স্বজন হারাচ্ছি: ছোট আম্মা ছবি হয়ে গেলেন

মুন্সীগঞ্জের আব্দুল্লাপুরে চোকদারদের বড় পরিবার। চাচা-চাচি, ভাই-বোনরা মিলেমিশে থাকে। চাচিদের বড় আম্মা, মেজো আম্মা, মামণি, ছোট আম্মা ডাকার চল পরিবারটিতে। এর মধ্যে করোনা ছোট আম্মাকে কেড়ে নিলে সৌরভ চোকদার ৩০ বছর আগে তোলা ওই ছবিটি নিয়ে বসেছিলেন

ছবিটা সম্ভবত জামশেদ মামা তুলে ছিলেন। তিনি বড় আম্মার ফুফাতো ভাই। কমলাঘাট বন্দরে দুটি স্টুডিওর একটির মালিক ছিলেন মামা। রিল ক্যামেরার আমল। বুঝে-শুনে, গুছিয়ে সবাই তখন ছবি তুলত। আমাদের দাদার নাম রমিজউদ্দিন চোকদার। তাঁর বাবার নাম আজগর আলী চোকদার। বড় বাবাকে আমরা দেখিনি। দাদা ছোটখাটো আধা কালো বর্ণের মানুষ ছিলেন। আসল বাড়ি আব্দুল্লাপুরের কাছে চর সলিমাবাদে ছিল। দাদা একটি মুদি দোকান চালাতেন। কিন্তু তাঁর পরিবার ছিল বড়। আমার বড় চাচা তাই বেশি লেখাপড়ার সুযোগ পাননি। মেজো চাচাও না। আমার বাবাও নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে কাজ করতে চলে গিয়েছিলেন নীলফামারী। তাঁর ছোট ভাই মানে সোনা চাচাও পড়াশোনা তেমন করতে পারেননি। তবে চিনি চাচা ডিগ্রি পাস করেছিলেন।

আর আমার ছোট চাচা (করোনা তাঁকেও হারিয়ে দিয়েছে ছোট চাচি মারা যাওয়ার সপ্তাহখানেকের মাথায়) কুতুবউদ্দিন চোকদার গ্র্যাজুয়েট হয়েছেন মুন্সীগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজ থেকে। ছোট চাচা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, বন্ধুবৎসল। বড়রা ছোট ভাইটিকে খুব আদরে রেখেছিলেন। ছোট চাচা তাই রাজনীতিকেই ধ্যান-জ্ঞান করার সুযোগ পেয়েছিলেন। একটু বাড়িয়ে বললে বলা যায়, ছোট চাচাকে তামাম মুন্সীগঞ্জ চেনে। আমাদের ভাই-বোনদের বিয়ে হয় চাচার নামেই। সেই ছোট চাচা বিয়ে করলেন আশির শেষ দিকে। খুব ধুমধাম হয়েছিল। রিকাবীবাজার থেকে থান কাপড়ের গাট্টি আনা হয়েছিল। সেগুলো দিয়ে আমাদের সব ভাই-বোনের একরকম জামা বানানো হয়েছিল। চাচার শ্বশুর ছিলেন জাঁদরেল মানুষ। লম্বা, ফরসা, ফায়ার সার্ভিসের কর্তা। খুব ভালো দাবা খেলতেন। আর পাখি শিকার করতে ভালোবাসতেন। তাঁর মেয়ে আমাদের বাড়িতে ছোট আম্মা হয়ে এলেন। টুকটুকে ফরসা, গোলগাল। বাড়িটাকে আলো করে ফেললেন। খুব হৈচৈ হলো। খাওয়াদাওয়া, যাওয়া-আসা চলল সপ্তাহ ধরে। মিজানুর রহমান সাহেব বুঝি তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী! তিনিও বিয়েতে এসেছিলেন।

বড় চাচা শামসুদ্দিন চোকদার তখন আর বেঁচে নেই। তিনি আর তাঁর বন্ধুরা মিলে পঞ্চাশের দশকে আব্দুল্লাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ গড়ে তুলেছিলেন। আর মেজো চাচা একেবারে সাদাসিধে মানুষ ছিলেন। সব সময় ব্যাপারী পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি পরতেন। ধর্মভীরু মানুষ ছিলেন। সেই সঙ্গে ছিলেন পড়ুয়া। দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জে হলুদ-পেঁয়াজের ব্যবসা করতেন। প্রতিবার মোকামে যাওয়ার আগে তিনি নিউ মার্কেটে বলাকা সিনেমা হলে একটি করে ছবি দেখতেন। সেগুলোর মধ্যে ‘ম্যাকানাস গোল্ড’, ‘গুড ব্যাড অ্যান্ড আগলি’ও ছিল। মেজো কাকার পরই আমার বাবা। তিনি একেবারেই সোজা মানুষ ছিলেন। বিয়ে করেছিলেন পাশের গ্রাম পাইপাড়ার তাহের মুনশির বড় মেয়েকে। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে। তাহের মুনশি তখন এলাকার ডাকসাইটে বড়লোক। সুতার ব্যবসা করে অনেক টাকা করেছিলেন। আর আমার বাবা ছিলেন নেত্রকোনায় হাবিব ব্যাংকের স্টোরকিপার। বিয়ের পর বাবার দাদা শ্বশুর (ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন) বলেছিলেন, ‘তুমি ব্যাংকে চাকরি করো, তোমার উপহার আমি নিব না।’ বাবা চাকরি ছেড়ে দিয়ে শ্বশুরের গদিতে কাজ নিয়েছিলেন। সোনা চাচা মানে ফরিদ চোকদার ছিলেন ডাকাবুকো মানুষ। ছোটখাটো কিন্তু টুকটুকে ফরসা ছিলেন। বালক বয়স থেকেই মোকামে মোকামে ঘুরতেন। পরিবারে তাঁর অবদান অনেক। চিনি চাচা মানে মহিউদ্দিন চোকদার। তিনি রুচিবান মানুষ ছিলেন। হেমন্ত, মান্না প্রমুখের গান শুনতেন, পরিপাটি থাকতেন। তিনি একটি জুট মিলের মাঝারি মানের কর্মকর্তা ছিলেন।

এবার ছবিটি
দ্য চোকদারস নামে ফেসবুকে একটি পেজ আছে। ছোট আম্মার ছোট মেয়ে শিথিলা চোকদার ছবিটি পোস্ট দিয়েছিল। ছবিতে শিথিলা বাঁ থেকে পরিচয় লিখেছে ‘স্বর্ণ বু, বড় আম্মা, ঝর্ণা আপা, কোলে রাতুল ভাইয়া, দাঁড়ানো আছে শিহাব ভাই, শোভন ভাই, ফিরোজ ভাই, বসে আছেন ছোট আম্মা, কোলে অথৈ বু, মেজো আম্মা আর জ্যোস্না আপা।’ ছবিটির বয়স শিথিলার চেয়ে বেশি; বেশি ওর বড় বোন মিথিলার চেয়েও। তখন ওদের সবার বড় বোন অথৈয়ের বয়সই এক বছর মোটে। ছবিতে দেখছেন স্বর্ণ বসে আছে শুরুতেই। স্বর্ণ দরদি মেয়ে। একটা কিন্ডারগার্টেনে পড়াত। ছাত্র-ছাত্রীরা বাড়ি এসে ফুল-ফল দিয়ে যেত ওকে। স্বর্ণ এখন স্বামীর সঙ্গে রিয়াদ থাকে। স্বর্ণর পরে আছে বড় আম্মা। স্বর্ণ তাঁরই ছোট মেয়ে। বড় আম্মার বাবার বাড়ি রিকাবীবাজার। বড় আম্মা সত্তর পেরিয়েছেন। সেই ১৯৮১ সালে বড় কাকা মারা যাওয়ার পর তিনিই ছেলে-মেয়েদের আগলে রেখেছেন। ঝর্ণাবুকে দেখা যাচ্ছে তারপর। চোকদারদের খুব আদরের মেয়ে। নম্র, ভদ্র, সহনশীল। আব্দুল্লাপুরের হাই স্কুলের সাবেক পরিমল স্যার, হক স্যার, হিমাংশু ভূষণ মান্না এখনো ঝর্ণা বুবুর কথা বলেন। বুবুর বিয়ে হয়েছে ঢাকার বাড্ডায়। স্বামী মারা গেছেন বছর দুই আগে। একটা ছেলে, নাম জাওয়াদ, পড়ে এআইইউবিতে। বুবুর কোলে বসে আছে রাতুল। ছোট কাকার বড় ছেলে। রাতুল একটা মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট বিক্রির প্রতিষ্ঠানে কাজ করে। রাতুলের একটি মেয়ে আছে, বয়স দেড় বছর। তারপর আছে শিহাব, আমার চার নম্বর ভাই। সোজা মানুষ। কেউ ওর সাহায্য চাইলে তা বৃষ্টির দিন হোক বা রাত গভীর, সে না করতে পারে না। শিহাবকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে শোভন। মেজো কাকার ছোট ছেলে। গাট্টাগোট্টা, কর্মঠ। সদরঘাটের লালকুঠি ব্যায়ামাগারে বিকেলে গিয়ে রাত করে ফিরত। মাঝখানে অনেক দিন কোরিয়ায় ছিল। তারপর ফিরোজ। মিষ্টি ছেলে ফিরোজ, স্বর্ণর ঠিক বড়। স্কুলে পড়ায়। ফিরোজের সামনে ছোট আম্মা বসে আছেন। ছোট আম্মার পাশেই মেজো আম্মা।

আমাদের প্রায় ৪০ জন ভাই-বোনের পরিবার। মেজো আম্মা সবার যত্ন নিতেন। এখন মেজো আম্মার কোমরের হাড় ক্ষয়ে গেছে। থেরাপি নিতে হয়। তারপর আছেন জ্যোস্না বু। ঝর্ণা বুবুর পরের বোন। তাঁর ছেলে ফাত্তাহ জাপানে থাকে। আমার মা, সোনা আম্মা আর চিনি আম্মা ছবিতে নেই। যে বাড়িতে বসে ছবিটি তোলা সেটাতে আমার দাদা উঠে এসেছিলেন দেশ স্বাধীন হওয়ার অল্প আগে। আব্দুল্লাপুর বলা চলে সে আমলে শহর ছিল, আর সলিমাবাদ ছিল চর। পঁয়ষট্টির পাক-ভারত যুদ্ধের ডামাডোলে অনেক হিন্দু পরিবার আব্দুল্লাপুর ত্যাগ করে বিভুঁইয়ে পাড়ি জমায়। তাদেরই একজনের ছিল এই বাড়িটা। তিন মহলা বাড়িটা, জমিদার বাড়িই বলা যায়। আমাদের নানারা, চাচারা, খালারা, খালুরা, বিয়াইরা সবাই একসঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন। আমাদের সবার বড় ভাই মানে বড় চাচার বড় ছেলেটা মারা গেছেন নব্বইয়ের মাঝামাঝি। তারপর একে একে মেজো চাচা, চিনি চাচা, সোনা চাচা গেলেন। আমার বাবা গেলেন গেল রমজানে। তখন ভর করোনা। আমরা ঢাকা থেকে চুপি চুপি আব্দুল্লাপুর গিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে কবর দিয়ে ফিরে এসেছিলাম। আমাদের বাড়িতে করোনা ঠেকানোর যাবতীয় নিয়ম-কানুন মানা হয়েছে। বাজার সদাইয়ের জন্য শুধু গিয়াসউদ্দিন ভাই বাজারে যেতেন। ছোট আম্মার পরিবার দোতলা থেকে নামতই না বলতে গেলে। কিন্তু গেল ডিসেম্বরের শেষ দিকে ছোট আম্মার খুব শ্বাসকষ্ট হলো। তাঁকে নিয়ে আসতে হলো ধানমণ্ডির পপুলার হাসপাতালে। সেখানে খরচ অনেক বেশি। রাতুল একে-তাকে ধরে একটা সিট ম্যানেজ করে আম্মাকে নিয়ে এলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। সেখানে তিনি আইসিইউতে থাকলেন তিন রাত। তারপরের রাত ১২টার পরে তিনি চলে গেলেন দুনিয়া ছেড়ে। শিথিল-মিথিল খুব কাঁদল, আমেরিকা বসে কাঁদল অথৈ। ততক্ষণে ছোট চাচা আবার আইসিইউতে। তাঁকে কিছু জানানো হলো না। রাত ২টায় শিহাব আর জুয়েল ভাই এলেন পিকআপ নিয়ে। চোকদাররা আবার চলল চুপি চুপি আব্দুল্লাপুর। গাঢ় অন্ধকার পাগলা, ফতুল্লা জুড়ে ছড়িয়ে। কেউ কথা বলছিল না। কান্নাও থেমে গিয়েছিল। সবাই বুঝি ভাবছিল—এ অন্ধকার কাটবে কবে?

কালের কন্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.