পটচিত্রের শম্ভু আচার্য

১৯৭৭ সালের ঘটনা। সেবার কারুশিল্পবিশারদ তোফায়েল আহমেদ কলকাতার আশুতোষ জাদুঘরে গিয়ে দেখেন, একটি পটচিত্রের পাশে লেখা ‘উভয় বঙ্গের একমাত্র গাজীর পট’। তোফায়েল আহমেদ নিজেই অবাক-বাংলাদেশে কোনো পটচিত্রী আছে, সেটা জানা ছিল না তার। দেশে ফিরে তোফায়েল আহমেদ খোঁজখবর নিলেন। নরসিংদী গিয়ে জানলেন, সেখানে গায়েন দুর্জন আলীর কাছে গাজীর পট আছে। দুর্জন আলী জানালেন, এটি মুন্সীগঞ্জের সুধীর আচার্যের কাছ থেকে কেনা। সুধীর আচার্য হলেন শম্ভু আচার্যের বাবা। সেই থেকে আচার্য পরিবারের পটচিত্রের গৌরবের প্রচার শুরু।

এই লোকচিত্র প্রাচীন বাংলার অন্যতম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। প্রাচীনকালে যখন কোনো রীতিসিদ্ধ শিল্পকলার অস্তিত্ব ছিল না তখন এই পটশিল্পই বাংলার শিল্পকলার ঐতিহ্যের বাহক ছিল। পটচিত্র পটে আঁকা বিভিন্ন চিত্র। প্রাচীন বাংলায় যখন কোন দরবারি শিল্পের ধারা গড়ে ওঠেনি তখন পটচিত্রই ছিল বাংলার গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারক। বাংলাদেশে দুই রকমের পটচিত্র প্রচলিত আছে-এককচিত্র বা চৌকাপট এবং বহুচিত্র বা দীর্ঘপট। কালীঘাটের পট প্রথম শ্রেণিভুক্ত। কলকাতা নগরী প্রতিষ্ঠার পর আঠারো-উনিশ শতকে শহরকেন্দ্রিক এ চিত্রশিল্পের বিকাশ ঘটে। পাশ্চাত্যের আদর্শে আধুনিক চিত্ররীতি প্রবর্তিত হলে কালীঘাটের পট লোপ পায়। আর এ চিত্র যারা আঁকেন তাদের বলা হয় পটুয়া। কলকাতায় লোপ পেলেও বাংলাদেশে বংশপরম্পরায় পটচিত্র আঁকছেন নবম উত্তরপ্রজন্ম পটুয়া শম্ভু আচার্য।

তাঁর বাবা আঁকতেন গামছায়। শম্ভু আঁকেন মোটা ক্যানভাসে। ইটের গুঁড়া ও চক পাউডারের সঙ্গে তেতুঁল বিচির আঠা মিশিয়ে তৈরি করা হয় মিশ্রণ। আঞ্চলিক ভাষায় একে বলে ‘ডলি’। এই ডলি দিয়ে পুরো মার্কিন কাপড়ে লেপে দিয়ে তৈরি হয় ‘লেয়ার’ বা ‘পরত’। তার ওপরে রেখার টান, নানা রঙের প্রয়োগ। রংগুলিও তৈরি হয় দেশিয় পদ্ধতিতে। ডিমের কুসুম, সাগুদানা, গাছের কষ, বেলের কষ, এলা মাটি, গুপি মাটি, রাজা নীল, লাল সিদুঁর, মশালের ধোঁয়া (শিশুদের চোখের কাজল) এসব দিয়ে তৈরি হয় রং। আর তুলি বানানো হয় ছাগলের লোম দিয়ে। সেসব রং রেখা তিনি লোকায়ত জীবনের গল্প বলেন। তুলে আনেন পৌরাণিক কাহিনী।

ধলেশ্বরী নদীর ধারে মুন্সীগঞ্জের কালিন্দীপাড়ায় শম্ভু আচার্য্যের নয় পুরুষের বাস। শতবর্ষী তমাল গাছের ছায়ায় এ বাড়িতেই গত নয় পুরুষ ধরে ছবি আঁকছেন তারা। শম্ভু আচার্য্য বললেন, আমাদের পূর্বপুরুষরা পটে চিত্র আঁকতেন। পরে এটা গামছায় ও ক্যানভাসে আঁকা শুরু করেন তারা। সেই জন্যই এর নাম পটচিত্র।

শম্ভু আচার্য্যের বাবা সুধীর আচার্য্য ১৯৮৯ সালে জাতীয় কারুশিল্পী পরিষদের ‘শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন’ পুরস্কার লাভ করেছিলেন। কিন্তু তা দেখে যাবার সৌভাগ্য তাঁর হয়নি। যেদিন এই পুরস্কারের চিঠি এসে পৌঁছায় সেদিনই তার মৃত্যু হয়। এই শম্ভু আচার্য্যরা নয় পুরুষ ধরে পটচিত্র আঁকছেন। এরা হলেন- রামলোচন আচার্য্য, রামগোপাল আচার্য্য, রামসুন্দর আচার্য্য, জগবন্ধু আচার্য্য, রাসমোহন আচার্য্য, প্রাণকৃষ্ণ আচার্য্য, সুধীর আচার্য্য ও তার ছেলে শম্ভু আচার্য্য। শম্ভু আচার্য্যের পড়াশোনা বেশিদূর না এগুলেও ছবি আঁকার গুণ তার রক্তে প্রবাহিত। ছবি আঁকার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না নিলেও ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকছেন। আর বর্তমানে শম্ভু আচার্য্য একজন স্বনামধন্য পটচিত্রকরে পরিণত হয়েছেন। তার পটচিত্র স্থান পেয়েছে ব্রিটিশ মিউজিয়াম, চীনের কুবিং মিউজিয়াম, সাংহাই মিউজিয়াম, জাপানের অঅনাগাওয়া ও ফকুকুয়া মিউজিয়াম, ইন্দোনেশিয়া মিউজিয়ামে, লন্ডন ভিক্টোরিয়া আলবার্ট মিউজিয়ামে। এছাড়াও ১৭৫৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত এই সময়ের ইতিহাস নিয়ে “মহাপুরুষের অন্তর্ধান সহী শহীদ মুজিবনামা” শিরোনামে ২৪ খন্ড ড.এনামুল হক সাহেবের গীতিকাব্যের চিত্ররূপ দিয়েছেন শম্ভু আচার্য্য ।

শম্ভু আচার্য মূলত ঐতিহ্যবাহী পটচিত্রধারার চিত্রকে নতুন আঙ্গিকে ফুটিয়ে তুলেছেন। যেখানে বিলুপ্তপ্রায় লোকচিত্রধারা উপস্থাপিত হয়েছে নতুনভাবে। তাঁর ক্যানভাসে এখন উঠে এসেছে সমসাময়িক গ্রামীণ ও নাগরিক জীবন। ফুল, পাখি, জেলে, কামার, কুমার, তাঁতির সরল জীবন যেমন উঠে এসেছে, তেমনি বারবার এসেছে রাসলীলা, মহররম পর্ব, ময়ূরপঙ্খি, কৃষ্ণের নৌকাবিলাস।

এই শিল্পধারাকে কি এভাবেই টিকে থাকবে নাকি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন? এ প্রসঙ্গে শিল্পী বললেন, ‘আমরা পারিবারিকভাবে এ ধারাকে টিকিয়ে রেখেছি। আমার মা কমলা বালা আচার্য ভালো আলপনা আঁকতেন।আমার তিন মেয়ে এক ছেলে। তারাও পটচিত্র আঁকছে। বেশ ভালোই আঁকছে তারা। আমার ছেলে অভিষেক আচার্য দশম পুরুষ। ও ভালো ছবি আকে।’

সালেহীন বাবু
বাংলাদেশের খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.