দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী জাপানী এক বস-এর গল্প

রাহমান মনি: কর্মক্ষেত্রে বস খুব বড় একটি বিষয়। অফিসের বস ও অধস্তনদের মধ্যে সম্পর্ক ভাল হলে তবেই কাজের সেরাটুকু পায় সংস্থা। এ কথা যেমন সত্যি, তেমনই কর্মক্ষেত্রে বসের সঙ্গে তেমন ভাল বোঝাপড়া না থাকলে কাজের পরিস্থিতি খুব জটিল হয়ে ওঠে। চাকরি জীবনের এই চাপ ধেয়ে আসে ব্যক্তিগত জীবনেও।

জাপানে এসেছিলাম তিন যুগ আগেই। বলা যেতে পারে অনেকটা অপ্রাপ্ত বয়সে। কৈশোর, যৌবন পেড়িয়ে এখন প্রৌঢ়ের পথে।

জাপান আসার কিছুদিনের মধ্যে শুধু প্রাপ্ত বয়স্ক-ই হইনি, সেই সাথে বাস্তব অভিজ্ঞতার ভারে অনেকটাই পরিপূর্ণ। অভিজ্ঞতা অর্জন করেই চলেছি অবিরত।

বিশেষ করে একটা কর্মক্ষেত্র-এর সন্ধান করতে কতো বিচিত্র অভিজ্ঞতার সঞ্চার-ই না হয়েছে এ জীবনে।

সে সময় একটি কাজের জন্য সন্ধানদাতাকে উপঢৌকন দিতে হ’তো নগদ অর্থে। কিন্তু সেই অর্থ দেয়ার মতো আমার সামর্থ্যে ছিলনা। তাই, প্রতিদিন পারিশ্রমিক পরিশোধে কাজ করে কিছু অর্থ সঞ্চয় করে সেই অর্থে একটি কাজ নিই জাপানের প্রতিষ্ঠিত একটি চেইন রেস্টুরেন্ট-এ ঘন্টা হিসেবে পারিশ্রমিক মাস শেষে পরিশোধ এর ভিত্তিতে যাকে আমাদের ভাষায় খন্ডকালীন চাকুরী বলা যেতে পারে। রিযিকদাতা মহান আল্লাহ্‌তায়ালার অশেষ রহমতে যা আজ বহাল রয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ্‌।

দীর্ঘ এই তিন যুগে আমি অন্তত ২৫ জন বস পেয়েছি ব্রাঞ্চ ম্যানেজার হিসেবে। জাপানী ভাষায় যাকে তেনচোউ বলা হয়। এখানে তেন অর্থ ব্রাঞ্চ, আর চোউ অর্থ প্রধান অর্থাৎ ব্রাঞ্চ প্রধান। তবে, তেনচোউ শব্দের বিভিন্ন অর্থ রয়েছে।

আর এই সমস্ত বসদের মধ্যে ভালো মন্দের সংমিশ্রণ অবশ্যই ছিল। কারন, ভালো মন্দ মিলিয়েই একজন মানুষ। জাপানীরাও তার ঊর্ধ্বে নয়। তবে, একজন পুরাতন কর্মী হিসেবে সবাই খুব সমীহ করতেন। করেন।

এর অন্যতম কারন হচ্ছে এইসব ম্যানেজারদের অনেককেই হাত ধরে কাজ শিখিয়েছি।আর জাপানে যাদের কাছ থেকে শিখা হয় তাদের সন্মান দিয়ে থাকে।

আমি প্রথমে যে ব্রাঞ্চে কাজ করতাম সেই ব্রাঞ্চটি ছিল আমাদের কোম্পানির প্রথম সারির একটি এবং অনেকটা ট্রেনিং সেন্টার। পার্মানেন্ট এমপ্লোয়িদের প্রথমে এখানে পাঠানো হ’তো।এখানে কাজ শিখানোর পর ব্রাঞ্চ পরিচালনার উপযোগী করে অন্য ব্রাঞ্চ-এ বদলী করে পাঠানো হ’তো।আর আমি ছিলাম সেই প্রশিক্ষক।

আমায় নিয়োগ দানকারী কোম্পানির নাম ‘টেন এল্যাইড কোম্পানি লিমিটেড’ হলেও জাপানের সর্বমহলে “টেনগু” নামেই সমধিক পরিচিত। জাপানের প্রথমসারির

কমদামী এবং ব্যস্ততম একটি রেস্টুরেন্ট। জাপানব্যাপি ৩০৭ টি ব্রাঞ্চ ছিল এক সময়। ১৯৯১ সালে প্রথম শ্রেনীর মর্যাদায় টোকিওর শেয়ার মার্কেটে স্থান করে নেয়।

একটা সময় ছিল(১৯৮৭ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত)যে সমস্ত প্রবাসী বাংলাদেশীরা ভাষা না জানার কারনে চাকুরী পেতে সমস্যায় ভুগতেন তাদের নিশ্চিত কর্মসংস্থানের ভরসা ছিল এই টেনগু। এই আমার মাধ্যমে মোট ১৯৬ জন প্রবাসীর কর্মসংস্থানের সুযোগ ঘটেছে এই কোম্পানিতে। তাই, একসময় আমার নামের আগে টেনগু বিশেষণটি জুড়ে যায়। টোকিওতে আমি পরিচিতি পাই টেনগুর মনি হিসেবে। নিজে অর্থের বিনিময়ে চাকুরী নিলেও কারোর কাছ থেকে অর্থ নিয়ে চাকুরী দেই নি। এটাই আমার আত্মতৃপ্তি বলা যেতে পারে।

২০১৯ সালে আমাদের ব্রাঞ্চ-এ নতুন ম্যানেজার হিসেবে বদলী হয়ে আসেন ‘উএমুরা নাওইয়া’ নামের ২ মিটার উচ্চতা সম্পন্ন সুঠাম দেহের অধিকারী এক টগবগে যুবক। তাকে দেখে একসাথে কাজ করার কথা ভেবে যে কোন কর্মচারীর-ই পিলে চমকে যাওয়ার কথা।

তিনি এসে প্রথম কয়েকদিন কাজ করার পাশাপাশি প্রতিটি সহকর্মীর সাথে পৃথক পৃথক সভা করে সকলের পারিবারিক/ব্যক্তি জীবন যাপন নিয়ে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেন। পরে জানা যায়, ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক জীবনের সবকিছুই কর্মক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে এটা তার বিশ্বাস। তাই, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে সহকর্মীদের সব তথ্যই তার নখদর্পণে রাখাটাও নিজ দায়িত্বের একটি অংশ।

আমার বর্তমান কর্মস্থল (টেনগু আওয়াজিচো শাখা ) ব্রাঞ্চটি ছোট হলেও কর্মচারীরা বিভিন্ন দেশের ( বাংলাদেশ, নেপাল, ভিয়েতনাম, চীন, জাপান, মিয়ানমার ) হওয়ায় আড়ালে আবডালে আমরা নাম দিয়েছিলাম টেনগু আন্তর্জাতিক শাখা। এখানে আমি মুসলিম, নেপালী শর্মীলা এবং অভি হিন্দু, জাপানী এবং ভিয়েতনামীদের সবাই বৌদ্ধিস্ট এবং চীনা ভাইটি খ্রিস্টান। তার মানে প্রধান প্রধান চারটি ধর্মের সবাই এখানে কর্মরত।

ম্যানেজার উএমুরা নাওইয়া আন্তর্জালের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ইসলাম এবং হিন্দু ধর্ম সম্পর্কের রীতিনীতি বিশেষ করে খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে অনেকটাই রপ্ত করে ফেলেছেন। এই দুইটা ধর্ম সম্পর্কে তার ধারণা ছিলনা বললেই চলে এবং এই ধর্মালম্বীদের সাথে একসাথে কাজ করাও হয়নি। তাই, ইন্টারনেট ঘেটে কিছুটা জানা। সহকর্মীদের সবকিছুই জানা থাকলে কাজে সুবিধা আদায় করতে পারা যায় বলে তার বিশ্বাস। বৌদ্ধ এবং খৃস্টান ধর্ম তিনি আগে থেকেই জানেন।

দোকানে নতুন কোন ম্যানু আসলে ধর্মীয় বিধি নিষেধ আছে কিনা যাবতীয় জেনে তারপর সবাইকে অবহিত করেন। এপর্যন্ত কোন ম্যানেজার-ই তা করেন নি। বিশেষ করে আমাকে তিনি অবহিত করেন। কারন ইসলাম ধর্মের হালাল হারাম সম্পর্কে কড়াকড়ির কথা ভালই জেনেছেন এবং মানছেনও আমার বেলায়।

জাপানী সংস্কৃতির একটি অংশ হচ্ছে বিভিন্ন উছিলায় দলগত পানাহার করা। বছর শেষ, নববর্ষ, আগমনী কিংবা সমাপনী, যোগদান কিংবা প্রস্থান সব কিছুতেই দলগত পানাহার দিয়ে শুরু আবার পানাহার দিয়েই শেষ।

আমাদের নিয়ে ম্যানেজার সাহেব পড়েছেন মহা বিপদে। সবাইকে নিয়ে পানাহার করতে যাওয়াটা সম্ভব হয় না। কারন, আমি ধর্মীয় অনুশাসন সম্পূর্ণ মেনে চলি । শর্মিলা গরুর মাংস খান না। ভিয়েতনামীরা কাঁচা (র) কিছু খায় না। চায়নীজ, সে আবার পিঁয়াজ সংশ্লিষ্ট কিছু খায় না। ম্যানেজার নিজে ফল জাতীয় কিছু খান না। আর সব মিলিয়ে যুতসই স্থান পাওয়া যায় না। বেচারা ইন্টারনেট তন্ন তন্ন করে খুঁজেন কিন্তু পানশালা আর মিলে না।

করোনার ছোবল প্রায় প্রতিটি সেক্টরেই কমবেশি প্রভাব পড়েছে। তন্মধ্যে রেস্টুরেন্ট প্রধান প্রধান ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে অন্যতম একটি।

আমাদের কোম্পানির ৯টি ব্রাঞ্চ একই দিনে সাটডাউন করতে হয় করোনার কারনে। সব মিলিয়ে ২২ টি দোকান।

১৫ জানুয়ারি ’২১ যে ৯ টি দোকান বন্ধ হয়ে যায়। তার মধ্যে আমি যে ব্রাঞ্চ-এ কাজ করতাম সে ব্রাঞ্চও তালিকায় পড়ে যায়। একমাস আগে ঘোষণা দেয়া হয়। একই সাথে কর্মচারীদের সুবিধা অনুযায়ী বিভিন্ন ব্রাঞ্চ-এ বদলী করে ছাঁটাই না করার ঘোষণা দেয়। আর যদি কেহ স্বেচ্ছায় কাজ ছেড়ে দিতে চায় সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় এবং প্রাপ্ত সব ধরনের সুযোগ সুবিধা পরিশোধ করার কথা জানান দিয়ে ম্যানেজার উএমুরা সবাইকে আশ্বস্ত করেন।

১৬ জানুয়ারি গুছগাছের দিন কর্মচারীদেরকে পূর্বঘোষিত প্যাকেট লাঞ্চ-এ সবাইকে আপ্যায়ন করাতে বেচারা ধরা খেলেন আমার বেলায়। সবার জন্য যার যার চাহিদা মোতাবেক প্যাকেট লাঞ্চ পাওয়া গেলেও আমার জন্য হালাল খাবারের প্যাকেট লাঞ্চ ( যদিও আমি কোন চাহিদা জানাই নি) না পেয়ে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরেছেন প্রায় দেড় ঘন্টা। শেষমেশ ফোন করে জানতে চাইলেন আমি এখন কি করতে পারি ?

আমি বললাম, আমি আপনাকে আগেও অনুরোধ করিনি আর এখনো বারণ করছি। আমার জন্য পেরেশান হওয়ার কিছুই নেই। আমার জন্য দুইটি অনিগিরি (রাইসবল) কিনে আনলেই হবে।

অনিগিরি কিনতে গিয়ে ম্যানেজার বেচারা পড়লেন আরেক ঝামেলায়। হারাম হালাল নিয়ে তিনি যা জেনেছিলেন সেখানে অনিগিরিতে ব্যবহৃত নোরি (জাপানি বিভিন্ন খাবার সামগ্রীতে ব্যবহৃত সামুদ্রিক শেওলা দিয়ে তৈরি এক ধরনের উপকরণ)’র মধ্যে হারাম হালাল সম্পরকে কিছু ছিল না। তাই এর মধ্যে এর ব্যাপার সেপার আছে কিনা তা জানতে আবার ফোন দিলেন।

এই হ’লো একজন ম্যানেজার, কর্মক্ষেত্রের রকজন বস এবং কর্মচারীদের একজন অভিভাবক যার নাম উএমুরা নাওইয়া। যিনি নিজেও অন্য ব্রাঞ্চের দায়িত্ব নিয়েছেন এবং পুরাতন কর্মক্ষেত্রের সবার খোঁজ এখনো নিয়ে চলেছেন।

কর্মক্ষেত্রে আমরাও আমাদের সর্বোচ্চটি দেয়ার চেষ্টা করেছি।

rahmanmoni@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.