বসার চেয়ার নেই ৪৭ জেলায় বিচারকদের!

সারা দেশের ৪৭ জেলায় বিচারকদের বসার কোনো জায়গা নেই! শুধু তাই নয়, জেলা জজ ও মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতের এই বিচারকদের নিজস্ব এজলাসও নেই! একজন বিচারক কাজ শেষ করে ওঠার পর অন্য বিচারক বসে কাজ করছেন।

সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ৪৭টি জেলা আদালতে কর্মরত ১৭১ জন বিচারকের বসার নিজস্ব আসন নেই। তাঁরা সহকর্মীদের চেয়ারে ভাগাভাগি করে বসে বিচারকাজ পরিচালনা করছেন। একজন বিচারক কাজ শেষ করে উঠে যাওয়ার পর অপর সহকর্মী বসছেন। এতে করে সরকার-নির্ধারিত সময়মতো বিচারকরা পূর্ণ সময় কাজের জন্য ব্যয় করতে পারছেন না। ফলে সারা দেশের আদালতে জমে থাকা ৩০ লাখেরও বেশি মামলার জট আরো তীব্র হচ্ছে।

সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, দেশের নিম্ন আদালতে সহকারী জজ থেকে জেলা জজ পর্যন্ত অনুমোদিত পদের সংখ্যা এক হাজার ৬৫৫টি। এর মধ্যে সারা দেশের আদালতগুলোতে বিচারক রয়েছেন এক হাজার ৯৪ জন। এখনো ৪৫৭টি বিচারকের পদ শূন্য রয়েছে।

বর্তমানে কর্মরত এই এক হাজার ৯৪ জন বিচারকের মধ্যে দেশের ৪৭টি জেলার ১৭১ জন বিচারকের নিজস্ব কোনো এজলাস নেই। অন্য বিচারকদের চেয়ারে বসেই কাজ করতে হয় তাঁদের।

এই ৪৭টি জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ ঢাকা ও কুমিল্লায় নয়জন করে ১৮ জন বিচারকের নিজস্ব কোনো এজলাস নেই। এ ছাড়া জামালপুরে আটজন বিচারক, পাবনার সাতজন বিচারক, রাজশাহী, নরসিংদী, শেরপুর, ফরিদপুর, নেত্রকোনা ও চাঁদপুরে ছয়জন করে ৩৬ জন বিচারক, নারায়ণগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, শরীয়তপুর, কুড়িগ্রাম, কুষ্টিয়া, বগুড়া ও নাটোরে পাঁচজন করে ৩৫ জন বিচারক অন্য সহকর্মীর সঙ্গে চেয়ার ভাগাভাগি করে বসে কাজ করেন।

এ ছাড়া গোপালগঞ্জ, যশোর, সুনামগঞ্জে চারজন করে ১২ জন বিচারক, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, রাজবাড়ী, দিনাজপুর, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, খুলনা, রাঙ্গামাটি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তিনজন করে ২৭ জন বিচারক, টাঙ্গাইল, মাদারীপুর, পঞ্চগড়, রংপুর, লক্ষ্মীপুর, বাগেরহাট, হবিগঞ্জ, সাতক্ষীরা, মৌলভীবাজার, চাঁপাইনবাবগঞ্জে দুজন করে ২০ জন বিচারক এবং গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নীলফামারী, সিলেট, বরগুনা, নড়াইল, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে একজন করে বিচারক অন্য সহকর্মীর চেয়ারে বসে কাজ করেন।

এ ছাড়া ২০০৭ সালে তৎকালীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ আলাদা করা হয়। তবে ভবন সংকটের কারণে জেলা প্রশাসন ভবনে পড়ে থাকা এজলাসের মধ্যে ৮৭টি এখনো ব্যবহার করছেন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা।

২৬টি জেলার মধ্যে গাজীপুর ও কিশোরগঞ্জে ছয়টি করে ১২টি, নওগাঁ, সুনামগঞ্জ, খুলনা, বান্দরবানে পাঁচটি করে ২০টি, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, দিনাজপুর, বাগেরহাট, হবিগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চারটি করে ২৮টি, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, মৌলভীবাজার, নড়াইলে তিনটি করে ১২টি, কুড়িগ্রাম, কুষ্টিয়া, সিলেট, বগুড়া, নাটোর ও চাঁদপুরে দুটি করে ১২টি, শরীয়তপুর, পঞ্চগড়, রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি করে এজলাসে বসে বিচারকাজ পরিচালনা করছেন নিম্ন আদালতের বিচারকরা।

সম্প্রতি ফরিদপুর, গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার আদালত পরিদর্শনের সময় অব্যবহৃত এজলাস দেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকদের অনুরোধ জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা।

সাম্প্রতিক সময়ে এজলাস সংকট কাটাতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের (জেলা ম্যাজিস্ট্রেট) অব্যবহৃত এজলাসগুলো জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের দিতে বিভিন্ন জেলার প্রশাসককে অনুরোধ জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। এক অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘বিচার বিভাগ পৃথককরণের আগে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা যেসব স্থানে বসে বিচারকাজ পরিচালনা করতেন, সেসব আদালত যদি ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে আবার সাজিয়ে আমাদের দেওয়া হয়, তাহলে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা সেখানে বসে বিচার কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন।’

এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলাম এনটিভি অনলাইনকে বলেন, সারা দেশের বিচারকদের এজলাস সংকট নিরসনে সুপ্রিম কোর্ট নতুন ভবন নির্মাণের কাজ দ্রুত শেষ করতে বলা হয়েছে। এসব ভবন নির্মাণকাজ শেষ হলেই সংকট কমে আসবে।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘এজলাস সংকট নিরসনে সরকার সারা দেশের ৬৪টি জেলায় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করেছে। প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এসব ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর আওতায় ৩৫টি জেলায় নির্মাণকাজ গৃহীত হয়েছে। তবে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে প্রায় ৩০টি জেলায় ম্যাজিস্ট্রেসি আদালত ভবন নির্মাণকাজ শুরুই করা যায়নি।’

এনটিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.