জাপানীজ ভালোবাসার সাতকাহন

রাহমান মনি: দীর্ঘদিন যাবত জাপানে বসবাস করার সুবাদে জাপানীজ সংস্কৃতির যে সব অভিজ্ঞতার সঞ্চয় হয়েছে তার মধ্যে স্বচক্ষে দেখা জাপানীজ তরুণ তরুণীদের ভালোবাসা অন্যতম ।

মানুষের চাহিদাকে অর্থনীতির ভাষায় যেমন কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়, তেমনি ভালোবাসার চাহিদায় জাপানীজদের ভালবাসাকেও কয়েক ভাগে ভাগ করা যায় ।

না, এ ভালোবাসা সন্তান সন্ততির বা পিতামাতার, একে অন্যের প্রতি ভালোবাসা নয় । এ ভালোবাসা কপোত কপোতির ভালোবাসা বা প্রেমিক প্রেমিকার জৈবিক চাহিদা ।

যদিও আমার এই লিখায় পুরো জাপানীজ সমাজকে বুঝায় না, তারপরও দীর্ঘ তিন যুগ জাপানে থাকার নিজ অভিজ্ঞতা থেকে যা দেখেছি এবং যা শুনেছি তারই পর্যালোচনার অভিজ্ঞতা থেকে আজ জাপানী কপোত কপোতীর কয়েক ধরনের ভালোবাসার কথা জানান দিতে এই প্রয়াস।

প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি কোন জাতি , ধর্ম বা লিঙ্গ কে ছোট করার অভিলাষ থেকে নয় নিজ অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে কিছু জানান দেয়া আর কি !

পোষ্য ভালোবাসা : – এই ভালোবাসার পাত্রকে তুলনা করে হয় কোন পোষা প্রাণীর সাথে। এই ভালোবাসায় কোন কলগার্ল বা যৌনকর্মী তুলনামূলকভাবে তারচেয়েও কম বয়সের (বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই) পুরুষকে ভালোবেসে নিজের অধীন করে রাখে । ছেলের সম্পূর্ণ হাতখরচ, থাকা খাওয়া ভালোবাসার পাত্রীটি করে থাকে ।

এইক্ষেত্রে পুরুষটির কাজ হচ্ছে ঘর দুয়ার পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা, আহার সরবরাহ করা, পোশাক পরিচ্ছদ গুছিয়ে রাখা এবং ক্ষেত্রবিশেষ তার হাত-পা ম্যাসেজ করে দেয়া। এদের অবসর সময় কাটে ভিডিওতে অশ্লীল ছবি দেখে, ধূমপান এবং সরাব পান করে । এছাড়া আর কিছুই যে তাদের করার থাকে না ।

মেয়েটি তার দেহ ব্যবসা করে যে পরিমান আয় করে তাতে বেশ স্বচ্ছল্ভাবেই তাদের উভয়ের চলে যায় । কোন কোন ক্ষেত্রে আবার অধিক বয়স কিংবা মধ্য বয়সের পুরুষরা আয়ত্বে রেখে অল্প বয়স্ক মেয়েদের দিয়ে দেহ ব্যবসা করায়ে নিজেরা সাচ্ছন্দ (!) জীবন যাপন করেন । জাপানী ভাষায় এদেরকে ‘হিমো’ বলা হয়ে থাকে । আমাদের গ্রামাঞ্চলে যাকে দড়ি বা লেজ বলা যেতে পারে । অর্থাৎ মেয়েটির সাথে রশির সম্পর্ক । এই ক্ষেত্রে জাপানি ইয়াকুজারা (এক ধরনের মাফিয়া) জড়িত থাকেন বেশী ।

ব্যবসায়িক ভালোবাসা : – এই ধরণের ভালোবাসায় সাধারনত মায়েরাই লাভবান হয়ে থাকে বেশী । একই সাথে কয়েকটি পুরুষের সাথে সম্পর্ক করে থাকে মেয়েটি । সাধারনত নিজ থেকে বেশী বয়সের পুরুষের সাথেই সম্পর্ক গড়ে তোলা হয় ।

বিশেষ বিশেষ দিবসে মেয়েটি ভালোবাসার সম্পর্ক গড়া সবার কাছে ব্র্যান্ডের একই জিনিস দাবী করে থাকে। অনেকেই ভালোবাসার পাত্রীর আবদার পুরন করে থাকে । একটি রেখে বাকী গুলো বিভিন্ন অজুহাতে রশিদ দেখিয়ে ফেরত দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেন । না হলে , কিছুটা ছাড় দিয়ে পুরাতন পন্য ক্রয় বিক্রয় কেন্দ্রে বিক্রয় করে দেন । রেখে দেয়া উপহারটি নিয়ে সবার সামনেই নিজেকে উপস্থাপন করেন। সবাই খুব খুশী থাকেন এই ভেবে যে, তার দেয়া উপহারটি প্রিয়জন খুব যত্ন সহকারে ব্যাবহার করছে । আর এইভাবে প্রতারিত হন অনেক পুরুষ ।

ক্ষনিকের ভালোবাসা : – এই ধরনের ভালোবাসার জন্ম হয় পাশাপাশি সহ অবস্থানের থেকে। সাধারনত সহকর্মী বা বসের সাথে এক সাথে কাজ করার সুবাদে উভয়ে উভয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়।

অফিস বিরতিকালীন সময়ে কিংবা অফিস ছুটির পর বাড়ী ফিরার আগে কিছুক্ষনের জন্য দু’জন দু’জনার হয়ে স্বল্প সময়ের জন্য খন্ডকালীন হোটেলে সময় কাটিয়ে যার যার গন্তব্যে যাওয়া । এই সময় কাটানোর জন্য রয়েছে বিভিন্ন ব্যবস্থা যা ‘লাভ হোটেল’ নামে পরিচিত । এই হোটেলগুলোর বিশেষত্ব হচ্ছে ২ ঘন্টার জন্য ভাড়া পাওয়া । বোনাস হিসেবে ‘কনডম’ ফ্রী পাওয়া । এছাড়াও গোসল ফ্রী স্টাইলে করা যায়। দৈহিক মিলনেই এই ভালোবাসার পরিসমাপ্তি ঘটে । স্থায়ী হয় না । খুব জোর মাঝে মধ্যে পুনরাবৃত্তি ।

অপরিচিত ভালোবাসা : – এই ধরনের ভালোবাসায় একে অন্যের পূর্ব পরিচিত নন । কেউ কাউকে চিনেন না, জানা নেই কিংবা ক্ষনিকের পরিচয়ে অবলীলায় একজন আরেকজনকে চলমান অবস্থায় প্রপোজ করে সময় দেয়ার জন্য । এ সময় দেয়া মানে একসাথে সময় কাটানো, কারাওকে, মদ পান থেকে হোটেল পর্যন্ত । অর্থাৎ দৈহিক মিলন । এখানেও সে লাভ হোটেল । কিছু কিছু ক্ষেত্রে একে অন্যের বাড়ী পর্যন্ত । কিন্তু ওই একবারই । হয়তো বাকী জীবনেও আর দেখা হবে না ।

আর এইজন্য শুধু টোকিওতেই রয়েছে একাধিক প্রসিদ্ধ স্থান । অনেকে আবার সেচ্ছায় সেখানে যায় শিকারের আশায় । জাপানি ভাষায় এটাকে বলা হয় ‘নামপা’।

শেয়ারে ভালোবাসা : – জাপানীরা সাধারণত ১৮ বছর পূর্ণ হলে একা অর্থাৎ পিতামাতা থেকে আলাদা থাকতে পছন্দ করে । পিতামাতার সাথে থাকলে ব্যক্তি স্বাধীনতায় ব্যাঘাত ঘটে । তাই প্রেমিকা বা প্রেমিককে নিয়ে যৌথ বসবাস শুরু করে । বাসা ভাড়া থেকে শুরু করে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, খাবার খরচ, সব কিছুতেই শেয়ার করতে হয় । প্রায় ক্ষেত্রেই শেয়ারের এই ভালোবাসা স্থায়ী হয় না । নতুন করে আবার ভিন্ন ভিন্ন শেয়ারের সংসার খুঁজে নেয়ার কাজে নেমে পড়ে ।

অর্থের বিনিময়ে ভালোবাসা : – পতিতালয়, ক্লাব বা যৌন বিষয়াদি সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানে একটি নিদিষ্ট বয়সের আগে গমনাগমন জাপান আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ । কিন্তু, ঐ সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করে বসে থেকে যৌবন ক্ষুদা অবহেলায় হারাবার মতো বোকা ক’জনা আছে বর্তমান সমাজে ! এছারাও ছেলে বন্ধুদের সাথে সাথে ডেটিং করার জন্যও তো বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হয় ।

তাই, স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন উপায়ে নিজ দেহের বিনিময়ে । তার মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত এবং সহজ উপায় হচ্ছে স্কুল ফাকি দিয়ে জুটি হয়ে ভালোবাসার গভীর সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়া। যথা সময়ে স্কুল ব্যাগ নিয়ে বাড়ী থেকে বের হয়ে মধ্য বয়সী কোন পুরুষের সাথে সময় কাটিয়ে নগদ অর্থ উপার্জন করে আবার যথা সময়ে বাড়ী ফিরে যাওয়া। এইজন্য অবশ্য কিছুটা মিথ্যার আশ্রয় যে নিতেই হয় । স্কুলে ফোন করে শারীরিক অসুস্থতার কথা জানাতে হয় , নইলে যে আবার স্কুল থেকে অভিভাবকদের কাছে ফোন যাবে । অভিভাবকদের কাছে ধরা খেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায় ।

মোবাইল ভালোবাসা : – জুনিয়র হাই স্কুল থেকে শুরু করে এমন কোন জাপানী মেয়ে পাওয়া যাবে না, যার কাছে মোবাইল ফোন পাওয়া যাবে না। কারো কারো রয়েছে আবার একাধিক মোবাইল । মোবাইল ভালোবাসায় টাকা উপার্জন হয়ে থাকে আন্তর্জাল ব্যবহারের মাধ্যমে।

এই পদ্ধতি ব্যবহার করে এখন বাংলাদেশের মেয়েরাও টাকা কামাচ্ছে । সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ম্যাসেঞ্জার , ইমু , হোয়াটঅ-আপ , লাইন কিংবা অন্যান্য মাধ্যম যেখানে নিজের লাইভ প্রদর্শন করা যায়।

এছাড়াও রাস্তাঘাটে , ট্রেনে , বাসে , উদ্দ্যোনে, স্টেশন গুলোতে কিংবা বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে কিছু কিছু কপোত-কপোতী এমনভাবে জড়িয়ে থাকে যে, দেখে মনে হবে স্বর্গীয় সুখ যেনো তাদের মধ্যেই নেমে এসেছে। অনেক সময় চুমো খাওয়া থেকে শুরু করে শরীরের স্পর্শকাতর অংগ গুলিতে স্পর্শ, সবার দৃষ্টিগোচরেই যেনো হয়ে থাকে।

এইসব ভালোবাসা নিয়ে জাপান সরকার এবং অভিভাবকগন যেমন উদ্বিগ্ন তেমনি সোচ্চার প্রচার মাধ্যমগুলোও । কিন্তু রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না যেন কিছুতেই । তার অন্যতম কারন , জাপানে ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষন এবং নাগরিক অধিকার আইন এবং তার প্রয়োগ । এছারা অভিভাবকরাও যে একসময় —।

এর সুযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমেরিকা কিংবা ইউরোপ থেকেও অনেকটাই এগিয়ে । হিন্দু ধর্মালম্বীর কেহ যদি গরুর মাংস কিংবা ইসলাম ধর্ম্যালম্বী কেহ যদি কচ্ছপ খাওয়া শুরু করে তাহলে তারা যেমন আসল ভক্ষণকারীদের চেয়েও বেশী গ্রহন করে থাকে । তেমনি জাপানি তরুন সমাজ ইউরোপ কিংবা আমেরিকার সংস্কৃতি গ্রহন করতে গিয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের চেয়েও এগিয়ে ।

আর এইক্ষেত্রে ইন্টারনেট এনে দিয়েছে নতুন বিপ্লব । নতুন নতুন এবং অভিনব পন্থা বের হচ্ছে প্রতিনিয়ত। যার ব্যবহার করছে জাপানী তরুন সমাজ ।

জাপানীদের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক পর্যন্ত গড়ানোর আগেই দৈহিক সম্পর্ক হয় । এইক্ষেত্রে ওদের মতবাদ হচ্ছ “ভালোবাসার মাধ্যমে যৌন সম্পর্কে গড়ানো নয় , যৌন সম্পর্ক থেকে ভালোবাসা জড়ানো”।

আগের শরীরের ভাজে ভাজে নাটবল্টু সম্পর্কে জানো তারপর ভালোবাসায় জড়াও । ভালোবাসা হবে অথচ দৈহিক মিলন হবেনা এটা যে কল্পনাতেও স্থান পায় না। তাই জাপানে একটি কথা প্রচলিত আছে যে, “ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া একটি জাপানি মেয়ে যতোগুলি লিঙ্গ নাড়াচাড়া করেছে , বাংলাদেশে ওই বয়সের একটি মেয়ে ততোগুলি তারখাম্বাও দেখেনি”। এখন অবশ্য অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়েছে।

অথচ, আমাদের দেশে বছরের পর বছর ভালোবাসার সম্পর্ক বজায় থাকলেও যৌন সম্পর্ক ত দূরের কথা চুমু খাওয়া পর্যন্ত হয়ে উঠে না। কেহ দেখে ফেলার যেমন ভয় রয়ে যায় তেমনি , ধর্মীয় বিধান তো রয়েছেই । বঙ্গ রমনীদের একটিই বুলি । তা হচ্ছে ‘আমি তো তোমারই’ বিয়ের আগে কিছুই নয়। সব বিয়ের পর হবে। যদিও বিয়ে গড়ানো পর্যন্ত সম্পর্ক খুব কমই টিকে থাকে ।

তাই বলে যে জাপানীদের মধ্যে সত্যিকারের প্রেম , ভালোবাসা নেই এমনটি নয়। অবশ্যই আছে । যুবা বয়সে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে একটু বয়স হলে স্থিতিশীলতা আসে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে।

বর্তমান জাপানী সমাজে কোন তরুণ তরুণী কিংবা যুবক যুবতী প্রথম থেকেই মাত্র একজন অন্যজনকে ভালোবেসে ঘর বেঁধেছে এবং দৈহিক সম্পর্ক গড়ে উঠেনি এমন দম্পতি থেকে থাকলে তাহলে তারা অবশ্যই জাপানি যাদুঘরে রাখা সহ গীনেচ বুক -এ স্থান পাবার দাবী রাখে।

আমি আগেই বলেছি, আমার এ লিখা কাউকে ছোট করার জন্য নয় । তারপরও যদি কেহ মনে এতোটুকুন কষ্ট পেয়ে থাকেন তাহলে করজোর ক্ষমা প্রার্থনা করে নিচ্ছি ।।

rahmanmoni@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.