পুরনো ঢাকার রহমতগঞ্জ হাটে উঠেছে মিরকাদিমের ধবল গরু

ঐতিহ্য ধরে রাখতে কিছু খামারি টিকে আছে
কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু: প্রাচীনকাল থেকেই কোরবানীর ঈদে মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমের ধবল (সাদা) গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও ঢাকার রহমতগঞ্জে মিরকাদিমের ধবল গরুর হাট বসেছে। দীর্ঘ বছর ধরেই ধবল গরুর বেশ সুনাম ধরে রেখেছে পুরান ঢাকার রহমতগঞ্জ হাটে। মিরকাদিম বুট্টি গরু ও বাজা গাভীর জন্য বিখ্যাত হওয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উৎকৃষ্ট মানের গরু কিনতে বিত্তশালী ও ব্যবসায়ীরাও অপেক্ষায় থাকে। আর ধবল গরু ছাড়া কোরবানী যেন শতভাগ সম্পন্ন হয় না পুরান ঢাকাবাসীর। তাই মিরকাদিমের গরু দিয়ে প্রাচীনকাল থেকেই কোরবানীর প্রচলন ঐতিহ্য হয়ে দাড়িয়েছে ঢাকাবাসীর। তবে ক্রমাগত লোকসান ও গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে অনেকে গরু মোটা তাজাকরণ ব্যবসায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলায় খামারের সংখ্যাও ব্যাপক ভাবে কমে যাচ্ছে। এক কথায় মিরকাদিমের ধবল গরু এখন বিলুপ্তির পথে। তাই ধবল গরুর পাশাপাশি নেপালি, ম-ি, হাঁসা, পশ্চিমা ও সিন্ধি জাতের গরু পাওয়া যায় মিরকাদিমে।

স্থানীয় খামারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশেষ ভাবে পালন কৌশলের কারণে এসব গরুর গোশত যেমন সুস্বাদু হয়। সাধারণত খৈল, ভুষি, খুদ ইত্যাদি খাওনো হয় এবং স্বাস্থ্য ভালো গরু গুলোর যতœ নেয় খামার মালিকরা। তাই দাম ও চাহিদাও বেশি। পুরনো ঢাকার রহমতগঞ্জসহ রাজধানীর বড় বড় হাটগুলোতে এসব গরুর দেখা মেলে। তবে গত কয়েক বছর ধরে পুরান ঢাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরা ঈদের কয়েক মাস আগেই মিরকাদিমে চলে আসেন গরু কিনতে। তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে গরু পছন্দ করে কিনে ফেলে এবং গৃহস্থদেরই ঈদ পর্যন্ত গরু পালনের দায়িত্ব ও খরচ দিয়ে যায়। ফলে কোরবানির হাটে ওঠার আগেই অনেক গরু বিক্রি হয়ে যায়। তবে এখনো পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহি পরিবারগুলো মিরকাদিমের গরু কোরবানিকে পারিবারিক ঐতিহ্য মনে করেন।

মিরকাদিমের গৃহস্থ ইয়াকুব আলী জানান, বাপ-দাদারা যেভবে গরু পালন করেছে, আমরা সেভাবে পারি না। আগের সাদা জাতের ধবল গাভী গরু আগের মতো পাওয়া যায় না। একই এলাকার বিশ্বজিৎ বনিক জানান, গাভী গরু গৃহস্থ পরিবারের লক্ষ্মী। বর্তমানে তার ২২টি গাভী রয়েছে। ষাড় রয়েছে একটি। এ এলাকায় বেশীর ভাগ গৃহস্থরা গাভী গরুই লালন-পালন করে। অনেক যতœ নিয়ে পালন করা হয়। মশা-মাছি যেন কামড়াতে না পারে, সে জন্য মশারির ভেতর্ েরাখা হয় এবং গরমে বৈদ্যুতিক পাখা আর ঠান্ডার জন্য গরম কাপড় শরীরে জড়িয়ে রাখা হয়।

গরুর খামারীরা জানান, অন্যান্য অঞ্চলে বুট্টি গরু পাওয়া গেলেও মিরকাদিমের বুট্টি গরুর বৈশিষ্ট্য আলাদা। আকারে অনেক ছোট এই গরুর চেহারা দেখলেই বুঝা যাবে গোশতের সাধ কী হবে। এর বাহ্যিক অবয়ব খুব তেলতেলে ও গোলাকৃতির হয়। গোশত মোলায়েম ও সুস্বাদু। এ ছাড়া নেপালি গরুর উচ্চতা খুবই আকর্ষণীয়। ম-ি, সিন্ধি অনেক রঙের হলেও পশ্চিমা আর হাঁসা গরু সাদা রঙের। সাদা এসব গরুর উচ্চতা সবচাইতে বেশি। গরুর হাটে আকর্ষণ বৃদ্ধিতে এসব গরুর চাহিদা বেশ। সিন্ধি গরুর চাহিদা বিশ্বব্যাপী। সেটাও এখানে পাওয়া যায়।

তারা আরও জানান, এ কারনেই মিরকাদিমের গরুর চাহিদা অনেক। তাই কোরবানী ঈদের ৬ থেকে ৭ মাস আগে থেকে তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছোট ও বাছাই করা গরু কিনে নিয়ে আসেন। বিশেষ করে বাজা গাভী, খাটো জাতের বুট্টি গরু, নেপালি, সিন্ধি জাতের গরু আনা হয়। তবে এ গরু গুলোর বিশেষত্ব হচ্ছে এগুলোর বেশির ভাগের গায়ের রঙ সাদা ও নিখাদ হয়। এতে প্রতিটি গরু কিনতে দাম পরে ৪০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। মোটাতাজা করতে খরচ পড়ে ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। বিক্রেতাদের দাবি, একটি গরুর পেছনে অনেক টাকা খরচ হয়। যতœ নিতে হয় অনেক বেশি। কিন্তুু কোরবানীর হাটে বিক্রি করে তেমন লাভবান হওয়া যায় না। তবে ঐতিহ্য ধরে রাখতে বাপ-দাদার এ ব্যবসায় কিছু খামারি কোন মতে টিকে আছে।

স্থানীয় খামার মালিকরা জানায়, এক সময় মিরকাদিমের প্রতিটি ঘরে ঘরে বিশেষ জাতের গরু লালন-পালন করা হতো। এখানে ছিলো তেলের ঘানি বা মিল, ধান-চালের মিল। খুব সস্তায় খৈইল, ভুষি, খুদ, কুড়া পাওয়া যেত। এখন চালের মিল থাকলেও খৈল, ভুষি, কুড়ার দাম বেশী। ৫০ কেজি চালের কুড়া ৮০০ টাকা, ৫০ কেজি চালের খুদ ১৭৫০ টাকা, ৩৫ কেজি গমের ভূষি ১৩০০ টাকা। এর ফলে গরু মোটাতাজাকরণে প্রচুর লোকসান হয়। তাই গরু মোটা তাজা করার হার অনেক কমে গেছে। কয়েকটি পরিবার বর্তমানে পেশা ধরে রেখেছে। এছাড়া গৃহস্থ পরিবারগুলোর সদস্যরা বেশীর ভাগই অন্য পেশায় জড়িত হয়ে পড়ায় গরু পালন কমে এসেছে।

গ্রাম নগর বার্তা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.