সব ঘটনা-ই ‘নিউজ’ হওয়া উচিত নয়।

রাহমান মনিঃ বিশ্বে প্রতিদিন ই অসংখ্য ঘটনা ঘটছে। তার কতোটুকুই বা আমরা জানি বা জানতে পারি? সাংবাদিকদের নিরলস প্রচেষ্টায় কিয়দংশ জানার সৌভাগ্য হয়। আবার সংবাদকর্মীদের জানা সব ঘটনাই কি আমরা জানতে পারি ?

পত্রিকার মাধ্যমে আমরা যে সব খবর জানতে পারি তা কোন না কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু সব ঘটনা-ই সংবাদ হয়ে পত্রিকার পাতায় স্থান পায় না। পাওয়া উচিতও না। এখানেই একজন সংবাদকর্মীর মেধা ও মননের পরিশীলতা।

আবার অনেক সংবাদই ইচ্ছা করেই সাংবাদিকরা ইচ্ছা করেই প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকেন। বিভিন্ন বিবেচনা থেকে সাংবাদিকতার নীতি মেনেই কাজটি করে থাকেন।

এই ব্যাপারে একটি সত্য ঘটনার উল্লেখ করতে চাই।

সত্তর দশকের মাঝামাঝি। মুন্সিগঞ্জ এর নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হরগংগা মহামিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী খাতা ঘষামাজা করে পরীক্ষার ফলাফল নিজ অনুকূলে নিলে কলেজ কর্তৃপক্ষ(অধ্যক্ষ কর্তৃক) আইনের আশ্রয় নিয়ে শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে একটি জালিয়াতি মামলা ঠুকে দেন।

বিষয়টি থানা হয়ে সাংবাদিকদের কানে পৌঁছে যায়। জালিয়াতির বিষয়টি পত্রিকায় প্রকাশ করার জন্য সাংবাদিকদের উপর পরোক্ষ চাপ আসলে, মফস্বল সাংবাদিকতার পথিকৃৎ, মুন্সিগঞ্জ প্রেস ক্লাব সভাপতি, ইত্তেফাক মহকুমা (তখন মহকুমা ছিল) প্রতিনিধি, সিনিয়র সাংবাদিক, ভাষা সৈনিক সফিউদ্দিন আহমেদ স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিকদের সাথে বসেন। যার মধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ইকবালও উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিকদের অনেকেই বিষয়টি পত্রিকায় প্রকাশ করার পক্ষে মত দেন।

কিন্তু শ্রদ্ধেয় সফি ভাই শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এবং এলাকার সন্মানের কথা চিন্তা করে পত্রিকায় তা প্রকাশ না করে শিক্ষার্থীকে ডেকে এনে আচ্ছা মতো একটা ধমক দিয়ে ভবিষ্যতের জন্য সাবধান করে দেয়ার পক্ষে মত দেন।

সফি ভাইয়ের যুক্তি ছিল প্রথমত, এতে করে ছেলেটির সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে এবং ছেলেটি ভুল পথে পা বাড়াতে পারে। আর, ছেলেটিকে সুযোগ দিলে সে হয়তো লজ্জিত হয়ে সংশোধন করে নিবে। দ্বিতীয়ত, কলেজের সুনাম নষ্ট সহ এলাকার একটা বদনাম হয়ে যাবে।

সফি ভাইয়ের যুক্তির কাছে হার মেনে সবাই শিক্ষার্থীকে সাবধান করে দেয়ার পক্ষে মত দেন এবং সেই মোতাবেক কাজও করা হয় । অথচ সফি ভাই যদি পত্রিকায় লিখতেন তাহলে তিনি তার সন্মানীটাও পেতেন। কারন, সেই সময় সাংবাদিকগন লিখার জন্য পারিশ্রমিক পেতেন। আমরা বলতাম, ইঞ্চি মেপে অর্থ ।

পরে অবশ্য শিক্ষার্থীটি তার ভুল বুঝতে পেরে নিজেকে সংশোধন করে নিয়ে সমাজে আজ প্রতিষ্ঠিত।

এতো কিছু লিখার উদ্দেশ্য হলো কতোটা উচু মানুষিকতার অধিকারী হলে একজন মানুষ সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে এলাকার সন্মানের কথা ভেবে সুনিদিষ্ট আয়ের পথ থেকে সরে এসে এমন উদারতা দেখাতে পারেন !

এর বিপরীত মানুষিকতার লোকের অভাবও নেই এই সমাজে।

মাত্র সপ্তাহখানেক আগে জাপানে একটি ন্যাকারজনক ঘটনা ঘটে যার জন্য জাপান প্রবাসীরা কেহ প্রস্তুত ছিল না। তারপরও ঘটনা ঘটে গেছে। কেহ মেনেও নেয়নি। বরং ঘৃণাই জানিয়েছেন সবাই।

ঘটনাটি জাপান পুলিশ হয়ে কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। কোর্টই তার ফয়সালা করবে। তবে, এইক্ষেত্রে অপরাধীও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবেই আইনী সহায়তা পাবেন। আইনী ব্যাপার আইন দিয়েই সমাধান হবে।

আমার লিখার উদ্দেশ্য তাকে তার পক্ষে সাফাই গাওয়া কিংবা ফাঁসি দাবীর পক্ষে জনসমর্থন গড়ে তোলা নয়। কিছু মানুষের মুখোশ উন্মোচন করার জন্যও নয়। তারপরও যদি কাকতলীয়ভাবে কারোর চরিত্রের সাথে মিলে যায় তাহলে সেটা সম্পূর্ণই তার ব্যক্তিগত।

বলছিলাম জাপানে ঘটে যাওয়া ন্যাক্কারজনক ঘটনার কথা। লকে বলে, খারাপ খবর নাকি প্রচারের প্রয়োজন হয়না। বাতাসে এমনিতেই ভেসে বেড়ায়, দুষ্ট লোকেরা লুফে নিয়ে তা প্রচার করে থাকে। আর, যদি বাড়ীর কাজের লোকের কানে একবার পৌঁছতে পারে তাহলে আর কথা নেই, সিএনএন এর আগেই তার হয়ে যাবে।

কিন্তু জাপানের মতো দেশে থেকেও যে কিছু সংখ্যক মানুষ বাংলাদেশের বাসাবাড়ির কাজের লোকের চেয়েও নিচু মানুষিকতার তা ভাবতেই তাদের জন্য করুণা হয়। পারিবারিক শিক্ষাটা তারা ছাড়তে পারেনি।

জাপানে ঘটে যাওয়া ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি নিজস্ব অনলাইন টিভি চ্যানেল থেকে প্রচার করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে একটি মহল।

সচিত্র প্রচারে নিজেরা ক্ষণিকের জন্য কিছুটা উৎফুল্ল হলেও একটিবারও কি ভেবে দেখেছেন যে তাদের কারনে একটি পরিবার সামাজিকভাবে কতোটা ক্ষতির শিকার হয়েছে বা হ’তে পারে ?

অন্যায় করেছে ব্যক্তিটি এককভাবে ক্ষনিকের সুখে। আর, পরিবারটি খেসারত দিচ্ছে ধুঁকে ধুঁকে।

দেশে থাকা পরিবারটি এমনিতেই লজ্জায়, অপমানে মাথানত। প্রাপ্ত বয়স্ক তার একটি মেয়েও রয়েছে। তার বিয়েও হয়েছে। শশুরালয়ে মেয়েটির অবস্থান কোন পর্যায়ে পৌছবে বিষয়টি জানার পর !

জাপান প্রবাসীদের মাথা কি নত হয়নি উক্ত প্রচারে ? বহির্বিশ্বে জাপান প্রবাসীদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে নিশ্চয়।

একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনাকে যারা এবং যাদের প্ররোচনায় ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে তাদের ব্যাক্তি জীবনের অনেক ঘটনা কি জাপান প্রবাসীদের অজানা ? তারা কি তাই ভাবেন ?

সরকারী অর্থের সহযোগিতা নিয়ে যিনি এই তথ্যগুলি লিক করেছেন তিনি কি তার উপর অর্পিত দায়িত্বের অপব্যাবহার করেননি ? এখানে তিনি অপরাধীর প্রাইভেসী সুরক্ষা নিশ্চিত করেছেন?

আমরা সকলেই একমত যে নিঃসন্দেহে কাজটি জঘন্যতম একটি অপরাধ। কিন্তু যে পর্যন্ত আইন দ্বারা তা প্রমানিত না হবে সেই পর্যন্ত কাউকে অপরাধী চিহ্নিত করে দেয়াও কিন্তু এক ধরনের অপরাধ। অতি উৎসাহে একটি অপরাধকে প্রচার করতে গিয়ে তারা কি আরেকটি অপরাধ করেননি।

শুরুটা করেছিলাম, সব সংবাদ ই কোন না কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু সব ঘটনা-ই সংবাদ হয়ে পত্রিকায় স্থান পায়না। এই সামান্য কথাটি ভুলে গেলে সংবাদের গুরুত্ব কমে যায়।

তাই সব ঘটনাকেই গুরুত্ব দিয়ে পরিবেশন অতি উৎসাহী ছাড়া আর কিছুই নয়।

সব ঘটনা-ই ‘নিউজ’ হওয়া উচিত নয় ।।

rahmanmoni@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.