শশ্মানে স্ত্রীর লাশ, দুই সন্তানের অপেক্ষায় বাবা

আমার ঘরে বাতি জ্বালানোর মতো কেউ রইল না। আমার সব শেষ হয়ে গেল। দুনিয়াতে আমার আর কিছু নাই। সোমবার (৫ এপ্রিল) সকাল ১০টার দিকে মুন্সিগঞ্জের কেন্দ্রীয় শশ্মান নতুনগাঁওয়ে স্ত্রীর লাশ পোড়াচ্ছেন আর এমন আহাজারি করছিলেন সাধন শাহা (৫০)।

শীতলক্ষ্যায় লঞ্চডুবিতে সারারাত অপেক্ষার পর ভোর সাড়ে ৩টার দিকে নিহত স্ত্রীর লাশ বুঝে পেলেও দুই সন্তানের এখনো খোঁজ মেলেনি। স্ত্রী সুনিতা শাহার (৪০) লাশ পোড়াচ্ছেন আর নিখোঁজ দুই সন্তানের খোঁজ নিচ্ছেন। সাধন সাহা সদর উপজেলার মালপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। স্ত্রী আর দুই ছেলে নিয়ে ছিল তার সংসার।

রোববার সকালে সাধন সাহার স্ত্রী সুনিতা শাহা দুই ছেলে বিকাশ সাহা (২২) ও আকাশ সাহাকে (১২) নিয়ে গিয়েছিলেন ঢাকা জাতীয় চক্ষু ইন্সটিটিউট হাসপাতালে। আকাশ সাহাকে ডাক্তার দেখানোর জন্য। ডাক্তার দেখিয়ে নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ ঘাট হয়ে মুন্সিগঞ্জ ফিরছিলেন তারা।

সাধন শাহা জানান, স্ত্রীর সঙ্গে মুঠোফোনে সন্ধ্যা ৬টার দিকে কথা হয়। সে সময় স্ত্রী জানায়, ডাক্তার দেখিয়ে লঞ্চে উঠেছে তারা। সন্ধ্যায় টিভিতে দেখি, নদীতে লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটেছে। তাদের নম্বরে কল দিলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। রাত সাড়ে ৩টার দিকে স্ত্রীর লাশ পেলেও দুই সন্তানের কোনো খোঁজ মেলেনি।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, নারায়ণগঞ্জ থেকে মুন্সিগঞ্জ রুটে যে লঞ্চগুলো চলে তা ট্রলারের চেয়েও ছোট। এই ছোট লঞ্চ একটু দুর্ঘটনায় পরলেই ডুবে যায়। তাই আমি প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করব এই ছোট লঞ্চ যাতে এই পথে আর না চলে। আমার মতো যেন আর কাউকে সর্বহারা হতে না হয়।

নিহত সুনিতা সাহার বড় বোন মনি সাহা শশ্মানের মাটিতে হাত-পা ছড়িয়ে বসে বিলাপ করছিলেন। বিলাপ করতে করতে বলেন, আমার বোনটা লঞ্চে উঠতে চাইত না। সব সময় বলত লঞ্চে উঠলে সেটা ডুবে যাবে। লঞ্চ ডুবে মারা যাবে। খুব ভয় পেত। লঞ্চের চড়লেও কখনো নিচে বসতে চাইত না। ছেলেদের আবদারে লঞ্চে করেই মুন্সিগঞ্জের দিকে আসছিল। আমার বোনের ভয়টিই ঠিক হলো। জীবিত আর ফেরত এলো না। আমরা আমার বোনের লাশটি পেয়েছি। আমার বোনের দুই ছেলেকে জীবিত না হোক অন্তত মৃত হলে একবার দেখতে চাই।

মুক্তারপুর নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ পরিদর্শক কবির হোসেন খান জানান, গতকাল রাতে পাঁচটি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এরপর আর কাউকে উদ্ধার করা যায়নি। লাশ উদ্ধারের কাজ বন্ধ আছে। তবে বিআইডব্লিউটিএর লোকজন দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চ উদ্ধারের চেষ্টা করছে।

এ সময় তিনি আক্ষেপ নিয়ে বলেন, এমন ছোট একটি লঞ্চ আমাদের দিলে আমরা সেটা ট্রলার ও চেইনের সাহায্যেই তুলতে পারতাম। নিহতের স্বজনদের আহাজারিতে কষ্ট হচ্ছে।

এদিকে দুর্ঘটনায় আক্ষেপ প্রকাশ করে নিহতের স্বজনরা জানান, সড়ক পথে মুন্সিগঞ্জ থেকে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। সরু রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়। নৌপথেও ভোগান্তির শেষ নেই। ভোগান্তির শেষ হয় জীবন দিয়ে। গত বছর লঞ্চ দুর্ঘটনায় মুন্সিগঞ্জের ৩০ জন মানুষ মারা গেল। এবারও এতো বড় একটি ঘটনা ঘটল।

ব.ম শামীম/ঢাকা পোষ্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.