শ্রেণিকক্ষে বৃষ্টির পানি: বৈখর অনির্বাণ বিদ্যালয়

প্রাথমিক বিদ্যালয়টির শৌচাগারও নেই। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা বসতে পারে না। এসব কারণে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অভিভাবকেরাও।

ভাঙা, জরাজীর্ণ চার কক্ষের টিনশেড ভবন। ঘরটির ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা গেল চারদিক গোল হয়ে ১২ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থী মেঝেতে বসে আছে। মাঝখানে বড় একটি বাটি পাতা। টিনের চাল ভেদ করে সে বাটিতে টপ টপ করে পড়ছে বৃষ্টির পানি। একজন শিক্ষক হেঁটে হেঁটে খেলার ছলে ওই শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাচ্ছেন।

এমন চিত্র মুন্সিগঞ্জ পৌর এলাকার বৈখর অনির্বাণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। বৈখর বাজারের সড়কের ওপর দাঁড়ালেই সড়কের পূর্ব পাশে ফটকবিহীন জরাজীর্ণ এ বিদ্যালয়টি চোখে পড়ে। এই বিদ্যালয়ের অবস্থা এতটাই খারাপ যে বৃষ্টি হলে সব কটি কক্ষের চাল বেয়ে পানি পড়ে। শিক্ষকদের ভাষ্য, তাঁদের বিদ্যালয়টি শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় হলেও এমন জরাজীর্ণ ও ভাঙাচোরা ঘর অজপাড়াগাঁয়ের বিদ্যালয়েও নেই।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে বৈখর অনির্বাণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির কার্যক্রম শুরু হয়। তখন এটির চালা টিনের ও বেড়া বাঁশের তৈরি ছিল। ২০১৩ সালে বিদ্যালয়টি সরকারি করা হয়। তখন বিদ্যালয়টির বাঁশের বেড়া সরিয়ে টিনের বেড়া এবং শেষে ইটের দেয়াল করা হয়। এই বিদ্যালয়ে ছয়টি শ্রেণির জন্য প্রধান শিক্ষকসহ সাতজন শিক্ষক প্রয়োজন। আছে মাত্র চারজন। প্রধান শিক্ষকের পদটিও শূন্য। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ১৭৩ জন শিক্ষার্থী আছে। ২০২১ সালে ২০১, ২০২০ সালে ১৮৭ জন শিক্ষার্থী ছিল।

শিক্ষার্থী কমার কারণ তুলে ধরে বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষক মৌতিষা ভট্টাচার্য বলেন, বৃষ্টি হলে বাচ্চারা ক্লাসে বসতে পারে না। এ জন্য সামান্য বৃষ্টি হলেই শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে আসে না। শিক্ষকেরা সবটুকু দিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ালেও বিদ্যালয়ের সামগ্রিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় বছর বছর ছাত্রছাত্রী কমে যাচ্ছে।

অবকাঠামো ভালো না হওয়ায় এ বিদ্যালয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অভিভাবকেরাও। শিশু শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক নাজির হোসেন বলেন, ‘বৃষ্টি হলেই ভাঙা টিনের চালা দিয়ে পানি পরে। শ্রেণিকক্ষে বাচ্চারা বসতে পারে না। বিদ্যালয়টির শৌচাগার নেই। শৌচাগারে যাওয়ার প্রয়োজন হলে বাধ্য হয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই মানুষের বাড়িতে যায়। শিক্ষকসংকটের কারণে ঠিকমতো ক্লাস হয় না। নানাবিধ সমস্যার মধ্যে রয়েছে বিদ্যালয়টি। আমার বাচ্চা ছোট, বাড়ির সামনে স্কুল। তাই এ বছর এই স্কুলে পড়তে দিয়েছে। আগামী বছর থেকে অন্য স্কুলে নিয়ে যাব।’

বিভিন্ন ভোগান্তির বিষয় তুলে ধরে কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, বৃষ্টি হলে ক্লাসে বসে ভিজতে হয়। ছোট কক্ষে বৃষ্টি না থাকলে এক বেঞ্চে তিন থেকে চারজন গাদাগাদি করে বসতে হয়। একটি পাকা ভবন না থাকায় রোদ, বৃষ্টি, ঝড় যা–ই হোক, কষ্ট করে এ বিদ্যালয়ে ক্লাস করতে হয়। দ্রুত একটি পাকা ভবনে করে দেওয়ার দাবি জানায় তারা।

নানা সমস্যার কথা তুল ধরে বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষক আলেয়া আক্তার বলেন, জং ধরে প্রতিটি কক্ষের চালের টিনগুলোতে অসংখ্য ছিদ্রের সৃষ্টি। বৃষ্টি হলে টিনের চালের ছিদ্র দিয়ে শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে। ভারী বৃষ্টিপাত হলে সম্পূর্ণ কক্ষই পানিতে ভরে যায়। প্রতিটি কক্ষের দরজা নড়বড়ে। শ্রেণিকক্ষে জানালা নেই। স্কুলে দামি কোনো কিছু রাখা যায় না। কিছুদিন পরপর ফ্যান, লাইট, ব্যানারসহ বিদ্যালয়ের মূল্যবান জিনিস চুরি হচ্ছে। ক্লাস চলার সময়ে বাইরের লোকজন বিদ্যালয়ের আশপাশে বসে মাদক সেবন করে। মাদকের গন্ধে ক্লাসে টেকা মুশকিল হয়ে যায়।

বিদ্যালয়ের এই অবস্থা অনেক বছরের জানিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আলী মোর্তজা প্রথম আলোকে বলেন, ‘নতুন একটি ভবনের জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, জেলা ও উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে গত তিন বছরে একাধিকবার কথা বলেছি। নতুন ভবন হওয়ার আশ্বাস দিলেও কাজ হয়নি। কয়েক দিন আগেও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা বলেছেন, আমাদের ভবনটি অগ্রাধিকার তালিকায় প্রথম দিকে রয়েছে। আমরা আশ্বাস চাই না। দ্রুত আমাদের বিদ্যালয়ের একটি পাকা ভবন করা হোক।’

বৈখর অনির্বাণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ উপজেলার ১০টি বিদ্যালয়ে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে তালিকা পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নাসিমা খানম। তিনি বলেন, একটি বিদ্যালয়ের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। দ্রুতই এ বিদ্যালয়ের ভবন, শৌচাগারসহ সব ধরনের কাজ শুরু হবে।

প্রথম আলো

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.