চরে আটকা যাদের জীবন

মুন্সীগঞ্জ জেলার উপর দিয়ে বয়ে গেছে দেশের ১০টিরও বেশি নদ-নদী। এসব নদ-নদীর অববাহিকায় রয়েছে সাড়ে ৩শ’র বেশি চর। যুগের পর যুগ নদীর ভাঙা-গড়া খেলায় বন্দী হয়ে আছে মুন্সীগঞ্জের চরাঞ্চলের প্রায় ২ লাখেরও বেশি চরবাসীর জীবন। দরিদ্রতা যেন তাদের পিছু ছাড়ছেই না।

ভাঙনের খেলায় চরে আটকা যাদের জীবন

তাদের অবস্থা এমন- কোন চর ভাঙনের কবলে পড়লে সেই চরের বাসিন্দারা সর্বস্ব হারিয়ে আবার নতুন করে বসতি গড়ে তোলেন জেগে ওঠা নতুন কোন চরে। তবে ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই ফের ভাঙনে ঘর-বাড়ি জমি-জমাসহ হারিয়ে নিঃশ্ব হচ্ছেন তারা। এভাবেই চলছে তাদের জীবন চক্র।

কোন চর ভাঙনের কবলে পড়লে সেই চরের বাসিন্দারা সর্বস্ব হারিয়ে আবার নতুন করে বসতি গড়ে তোলেন জেগে ওঠা নতুন কোন চরে

মুন্সীগঞ্জের চরাঞ্চলের বাসিন্দা জাব্বার মোল্লা। বয়স ৭০ বছর। নদী যতই দুঃখ দিক না কেনো, নদীর সাথেই যেন তার রক্ত ও জন্মের সম্পর্ক। নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে শিশুকাল, শৈশব, যৌবন পেরিয়ে এখন ৪ সন্তানের জনক তিনি। নদীর পানিতে মাছ আর নদীর জেগে ওঠা চরে জীবিকা নির্বাহ করতে করতেই ৭০ বছর পার করলেন এই বৃদ্ধ।

১৯৭০ সালের কথা। মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার কনকসার ইউনিয়নে বাপ-দাদার জোতদারী ছিল। বর্তমান টেউটিয়া চরে বাড়ি তাদের চৌচালা টিনের ঘর, সুপারীর বাগান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ ছিল সেই বাড়িতে।

মুন্সীগঞ্জ জেলার উপর দিয়ে বয়ে গেছে দেশের ১০টিরও বেশি নদ-নদী

ভারতের সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশের সীমানা দিয়ে অভ্যন্তরে প্রবেশ করা ব্রহ্মপুত্র নদ একদিন গড়িয়ে গড়িয়ে তাদের বসত ভিটার নিকটবর্তী হলো। ভাঙন আরো তীব্র হলো। সেই সময়ে নদের প্রখর স্রোত আর তীব্র ভাঙনে একদিন-একরাতেই নিশ্চিহ্ন করে দিলো তাদের বসত ভিটা। ঘর-বাড়ির সামান্য কিছু সরাতে পারলেও বাকি সব গ্রাস করে নিয়েছিল ব্রহ্মপুত্র।

তারপর ঠিকানা হয় ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে জেগে উঠা নতুন চর ঝাউটিয়া চরে। সেখানে ৫ থেকে ৬ বছর বাপ-দাদার জেগে ওঠা জমিতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা। তারপর আবারো বসত-ভিটাসহ ঘর-বাড়ি ভেঙে নেয় ব্রহ্মপুত্র। আবারো ঠিকানা হয় ওই নদের বুকে জেগে ওঠা দক্ষিণের চরে। সেখানে ৩ থেকে ৪ বছর আবারো ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা। তারপর আবারো ভাঙন। স্থান পরিবর্তন হয় পাষে চরে। এভাবেই তার জীবদ্দশায় ৯ থেকে ১০ বার এই ভাঙা গড়ার খেলা খেলতে খেলতে বর্তমানে ঠিকানা মিলেছে লৌহজং চরে। সেখানেই পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন জাব্বার মোল্লা।

চরের বালু জমিতে কাশবন সরিয়ে নতুন করে শুরু হয় হাড়ভাঙা পরিশ্রম

ব্রহ্মপুত্রের চরে বসবাসকারী মেছের আলীর (৫০) ভাগ্যেও জব্বারের মতো ভাঙা গড়া খেলা হয়েছে বহুবার। নয়বার ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে ঘর-বাড়ি সরাতে সরাতে আশ্রয় মিলেছে লৌহজং টানিংয়ের খাসারহাট চরে। সাত সন্তানের জনক মেছের আলী। সবার বিয়ে দিয়েছেন চরেই।

চরাঞ্চলে বসবাসরত এমন কোন পরিবার পাওয়া যাবে না যাদের ঘর-বাড়ি নদ-নদী গ্রাস করেনি। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র নদের চরগুলোতে বসবাসকারীদের প্রায় প্রত্যেক পরিবারের ঘর-বাড়ী নদের ভাঙনের শিকার হয়েছে ৫ থেকে ১০ বার পর্যন্ত।

জেলার দুর্গম চরাঞ্চলগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, যখন একটি চর পুরোটাই ভাঙনের কবলে পড়ে তখন সেই চরে বসবাসরত ৪ থেকে পাচঁশ পরিবার একই সাথে পার্শ্ববর্তী কোন নতুন চরে বসতি গড়ে তোলে। সেখানে চরের বালু জমিতে কাশবন সরিয়ে নতুন করে শুরু হয় হাড়ভাঙা পরিশ্রম। বালু জমিতে দিনরাত পরিশ্রম করে চিনা বাদাম, কাউন, ধান, ডাল, ভুট্টা, গম, চিনা, সুজি, টিসি, গুজি তিল, তিল, কালিজিরা, ধনিয়া, শালুক, মিষ্টি আলুসহ নানা ফসল চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করতে থাকে। এক সময় ভিটের নতুন লাগানো গাছ বড় হয়। ভিটেতে শাক-সবজি যেমন মামাকলা (জংলি পটল) গাছের পাতা, ঢেঁকি শাক, থানকুনি পাতা, কচুর লতি, কুমারী লতা, তিত বেগুন, কলমি শাক, হেলেঞ্চা শাক, ভাউত্তা শাক, চটা শাক, আগ্রা শাক, মুরমুইররা শাক, গোল হেলেঞ্চা শাকসহ আরও কত শাক-সবজি চাষ হয়।

চরে জমিতে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ফলান শাক সবজি

তাছাড়া হাঁস-মুরগী পালন হয়, দু-একটি গরুও। কিন্তু ঘুরে দাঁড়ানোর এই সময়টাতে আবারো ভাঙনের কবলে পড়ে সেই চরের মানুষেরা।

এরপর ৩ থেকে ৫ বছরে হাড়ভাঙা পরিশ্রমে সঞ্চিত সবটুকুই চলে যায় ঘর সরিয়ে অন্য কোন নতুন চরে ভিটে তৈরি আর ঘর মেরামতের পিছনে। নিঃস্ব হতে হয় আবারো। অবশিষ্ট থাকে শুধু দুটি হাত আর নতুন চরের ধু ধু বালু জমি। এ অবস্থায় কিছু পরিবারের প্রাইমারি পাশ করা সন্তানরা কাজের সন্ধানে ঢাকাসহ অন্যান্য বড় শহরে পাড়ি জমালেও সেখানে তাদের শ্রমিকের কাজ ছাড়া আর কিছুই জোটে না। তাদের সামান্য রোজগারে নিজেদের খরচ মেটানোর পর পরিবারের জন্য আর কিছুই করতে পারে না।

চরাঞ্চলের মানুষদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা সরকারি বা বেসরকারি কোন রিলিফ চান না। তারা শুধু নদ-নদীর ভাঙনটাই বন্ধ চান। তাহলেই তারা চরের বাসিন্দা হয়েও সুখে শান্তিতে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারবে। তারা জানান, চরের জমি হলেও সেটা নিজের জমি।

জন্ম থেকেই ব্রহ্মপুত্রে অববাহিকায় বেড়ে ওঠা সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের দশবিশের চরের তমিজ মিয়া (৭৫) জানান, ৪০/৪৫ বছর আগে ব্রহ্মপুত্রে দুই দিকে এতো বেশি চর ছিল না। আগে ব্রহ্মপুত্রের একটি মাত্র নদ ছিল যার গভীরতা ছিল অনেক বেশি। ফলে ভারত থেকে নেমে আসা পানি সহজেই নদ বেয়েই গড়িয়ে যেতো। কিন্তু ধীরে ধীরে নদের গভীরতা কমতে শুরু করে। এতে করে বন্যার সময় উজান থেকে নেমে আসা পানি নদ আর বহন করতে পারে না। ফলে এই পানি নদের দু’কুল ছাপিয়ে নতুন নতুন পথ তৈরি করে বিস্তীর্ণ এলাকা ভেঙে নিয়ে যায়। এতে করে অনেক শাখা নদীর সৃষ্টি হয়েছে।

দারিদ্রতার জরিপে প্রতিবছর দারিদ্রতার শীর্ষেই অবস্থান মুন্সীগঞ্জ জেলার

লৌহজংয়ে টেউটিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইলাম বলেন, আমার ইউনিয়নের প্রায় পুরোটাই ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় অবস্থিত। এখানে বসবাসকারী সকল মানুষই দারিদ্র সীমার নীচে। একমাত্র ভাঙনের কারণেই তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন না। স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধ করা গেলে দারিদ্রতা থাকবে না।

দীর্ঘদিন চরাঞ্চল নিয়ে কাজ করা স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা ‘মর্তুজাখান মনে করেন, ভাঙন রোধে ইমারজেন্সি ওয়ার্কে টাকা না ঢেলে বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করে গবেষণার মাধ্যমে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনায় ভাঙনরোধ করতে হবে। তবেই চরের মানুষদের সুদিন ফিরে আসবে।

তা না হলে এদেশের দারিদ্রতার জরিপে প্রতিবছর দারিদ্রতার শীর্ষেই অবস্থান থাকবে মুন্সীগঞ্জ জেলা।

মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট সুত্র বলে, জেলার সবগুলো নদ-নদীর ভাঙনরোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্ল্যান তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে তীর রক্ষার কাজ হচ্ছে। দ্রুত শুরু হবে পরিকল্পনা । পর্যায়ক্রমে সবগুলো নদ-নদীর তীর রক্ষায় স্থায়ী কাজ করা হলে আর নদ-নদীর ভাঙন থাকবে না।

মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান তালুকদার জানান, নদ-নদীর ভাঙনরোধ হলে চরবাসীর জীবন-মানের উন্নয়ন হবে। সে লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। পাশাপাশি চরের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।

মো. রুবেল ইসলাম তাহমিদ
বার্তা২৪

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.