পুরুষরা ঘরে, বাইরে কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন নারীরা

করোনার সংক্রমণ রোধে সরকারি বিধি-নিষেধের ফলে ঘর থেকে বের হতে পারছেন না পুরুষরা। তাই সংসার চালাতে মরিচ বাছাই ও শুকানোর কাজ করছেন রাহেলা, লুৎফা, ফেরদৌসি, রুনা ও মর্জিনার মতো সংগ্রামী নারীরা।

শুক্রবার (২৩ এপ্রিল) সকালে মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার পূর্বরাখি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, প্রখর রোদ থেকে বাঁচতে মাথার ওপর ছাতা রেখে মরিচ শুকানো ও বাছাইয়ের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন নারীরা। বাজারে ভালো মরিচের দাম বরাবরই বেশি থাকে। তাই ভালো দাম পাওয়ার আসায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা মরিচ শুকানোর পাশাপাশি ভালো ও খারাপ মরিচ আলাদা করে বিক্রি করেন। এতে মরিচের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

কথা হয় রাহেলা বেগমের (৪০) সঙ্গে। তিনি জানান, ঢাকায় বাসের হেলপারের কাজ করতেন তার ছেলে রুবেল। লকডাউনের কারণে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। তাই গ্রামের বাড়িতে চলে এসেছে ছেলে। সংসারে রোজগার করার মতো উপযুক্ত আর কেউ নেই। তাই সংসারের হাল ধরতে মরিচ বাছাইয়ের কাজ করতে এসেছেন তিনি।

লকডাউনে পুরুষরা বাইরে কাজ করতে না পারায় নারীরা মরিচ বেছে সংসার চালাচ্ছেন

রাহেলা বেগম বলেন, তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে সংসার। স্বামী মারা গেছেন আরও পাঁচ-সাত বছর আগে। পরে আমার ছেলে ওর মামার সঙ্গে ঢাকায় বাসের হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করে। এতে কোনো রকম সংসার চলতে থাকে। কিন্তু সরকার আবার লকডাউন দিলে ছেলে বাসায় চলে আসে।

এতে করে দু-বেলা খাবার জোটানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। তাই খালার সঙ্গে মরিচ বাছাই করার কাজে আসছি। একবেলা কাজ করে ৩শ টাকার মতো পাই। তা দিয়ে এখন পাঁচজনের সংসার চলছে। গত বছর সরকারসহ বিভিন্ন মানুষ ত্রাণ দিলেও এ বছর ত্রাণের কোনো আলাই-বালাই নেই। এখন সব মরণ আমাদের মতো গরিবদের।

ত্রাণের কথা শুনে এগিয়ে আসেন লুৎফা বেগম, ফেরদৌসি, রুনা, মর্জিনাসহ অনন্যরা। একে একে তাদের সমস্যার কথা বলেন।

লুৎফা বেগম (৫০) বলেন, আমার স্বামী ভাড়ায় অটোরিকশা চালায়। লকডাউনের সময় গাড়ি নিয়ে সিপাহিপাড়া এলাকায় গেলে পুলিশ তার গাড়ি রেখে দেয়। দুই দিন পর মালিক গিয়ে অটো ছাড়িয়ে আনেন। এরপর থেকে তিনি আমার স্বামীরে গাড়ি চালাতে দেয়নি। বলছে লকডাউন শেষ হলে গাড়ি বের করতে দিবে। এখন বুড়া স্বামী অন্য কোনো কাজও করতে পারে না। তাই দু’বেলা খাওন জোগাড় করতে মরিচ বাছাই করতে আসছি।

তিনি আরও বলেন, রোদের মধ্যে মরিচ বাছাই করতে অনেক কষ্ট হয়। এ ছাড়া মরিচের ঝাঁজে নাক দিয়ে পানি পড়তে থাকে। তারপরও নগদ টাকা পেলে ভালোই লাগে।

মর্জিনা (৪৭) বলেন, মরিচের কাজ করলে হাত-পা জ্বালা করে। হাঁচি-কাঁশি তো আছেই। তারপরও এই কাজ করতে হয়। এ ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। লকডাউনে কৃষি কাজ ছাড়া অন্যসব কাজ বন্ধ রয়েছে। ১৫ দিন ধরে বাছাই করার কাজ করছি। প্রথম দিকে আরও কষ্ট হতো। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, লকডাউনের কারণে ছেলে-স্বামী বাসায় বসে আছেন। ছেলে ঢাকায় মার্কেটে মানুষের দোকানে কাজ করতো। আর স্বামী মাওয়া ঘাটে হেঁটে হেঁটে পানি বিক্রি করতো। সবকিছু বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে আমরা সবাই বোনের বাসায় চলে আসি। বোনের সঙ্গে মরিচ বাছাই করার কাজ করছি।

পাশে বসে মরিচ বাছাই ও শুকানোর কাজের তদারকি করছেন ব্যবসায়ী ওমর ফারুক। তিনি বলেন, মরিচ বাছাই ও শুকানোর কাজটি সাধারণত নারীদের দিয়েই করানো হয়। পুরুষরা এ কাজ করলেও নারীদের মতো নিখুঁত হয় না। খেত থেকে মরিচ উঠানোর কাজটাও পুরুষের পাশাপাশি নারীদের সিংহভাগ অংশই করে থাকেন। একইভাবে মরিচ শুকানো ও বাছাইয়ের কাজটিও নারীরাই করে থাকেন।

ব.ম শামীম/ঢাকা পোষ্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.