দেড় হাজার অতিরিক্ত শিক্ষক বসে বসে বেতন নিচ্ছেন

নোয়াখালীর কবিরহাট সরকারি কলেজের তিনটি বিভাগে কোনো শিক্ষক নেই। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইসলামের ইতিহাস ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ চলছে ভাড়ায় আনা খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে। অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান আখন্দ জানান, এ তিনটি বিভাগসহ রসায়ন বিভাগেও কোনো শিক্ষক ছিল না। তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) যোগাযোগ করে কিছুদিন আগে রসায়ন বিভাগে একজন শিক্ষক পেয়েছেন। শিক্ষক সংকটে কলেজে ক্লাস চালিয়ে নেওয়াই দায় হয়ে পড়েছে। মাউশির কলেজ শাখার সহকারী পরিচালক তাজিবউদ্দিন সমকালকে জানান, একজন শিক্ষকও নেই এমন বিভাগের সংখ্যা সারাদেশের সরকারি কলেজগুলোতে দেড়শ’র কম নয়।

এই যখন সারাদেশের চিত্র, তখন ঢাকার সরকারি কলেজগুলোর চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রতিটি কলেজ ‘অতিরিক্ত শিক্ষকে’ ঠাসা। পদ খালি না থাকার পরও তদবির করে শিক্ষকদের অনেকে ওএসডি অথবা সংযুক্তি আদেশ নিয়ে ঢাকায় থাকছেন। সরকারি কলেজগুলোর ১২ হাজারের মধ্যে দেড় হাজারের বেশি শিক্ষক এখন ঢাকায় বসে বসে বেতন নিচ্ছেন। সমকালের নিজস্ব অনুসন্ধানে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের কলেজগুলোর শিক্ষক পদায়নে ভারসাম্যহীনতার বিস্ময়কর চিত্র পাওয়া গেছে।

গত কয়েক দিনে রাজধানীর সরকারি কলেজগুলোতে ঘুরে দেখা গেছে, অতিরিক্ত শিক্ষকের ভারে ভারাক্রান্ত প্রতিটি কলেজ। বহু শিক্ষকের কোনো ক্লাস নেই। এমনকি সংশ্লিষ্ট বিভাগে ওই শিক্ষকদের বসারও জায়গা নেই। বছরের পর বছর ওএসডি হয়ে কেউ কেউ ঢাকায় বসবাস করছেন। ওএসডি থাকা ও সংযুক্ত শিক্ষকের প্রকৃত সংখ্যা কত, তা জানাতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কলেজ শাখাও। মাউশিতে যোগাযোগ করে জানা গেছে, ওএসডি শিক্ষকের সংখ্যা হাজারখানেক। তবে সমকালের অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এ মুহূর্তে ওএসডি ও সংযুক্তি আদেশ নিয়ে রাজধানীতে বসে বসে সরকারি বেতন গুনছেন এক হাজার ৫২৪ শিক্ষক।

বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের কর্মকর্তারা সরকারি কলেজগুলোতে কর্মরত আছেন। সারাদেশের ৩১১টি কলেজে শিক্ষকের পদ ১৪ হাজার ৬৩২। এর মধ্যে দুই হাজার ৭৫৫টি পদ শূন্য রয়েছে। সর্বশেষ গত বছরের ৭ আগস্ট ৩৩তম বিসিএসের মাধ্যমে প্রায় এক হাজার প্রভাষক নেওয়া হয়। এর পর শিক্ষক নিয়োগ হয়নি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, শিক্ষকদের তদবিরের চাপে তারা অতিষ্ঠ। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, পদস্থ আমলাসহ প্রভাবশালীদের চাপে বাধ্য হয়েই ‘অতিরিক্ত আছে’ জেনেও আরও শিক্ষককে ঢাকায় এনে বসিয়ে বসিয়ে বেতন-ভাতা দিচ্ছেন।

মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন সমকালকে বলেন, তিনি সব সময়ই সংযুক্তি দেওয়ার বিপক্ষে। ঢাকার অনেক অধ্যক্ষ এসে অভিযোগ করেন, প্রভাবশালীদের তদবিরে সংযুক্ত হয়ে আসা শিক্ষকরা তাদের কথা শুনতে চান না। এতে কলেজ পরিচালনায় তারা অসহায় হয়ে পড়েন। তবে ঢাকা কলেজ, ইডেন ও তিতুমীর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষরা জানান, তারা সংযুক্তিদের দিয়ে নিয়মিত ক্লাস নেওয়াচ্ছেন।

ওএসডি ও সংযুক্তির ভয়াবহ চিত্র :বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে মোট ওএসডি কর্মকর্তার সংখ্যা এখন এক হাজার ৫২৪। এদের মধ্যে মাউশিতে ওএসডি হয়ে বিভিন্ন সরকারি কলেজে সংযুক্ত রয়েছেন এক হাজার ৭১ জন। শিক্ষা প্রেষণে রয়েছেন আরও ৩৭৫ জন। কেবল ঢাকা মহানগরের কলেজগুলোতে ওএসডি হয়ে সংযুক্ত রয়েছেন ৪৬৫ জন।

রাজধানীতে ১৫টি সরকারি কলেজ, একটি সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা, একটি সরকারি কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউট ও একটি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রতিটিতে অতিরিক্ত শিক্ষকের ছড়াছড়ি। এর মধ্যে ওএসডি হয়ে ঢাকা কলেজে সংযুক্ত রয়েছেন ৫০ জন, ইডেন সরকারি মহিলা কলেজে ৬২, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে ২৯, কবি নজরুল সরকারি কলেজে ৩২, গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে ১২, তিতুমীর সরকারি কলেজে সর্বাধিক সংখ্যক ১৭৫, সরকারি বিজ্ঞান কলেজে ২৩, সরকারি সংগীত কলেজে ১, শহীদ সোহরাওয়ার্দী সরকারি কলেজে ২৯, সরকারি বাঙলা কলেজে ৫৬, হাজারীবাগ শেখ ফজিলাতুন্নেসা সরকারি মহাবিদ্যালয়ে ১৭, উত্তরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারি মহাবিদ্যালয়ে ১৭, ভাসানটেক সরকারি মহাবিদ্যালয়ে ২৩, ঢাকা উদ্যান সরকারি মহাবিদ্যালয়ে ২২, মাদ্রাসা-ই-আলিয়া ঢাকায় দু’জন, সরকারি কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউটে চারজন এবং টিচার্স ট্রেনিং কলেজে ১২ জন রয়েছেন। এই শিক্ষকদের সবাই পদের অতিরিক্ত হিসেবে এসব কলেজে সংযুক্ত হয়ে রয়েছেন। ঢাকার ১৮টি কলেজের মধ্যে শুধু আজিমপুর সরকারি গার্লস কলেজে কেউ সংযুক্ত নেই। এ কলেজ সম্প্রতি সরকারি হয়েছে।

মাউশির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) অধ্যাপক ওয়াহিদ উজ জামান স্বীকার করেন, ওএসডি হয়ে সংযুক্ত থাকা শিক্ষকের এই সংখ্যা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। মাউশি জানিয়েছে, বর্তমানে কোনো শিক্ষক ইনসিটো (নিম্ন পদে দায়িত্ব পালন) নেই। সবাইকে পদায়ন করা হয়েছে। কলেজ শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, হাজারজনের মতো শিক্ষক বছরের পর বছর ওএসডি হয়ে ঢাকায় থাকছেন।

নিজের কলেজে সর্বাধিক সংখ্যক শিক্ষক সংযুক্ত থাকার কথা জানিয়ে তিতুমীর কলেজের অধ্যক্ষ আবু হায়দার আহমেদ নাসির জানান, শুধু ক্লাস নয়, তিনি কলেজের সার্বিক কার্যক্রমে অতিরিক্ত শিক্ষকদের কাজে লাগাচ্ছেন। ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক তুহিন আফরোজা আলম বলেন, তিনিও সংযুক্ত শিক্ষকদের নিয়মিত ক্লাস নিতে দেন। এই অধ্যক্ষ অবশ্য দাবি করেন, তার কলেজে আরও শিক্ষক দরকার। ইডেন সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক হোসনে আরা জানান, সংযুক্ত শিক্ষকরা তার কলেজের সব কার্যক্রমে নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন। তবে তার কলেজে সংযুক্ত থাকা শিক্ষকের প্রকৃত সংখ্যা জানাতে পারেননি তিনি।

ঢাকার বাইরে অন্য চিত্র: রাজনৈতিক প্রভাব ও তদবিরের জোরে দেড় হাজারের বেশি শিক্ষক যখন বসে বসে বেতন নিচ্ছেন, তখন মফস্বলের কলেজগুলো তীব্র শিক্ষক-স্বল্পতায় ভুগছে। ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার কেএমএইচ সরকারি কলেজে বিভিন্ন বিষয়ে ১০ জন শিক্ষক নেই। অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবদুল লতিফ শিক্ষক চেয়ে মাউশিতে একের পর এক চিঠি লিখছেন। জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার এএইচজেড সরকারি কলেজে চারজন শিক্ষকের পদ শূন্য। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল এ পর্যন্ত দু’দফা চিঠি পাঠিয়েছেন মাউশিতে। সমকালের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যমতে, শিক্ষক-স্বল্পতায় আরও ভুগছে লক্ষ্মীপুর সরকারি মহিলা কলেজ (১৩ জন), কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার আমলা সরকারি কলেজ (৪), বরগুনা সরকারি মহিলা কলেজ (১২), রাঙামাটি সরকারি মহিলা কলেজ (৫), নীলফামারী সরকারি মহিলা কলেজ (৯), মুন্সীগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ (৬), রাজবাড়ী সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ (৩), খুলনা খালিশপুরে হাজী মুহম্মদ মুহসীন সরকারি কলেজ (২) ও বান্দরবান সরকারি মহিলা কলেজ (২)। এভাবে ঢাকার বাইরের প্রতিটি কলেজেই শিক্ষকশূন্যতা রয়েছে।

মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন সমকালকে বলেন, তদবিরের কারণে এভাবে ঢালাও ওএসডি ও সংযুক্তি দেওয়া শিক্ষা ক্যাডারের জন্য অশনিসংকেত। শিক্ষকরা তদবিরের বাজে অভ্যাসে জড়িয়ে পড়ছেন। আর সরকারে দু’ধরনের ক্ষতি হচ্ছে- এক. ঢাকার রেটে ওই সব শিক্ষককে বাড়িভাড়া দিতে হচ্ছে; দুই. মফস্বলে কোনো শিক্ষক দেওয়া যাচ্ছে না। সবাই যে কোনো মূল্যে ঢাকায় আসতে প্রতিযোগিতায় নামছেন। এসব কারণে সরকারি কলেজগুলোর শিক্ষামান কমে যাচ্ছে।

সমকাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.