপদে পড়েছে গবাধি পশু ও হাঁস-মুরগিও। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ঘরের মাচা উচুঁ করলেও বানভাসী শত শত পরিবার চরম বিপাকে পড়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার ২৫টি ইউনিয়নে প্রায় ১৫০টি গ্রাম বন্যার পানিতে ভাসছে। এর মধ্যে লৌহজং উপজেলার ৪৬টি গ্রাম, টঙ্গিবাড়ী উপজেলার ৩৫টি গ্রাম, শ্রীনগর উপজেলার ১৬টি গ্রাম, সিরাজদীখান উপজেলার ১৪টি গ্রাম, সদর উপজেলার ২২টি গ্রাম ও গজারিয়া উপজেলার ১২টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন জেলার ৬টি উপজেলার মধ্যে লৌহজং, শ্রীনগর ও টঙ্গিবাড়ী এই ৩টি উপজেলাকে বন্যা কবলিত এলাকা চিহ্নিত করে ত্রান সামগ্রীসহ অন্যান্য সহায়তা প্রদান করছে। গত শনিবার মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো মনিরুজ্জামান তালুকদার লৌহজং ও শ্রীনগর উপজেলার বন্যাদূর্গত এলাকা পরিদর্শন ও বানভাসী পরিবারের মাঝে ত্রাস সামগ্রী বিতরণ করেছে বলে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

গ্রাম নগর বার্তা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.