মজুরি বৈষম্যের অভিযোগ শ্রম বিক্রির হাটে

কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু: পদ্মা নদী ঘেঁষা মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার শিলই ইউনিয়নের দেওয়ানকান্দি গ্রাম। এই গ্রামের সড়কে ও ব্রিজের ওপর কয়েক শতাধিক নারী-পুরুষের জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য দূর থেকে দেখলে সবারই মনে হবে- কিছু একটা হয়েছে সেখানে। জানা গেল, দেওয়ানকান্দি গ্রামে কিছুই হয়নি, মানুষের ভিড় থাকা স্থানে দাঁড়িয়ে আছেন উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত নারী-পুরুষ শ্রমিকরা। তারা জীবিকার তাগিদে এ অঞ্চলে এসেছেন আলু তোলার কাজে।

প্রতিদিনের মতো সকালে শ্রম বিক্রির বেচাকেনার হাট বসেছে দেওয়ানকান্দি গ্রামের এই সড়কপথে। দেওয়ানকান্দি গ্রামের একাধিক কৃষকের সঙ্গে পুরুষ শ্রমিকরা চুক্তি অথবা দিনব্যাপী শ্রম বিক্রির পারিশ্রমিক নিয়ে দরকষাকষি করছেন। আবার শ্রম বিক্রির চুক্তি শেষে কৃষকের পেছনে সারিবদ্ধ হয়ে রোপণ করা আলু জমির দিকে চলে যাচ্ছেন। শ্রমিকরা ১৫ থেকে ২০ জনের দলে বিভক্ত হয়ে আলু তোলার কাজে যুক্তদের মধ্যে নারী শ্রমিকও রয়েছেন।

পদ্মা নদী ঘেঁষা এই গ্রামের মতো মুন্সীগঞ্জ জেলার ৬৮টি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ও হাটবাজারে রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারী, কুড়িগ্রামসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে লক্ষাধিক পুরুষ ও নারী শ্রমিকের শ্রম বিক্রির বেচাকেনার হাট বসে থাকে। চুক্তি এবং দিনপ্রতি পারিশ্রমিকে চুক্তিবদ্ধ হয়েই আলু তোলার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এসব শ্রমিক। জেলার কৃষককুল ও স্থানীয় শ্রমিক সঙ্কটের কারণে উত্তরাঞ্চলের এসব শ্রমিককে পেয়ে আলু তোলার কাজে তাদের সম্পৃক্ত করছেন। আর এসব শ্রমিকই আলু তোলা শেষে জমি থেকে হিমাগারে ও বাড়ির আঙিনায় পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছেন। জেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি এখন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত পুরুষ ও নারী শ্রমিকের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে। আর কৃষক ও শ্রমিকদের সঙ্গে বাড়ির গৃহিণী ও শিশুরাও জমিতে আলু তোলার আনন্দে উদ্বেলিত। তবে তাদের অভিযোগ, স্থানীয় শ্রমিকদের পারিশ্রমিক বেশি দিলেও তাদের দেওয়া হচ্ছে কম। অথচ তারা একই পরিশ্রম করছেন। নারী শ্রমিক কাজলী দাস বলেন, পুরুষ শ্রমিকদের মতো তারা একই পরিশ্রম করছেন। কিন্তু তাদের মজুরি দেওয়া হয় ৩০০ টাকা আর পুরুষ শ্রমিকদের ৪০০ টাকা। মজুরি বৈষম্যের বিষয়টি নিয়ে কাজলী দাস, রূপসী রানী দাসসহ অন্য নারী শ্রমিকরা মনের কষ্টের কথা তুলে ধরেন।

টঙ্গিবাড়ীর ধামারণ গ্রামের কৃষক কবির হাওলাদার জানান, তিনিও তার জমিতে রোপণ করা আলু তুলতে উত্তরাঞ্চলের শ্রমিক নিয়োগ করেছেন। স্থানীয়ভাবে শ্রমিকের সংখ্যা কম হওয়ায় বিভিন্ন জেলা থেকে আগত শ্রমিকদের আলু তোলার সময় প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে ১৫ থেকে ২০ জন দলভুক্ত হয়ে আলুর জেলা হিসেবে খ্যাত মুন্সীগঞ্জের বিস্তীর্ণ জমিতে আলু তোলার কাজে ভিড় জমিয়ে তুলেছেন।

জেলা কৃষি সম্প্র্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আল মামুন জানান, জেলায় ৭৮ হাজার কৃষক পরিবার রয়েছে। এসব পরিবারের প্রায় ৪ লাখ ৬৮ হাজার সদস্য কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। এ বছর জেলায় ৩৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমি আলু চাষ হয়েছে। গত বছর ৩৮ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছিল। আলু উৎপন্ন হয়েছিল ১৩ লাখ ৫১ হাজার ১২৯ টন। আর উৎপাদিত আলুর মধ্যে ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টন বীজ আলু হিসেবে জেলার ৬৮টি হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়। আর হিমাগারগুলোর ধারণক্ষমতা ৫ লাখ টন।

সমকাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.