পিনাক-৬ ডুবির ৭ বছর : কী পরিবর্তন আসলো পদ্মায় লঞ্চ চলাচলে

গতকাল (৪ আগস্ট) আলোচিত পিনাক-৬ লঞ্চডুবির সাত বছর পার হয়েছে। ২০১৪ সালের এই দিনে ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরা ঢাকামুখী আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে কাওড়াকান্দি থেকে মুন্সিগঞ্জের মাওয়াঘাটে আসার সময় পদ্মার উত্তাল ঢেউয়ে মুহূর্তেই ডুবে যায় পিনাক-৬ লঞ্চটি। ওই লঞ্চডুবিতে শতাধিক যাত্রী জীবিত উদ্ধার হলেও নিখোঁজ থাকেন দেড় শতাধিক।

সরকারি হিসাবে, নিখোঁজ ১৩৬ জনের মধ্যে প্রাণ হারান ৪৭ যাত্রী। আর এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৬০ জন যাত্রী ও ডুবে যাওয়া লঞ্চটি।

দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বেপরোয়া নৌযান চলাচল, অতিরিক্ত যাত্রী বহন ও অবহেলাজনিত অভিযোগ তোলা হয়। এসব অভিযোগ এনে বিআইডব্লিউটিএর তৎকালীন পরিবহন পরিদর্শক জাহাঙ্গীর ভূঁইয়া বাদী হয়ে মামলা করেছিলেন। যা এখনো আদালতে বিচারাধীন।

এদিকে ওই লঞ্চডুবির পর গত সাত বছরে মাওয়া-কাওড়াকান্দি লঞ্চঘাট স্থানান্তরিত হয়ে বর্তমানে শিমুলিয়া-বাংলাবাজার ও শিমুলিয়া-মাঝিরকান্দি দুই নৌরুটে লঞ্চ চলাচল করছে। এরকম বড় একটি দুর্ঘটনার পর এখনো নৌরুটের লঞ্চগুলোতে অতিরিক্ত যাত্রী পারাপারের চিত্র হরহামেশা দেখা যায়। চলতি আগস্ট মাসের ১ তারিখও ধারণ ক্ষমতার অধিক যাত্রী নিয়ে বাংলাবাজার থেকে শিমুলিয়া ঘাটে আসলে চারটি লঞ্চকে ৫ হাজার টাকার করে মোট ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

তবে এখন লঞ্চ চলাচল ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু কারিগরি পরিবর্তন এসেছে বলে বিআইডব্লিউটিএ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এর মধ্যে লঞ্চের ফিটনেসের বিষয়ে জোড়ালো তদারকি, লঞ্চের আকৃতি বৃদ্ধি, কোনো লঞ্চ ডুবে গেলে তা শনাক্তের কৌশল, ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জনবল বৃদ্ধি করাসহ ছাদে যাত্রী নেয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিআইডাব্লিউটিএ সূত্র।

বিআইডব্লিউটিএর শিমুলিয়া নদী বন্দরের নৌনিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী পরিচালক মো. সাদাত হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, পিনাক-৬ ডুবির ঘটনার সময় তিন ঘাটে নৌনিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় একজন কর্মকর্তা ও একজন কর্মচারী ছিলেন। এতে তদারকিও কম ছিল। তবে বর্তমানে একজন সহকারী পরিচালক, দুই ঘাটে দুইজন ট্রাফিক ইন্সপেক্টর। তিন ঘাটে তিনজন ট্রাফিক সুপারভাইজার। দুই ঘাটে দুই জন সারেং, একজন অফিস সহায়ক নিয়োগ করা হয়েছে। জনবলে পরিপূর্ণতা আসছে। ঘাট ব্যবস্থাপনায়ও শৃঙ্খলা এসেছে।

তিনি বলেন, আগে লঞ্চ মালিকরা রেজিস্ট্রেশন, সার্ভে, টাইম-টেবিল এসব দিক থেকে একটু উদাসীন ছিল। জেলা পরিষদের মাধ্যমে ঘাট চলতো। আগে ২৪ ঘণ্টায় লঞ্চ চলত। প্রতিটি লঞ্চে তিন স্তর- নিচে, বিলাসে ও ছাদে যাত্রী নেয়া হতো। এখন রাত ৮টা পর্যন্ত চলাচল করে। ছাদে যাত্রী নেয়া বন্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি লঞ্চে ১১০ ফিটের একটি রশির সাথে লাইফ বয়া সংযুক্ত করা হয়েছে যাতে কোনো লঞ্চ দুর্ঘটনায় পড়লে বা ডুবে গেলে তার অবস্থান শনাক্ত করা যায়।

বিআইডাব্লিউটিএর এই কর্মকর্তা বলেন, দাফতরিকভাবে নিয়ন্ত্রণ অনেক বেড়েছে। আগে যে বিশৃঙ্খলা অবস্থা ছিল সেটি এখন আর নেই। আগের থেকে জনগণও সচেতন হয়েছে। নৌরুটে এখন এমএল ও এমভি লঞ্চ চলাচল করছে। তবে পিনাক-৬ ডুবির আগ পর্যন্ত নদীতে ৬৫ ফুটের নিচেও লঞ্চ চলাচল করতো, এখন চলাচলকারী সবগুলো লঞ্চ ৬৬ ফুটের ওপরে। নৌরুটে বর্তমানে ৮৮টি লঞ্চের অনুমোদন থাকলেও ৮৭টি লঞ্চ চলাচল করছে। প্রতিটি লঞ্চের ফিটনেস, রেজিস্ট্রেশন ও সার্ভে করা রয়েছে। ডুবে যাওয়া লঞ্চের স্থলে নতুন একটি লঞ্চ সংযুক্ত করা হয়েছে। তাই লঞ্চের সংখ্যা বাড়েনি। লঞ্চ মালিক সমিতি যদি মনে করে এ নৌরুটে লঞ্চ আরও বাড়ানো দরকার তারা বাড়াতে পারে। সেক্ষেত্রে বিআইডব্লিউটিসি থেকে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।

তিনি বলেন, প্রতি বছর ঈদ ও ঈদের পরবর্তী সময়ে কর্মস্থলে ফেরা মানুষের চাপ বাড়ে। আগে তেমন তদারকি না থাকলেও বর্তমানে বিআইডাব্লিউটিএর হেড অফিস থেকে টিম আসে।

এ বছর করোনাকালে স্বাস্থ্যবিধি মানার জন্য তৎপরতা ছিল। যতক্ষণ পর্যন্ত লঞ্চ চলাচল করেছে ততক্ষণ পর্যন্ত প্রশাসনিক তৎপরতা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতি থাকে। যা আগে ছিল না। মন্ত্রণালয় থেকে টিম থাকে, কোস্টগার্ড থাকে। ঈদের সময় আনসার বাহিনী থাকে, রোভার স্কাউটসও থাকে, সার্বিকভাবে অনেক পরিবর্তন এসেছে।

দুর্যোগকালীন ব্যবস্থাপনার বিষয়ে শাদাত হোসেন বলেন, জুলাই-আগস্ট এই দুই মাস পদ্মা নদী উত্তাল থাকে। এ সময় এখন আবহাওয়া খারাপ দেখলেই লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখা হয়, এ সময় বৃষ্টি হলে, ঝড়ো বাতাস কিংবা নদী উত্তাল থাকলে আবহাওয়া অধিদফতরের সঙ্গে যোগাযোগ করে লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখা হয়। যাতে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়। নদীতে চলাচলকারী এমভি ও এমএল লঞ্চগুলো এখন অনেক নিয়ম মেনে চলে। সেপ্টেম্বরে নদী শান্ত হয়ে যায়। তখন ভয় কম।

তিনি আরও বলেন, এছাড়া সার্বক্ষণিক তদারকি রয়েছে, আগে লঞ্চ মালিকদের উদাসীনতা থাকলেও এখন সার্ভের সময় শেষ হওয়ার আগেই তারা ফাইল জমা দিচ্ছে। যাত্রীদের অনেক সময় বাধ্যও করা হতো, ফোর্স করা হতো। কিন্তু এখন যাত্রীরা চাইলে একটি লঞ্চে না গিয়ে আরেকটি লঞ্চে যেতে পারে।

এদিকে, দুর্ঘটনার সাত বছর পরও দায়ীদের বিচার না হওয়ায় স্বজনহারা পরিবারগুলোর অপেক্ষার পালা শেষ হচ্ছে না। অতিরিক্ত যাত্রী বহন ও অবহেলাজনিত কারণে যাত্রীদের মৃত্যু ও নিখোঁজের ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি না হওয়ায় প্রিয়জন হারানোর বেদনা বেড়েছে বহুগুণ।

মুন্সিগঞ্জ আদালতের সরকারী কৌঁসুলি (পিপি) আবদুল মতিন জাগো নিউজকে জানান, পিনাক-৬ লঞ্চ ডুবির ঘটনায় পাঁচ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। মামলা এখনো আদালতে বিচারাধীন। এর মধ্যে মূল আসামি কালু মিয়া মারা গেছেন। অপর চার আসামি জামিনে আছেন।

আরাফাত রায়হান সাকিব/জাগো নিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.