মুন্সীগঞ্জে মৌসুমি সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি আলুর বাজার

শেখ মোহাম্মদ রতন: মুন্সীগঞ্জের ছয় উপজেলায় হিমাগারে পর্যাপ্ত আলু মজুত রয়েছে। তা সত্ত্বেও বেড়েই চলেছে পণ্যটির দাম। দাম স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ না নেওয়া হলেও দাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অব্যাহতভাবে দাম বাড়তে থাকায় ভোক্তাদের নাভিশ্বাস। হিমাগার কর্তৃপক্ষ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেটই কারসাজি করে আলুর দাম বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এক্ষেত্রে মৌসুমি একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় বলে জানা গেছে।

আলু উত্তোলন মৌসুমের শুরুতে প্রান্তিক চাষিদের কাছ থেকে আলু কিনে নেন মৌসুমি ব্যবসায়ী ও পাইকাররা। পরে তা সংরক্ষণ করা হয় হিমাগারে। এ মৌসুমি ব্যবসায়ীরাই মূলত আলুর বাজার নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখেন বলে জানা গেছে। তারা সুযোগ বুঝে বাজারে আলুর দাম বাড়িয়ে দেন। দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরু থেকেই এ চক্রটি সক্রিয়।

চলতি মাসেই নতুন মৌসুমের আলুর চাষাবাদ শুরু করা হবে। এ অবস্থায় হঠাৎ করে আলুর দাম অস্বাভাবিকহারে বেড়ে গেছে। এ নিয়ে ভোক্তাদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার দাম নির্ধারণ করে দিলেও তা কাজে আসেনি। এসব উদ্যোগকে ছাপিয়ে মৌসুমি মধ্যস্বত্বভোগী ও হিমাগার কর্তৃপক্ষের সিন্ডিকেটই আলুর দাম নির্ধারণের নিয়ন্তা হিসেবে ভূমিকা রাখছে।

আলু বিক্রেতা জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, তিন-চার দিন আগে প্রতিকেজি আলু কেনা হয় ৩৮ থেকে ৪০ টাকায়। এখন তা সরকার-নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে ব্যাপক লোকসান হবে। এ অবস্থায় তিনি প্রতিকেজি আলু ৪৫ টাকায় বিক্রি করছেন।

মুন্সীগঞ্জের স্থানীয় বাজারের বিক্রেতা মো. রফিক জানান, ‘সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে আলু বিক্রি করলে এখন লোকসান হবে। সপ্তাহখানেক আগে বাড়তি দামে কেনা আলু এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি দামে বিক্রি করলে কেজিতে লোকসান হবে ১০ থেকে ১২ টাকা।’ উল্লেখ্য, খুচরা পর্যায়ে প্রতিকেজি আলুর দাম ৩৫ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার।

ব্যবসায়ীরা জানান, করোনাকালে ত্রাণের জন্য ২০ থেকে ২৫ টাকায় প্রতিকেজি আলু বিক্রি হয়েছে। আর বাজারের সংকট মোকাবিলায় হিমাগারের আলু দ্রুত সময়ের মধ্যে বাজারজাত করা সম্ভব নয়। কারণ বর্তমানে সপ্তাহে তিন দিন আলু বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়া হিমাগারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী, ডিসেম্বর পর্যন্ত সেখানে আলু রাখা যাবে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, হিমাগারে আলুর দাম কেজিপ্রতি ৩০ টাকা।

এ বিষয়ে জেলা শহরের মুক্তারপুর এলাকার এলাইড হিমাগারের ব্যবস্থাপক আতাউর রহমান জানান, হিমাগার থেকে প্রতিকেজি আলু ২৩ টাকা দরে বিক্রির তাগাদা দিচ্ছে প্রশাসন। হিমাগার কর্তৃপক্ষ এসব আলুর মালিক নয়। মজুত করা আলুর অর্ধেকই বীজ। তবে গতবারের তুলনায় এবার আলুর উৎপাদন কম। এ কারণে মজুতও কম। কয়েক দফা হাত ঘুরে আলু বিক্রি হওয়ায় দাম বেশি হচ্ছে। যারা আলু রেখেছেন, তাদের প্রশাসনের নির্দেশনার কথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা অল্প সময়ের মধ্যে আলু বাজারজাত করবেন বলে জানিয়েছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ শাহ্ আলম জানান, জেলায় ৬৫টি হিমাগার রয়েছে। এগুলোয় মজুত আছে এক লাখ ৭৭ হাজার মেট্রিক টন আলু। এখনও হিমাগারে পর্যাপ্ত আলু আছে। তিনি বলেন, বাজারের চাহিদার তুলনায় সবজির সরবরাহ কিছুটা কম। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট আলুর দাম বাড়াচ্ছে।

সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শিহাবুল আরিফ বলেন, সরকার-নির্ধারিত দাম মেনে না চললে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মূলত মজুতদারির কারণে বর্তমানে সংকট দেখা দিয়েছে। আলুর স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় থাকলে সংকট তৈরি হবে না। সেজন্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে মজুতকারীদের সবাইকে আলু বাজারে ছাড়তে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেন, ‘জেলায় এ বছর আলুর ফলন ভালো হয়েছে। কৃষকরাও বিগত বছরগুলোর তুলনায় লাভবান হয়েছেন। তবে সম্প্রতি আলুর দাম বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি খুবই আলোচনায় এসেছে। এত শোরগোলের কোনো কারণ দেখছি না।’ তিনি বলেন, আলুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিমাগার মালিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেছি। এরই মধ্যে সরকারও আলুর দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। সে দাম বাস্তবায়নে কাজ চলছে। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে আলুর দাম বাড়াবে, বা সরকারের নির্ধারিত দাম মানবে না, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মুন্সীগঞ্জে বিগত মৌসুমে সাড়ে ৩৭ হাজার হেক্টর জমিতে ১৩ লাখ ২৭ হাজার ২৭ মেট্রিক টন আলু উৎপাদন করা হয়। জেলার ৬৫টি হিমাগারের ধারণক্ষমতা সাড়ে পাঁচ লাখ মেট্রিক টন।

শেয়ার বিজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.