পদ্মার গ্রাসে সর্বস্ব হারানো জহুরাদের আর্তনাদ শোনার কেউ নেই!

জহুরা বেগম (৬০)। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে পদ্মার পাড়ে বসবাস করছিলেন। এখানে থেকেই তিন মেয়ে ও দুই ছেলের বিয়ে দিয়েছেন। বড় ছেলেরা এখন আর তার খোঁজ-খবর নেয় না। কয়েক বছর ধরে এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে একটি দুই চালা টিনের ঘরে কোনোরকমে দিন পাড় করছিলেন। ঘরটিই ছিল তার একমাত্র সম্বল। এক সপ্তাহ আগে সেটিও পদ্মার শাখা নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে।

জহুরা বেগম মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার দিঘীরপাড় ইউনিয়নের কান্দারবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা।

গত বছর জহুরা বেগম তার স্বামীকে হারিয়েছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর ছোট ছেলে জহিরুল ইসলাম (১৫) সংসার চালাচ্ছেন। দিনমজুরের কাজ করে কোনোমতে সংসার চালাতে পারলেও বসতঘরটি অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে পুনরায় নির্মাণ করার সামর্থ্য নেই তাদের। ফলে বসতঘরটি ভেঙে নদীর পাড়েই রেখে ভাঙন থামার অপেক্ষায় জহুরার পরিবার।

শুধু জহুরা নয়; নিজ্জ্বল, রানা, জসিম, দেলোয়ার, দোহা, আক্তার, কামলা খাঁ, মজিবুর, লিটন, সোলেমান, লতিফ, সজিব ও দ্বীন ইসলামসহ ওই গ্রামে প্রায় দেড়শ পরিবার বাস করত। গত ২০ দিনে পদ্মার শাখা নদীর ভাঙনে একশর বেশি পরিবার বসত ভিটাসহ সর্বস্ব হারিয়েছেন।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সকালে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, টঙ্গিবাড়ী উপজেলার দিঘীরপাড় বাজার এলাকার পদ্মার শাখা নদীতে প্রচণ্ড স্রোত বয়ে যাচ্ছে। ফলে নদীর দু’পারেই ভাঙন অব্যাহত আছে। নদীর দক্ষিণ পাড়ে টঙ্গিবাড়ী উপজেলার কান্দারবাড়ি থেকে সদর উপজেলার পূর্বরাখি ও দেওয়ানকান্দি এলাকায় ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। প্রায় তিন কিলোমিটার জুড়ে চলছে ভাঙন।

সবচেয়ে খারাপ অবস্থা কান্দিরপাড়া গ্রামে। একটি সম্পূর্ণ গ্রাম বিলীন হয়ে মাত্র ৮-১০টি ঘর কোনোরকমে টিকে আছে। ভাঙনে বিলীন হয়েছে কান্দারবাড়ি জামে মসজিদটি। বসতি হারিয়ে কেউ কেউ টিনের ছাপরা বানিয়ে সেখানে আছেন। কয়েকজন তাদের ঘর ভেঙে ট্রলারের করে অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি ভাঙনের মুখে রয়েছে কয়েকটি দোকানঘর এবং দিঘীরপাড় বাজারের বাঁশ পট্টি এলাকা।

এছাড়া সদর উপজেলার পূর্বরাখি গ্রামের মাদানি কমপ্লেক্সের একটি দু’তলা ভবন ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিলীন হয়েছে মাদানি কমপ্লেক্সের একটি রান্নাঘর সহ ওই মাদ্রাসার খানকাঘরটিও।

স্থানীয়রা জানান, এই গ্রামে তিন সপ্তাহ আগেও দেড় শতাধিক পরিবার বসবাস করত, ছিল মসজিদ। এ গ্রামেও পালন করা হত আনন্দ, উৎসব। দিনভর চলত ছেলে-মেয়েদের খেলা-ধুলা। এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যাওয়া আসা। এখন সব কিছুই অতীত। গেলো তিন সপ্তাহে পদ্মার শাখা নদীর তীব্র স্রোতে ভাঙনে গ্রামটি এখন অস্তিত্ব হারাতে বসেছে।

ইতোমধ্যে মাত্র ৮-১০ টি ঘরে ছাড়া সবই পদ্মায় বিলীন হয়েছে। বসতভিটা হারিয়ে অধিকাংশ মানুষ বাঁচার তাগিদে অন্যত্রে পাড়ি জমিয়েছে। তবে জহুরার মতো কিছু মানুষ অভাব ও গ্রামের মায়ায় এখনো নদীর তীরে বসে আশায় দিন গুনছেন। ভাঙন কমলে আবারও সেখানে নতুন করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম শুরু করবেন।

ভাঙনকবলিত লিটন, সলেমান, লতিফ, সজিব ও দ্বীন ইসলাম জানান, অপরিকল্পিত ও অবৈধ ভাবে দিঘীরপাড় এবং পূর্বরাখি এলাকার পদ্মা নদীতে বালু উত্তোলনের ফলে পদ্মা নদীর তীরে ভাঙন দেখা দিয়েছে। নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তীব্র স্রোত তীরে এসে আঘাত করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভাঙনরোধে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এতে ভাঙন বেড়েই চলেছে।

কান্দিরপাড়া এলাকার ভাঙন কবলিত মজিবুর রহমান বলেন, আমার বসত বাড়ির একটি ঘর এক সপ্তাহ আগে পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। পাশের ছোট একটি ঘরে পরিবারে পাঁচজন সদস্য নিয়ে বসবাস করছি। ওই ঘরটিও যে কোনো দিন নদীতে বিলীন হতে পারে। টাকা পয়সা না থাকায় অন্য কোথায় ঘর ভেঙে নিতে পারছি না। কয়েক জনকে অনুরোধ করেছিলাম ঘরটা ভেঙে নদী ওপার (দিঘীর পাড়) দিয়ে আসতে। পরে কাজ করে তাদের টাকা শোধ করে দিবো। কিন্তু বাকিতে হওয়ায় তারা কাজ করতে রাজি নন।

সবমিলিয়ে সম্পূর্ণ গ্রামটি এখন ভাঙনে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। ইতোমধ্যে ভাঙনের কারণে ঘর-বাড়ি হারিয়ে অনেকে এ এলাকা ছেড়ে অনত্র্য পাড়ি জমিয়েছেন। তবে ভাঙন রোধে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে না বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে টঙ্গিবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসিনা আক্তার বলেন, এ নদীর দিঘীরপাড় বাজার অংশে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কথা রয়েছে। তবে ভাঙন কবলিত ওই অংশে এ মুহূর্তে কোনো পরিকল্পনা নেই। আপাতত ভাঙন রোধে কোনো উদ্যোগ নেওয়া যাচ্ছে না।

তিনি আরও জানান, ১৫ দিন আগে সেখানে গিয়েছিলাম। প্রচণ্ড রকম ভাঙন চলছিল। ভাঙন ও অসহায় মানুষ গুলোর তথ্য প্রতিদিন পানি উন্নয়ন বোর্ডে পাঠানো হচ্ছে। পাশাপাশি ভাঙন কবলিত পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। ওই খানে যাদের জমি আছে তাদের ঘর তুলে দেওয়া হবে। যাদের যায়গা নেই খাস জমি সন্ধান করে সেখানে পুনর্বাসন করা হবে।

বিষয়টিতে মুন্সিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী টি এম রাশেদুল কবির দৈনিক অধিকারকে বলেন, ওই গ্রামটি চরের মধ্যে পড়েছে। চর রক্ষায় সাধারণত কোনো স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া হয় না। তাই ভাঙন থেকে রক্ষা করতে কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে যারা বসতি হারিয়েছে জেলা অথবা উপজেলা প্রশাসন তাদের পুনর্বাসন করবে।

দৈনিক অধিকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.