অলৌকিক ইস্টিমারের নাবিক হুমায়ুন আজাদ

মাসকাওয়াথ আহসান: আমাদের সমাজে ভক্তদের বাড়াবাড়িতে রাগ করে ঈশ্বরকে অপছন্দ করার একটি প্রবণতা রয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও দলীয় ক্যাডারের আচরণে তিক্ত হয়ে রাজনৈতিক দলটির শত্রু হয়ে যাবার চল রয়েছে। সম্প্রতি হুমায়ুন আজাদের খাদেমদের ওপর রাগ করে উনার মত একজন বাতিঘরকে অসম্মান করার কিছু অপচেষ্টা দৃশ্যমান। ঋজু সত্য উচ্চারণের দায়ে যাকে ধর্মের ম্যানেজারদের চাপাতির কোপ খেয়ে ক্রমশঃ মৃত্যুমুখে পতিত হতে হয়েছে; তিনি বোধ সম্পন্ন মানুষের চোখে অবশ্যই মুক্তভাবনার আইকন। সাহিত্যিক আজাদের কবিতা-উপন্যাস-প্রবচনগুচ্ছ সর্বত্রই ক্ষয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানের অচলায়তন ভাঙ্গার আহবান। তা আমাদের সতত উদ্দীপ্ত করে অচলায়তন ভাঙ্গতে।

তিনি বলেছেন, আমি একজন পাকিস্তানীকে বিশ্বাস করিনা; যদি সে ফুল নিয়েও আসে।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানী দখলদার বাহিনী বাংলাদেশে যে গণহত্যা চালিয়েছে; তাতে এটি খুবই যুক্তিসঙ্গত উপলব্ধি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পাকিস্তান শাসনের ম্যান্ডেট পায়। এই ম্যান্ডেট অগ্রাহ্য করে উলটো নির্বাচনে বিজয়ী দলের শীর্ষ নেতা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার এবং ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে বর্বরোচিত গণহত্যা শুরুর মাঝ দিয়ে পাকিস্তান নিজের বিশ্বস্ততা হারায়। বাংলাদেশে ৩০ লাখ মানুষ হত্যা; কমপক্ষে ২ লাখ নারীর সম্ভ্রমহানির পর পাকিস্তানীরা একটি ঘাতক জাতি হিসেবে গোটা পৃথিবীতেই নিন্দিত।

পাকিস্তানের নাগরিক সমাজের যারা ১৯৭১ সালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশে গণহত্যার প্রতিবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দিয়েছেন তাদের। ততকালীন পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতা কর্মী ও বঙ্গবন্ধুর অনুসারীরা বিস্মৃত নন। তাদের প্রাণ বাঁচাতে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের খল রাজনৈতিক নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে কৌশলী সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেছিলেন। মুজিব যেহেতু জনমানুষের নেতা; মানুষ তাঁর কাছে ছিলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গবন্ধুর এই মানবিক ঔদার্য্যের মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন ভুট্টো। ১৯৭৪ সালে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানে গেলে ভুট্টো ফুল নিয়ে এগিয়ে আসেন। সেই একই ভুট্টো বঙ্গবন্ধু হত্যার পরেই খুনীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠাতে পাকিস্তানের বিমান পাঠিয়ে দেন।

ভুট্টো ৭১-এর গণহত্যার তদন্ত প্রতিবেদন হামিদুর রহমান কমিশন রিপোর্টের কিছু অংশ প্রকাশের আগেই লুকিয়ে ফেলেন। এরপরেও মানবতা বিরোধী অপরাধী সেনা কর্মকর্তাদের বিচারের ব্যবস্থা নেননি। উপরন্তু তিনি পাকিস্তানের পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যা ও মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে শোচনীয় যুদ্ধ-পরাজয় লুকাতে একে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, ভারতের ষড়যন্ত্রের ফলাফল ইত্যাদি বিকৃত ন্যারেটিভ চালু করেন।

ফলে ভুট্টো ও অপরাধী ঘাতক সেনাচক্রের গণহত্যা অস্বীকারের ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে গোটা পাকিস্তানে। ভুট্টো বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাংলাদেশকে পাকিস্তানের অঙ্গরাজ্যে পরিণত করার দিবাস্বপ্নও দেখেছিলেন। ভুট্টোর পতন ও ফাঁসির পর জামাত সমর্থিত সেনা শাসক জিয়াউল হক বাংলাদেশের ততকালীন বাংলাদেশের সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের সঙ্গে মিলে মিশে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি ব্যবসা চালু করেন। সেনাশাসক এরশাদও সেই পাকিস্তানী ধর্ম নিয়ে রাজনীতির ধারা অব্যাহত রেখে বাংলাদেশে পাকিস্তানের ইসলামী প্রজাতন্ত্র আদলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করে দেন। ধর্মকে ভালবেসে নয়; ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করার জন্য। অর্থাৎ পাকিস্তান ভূতটি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর আবার বাংলাদেশের ঘাড়ে চেপে বসে।

মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা কাঠামো থেকে দূরে রেখে এক অর্থে আরেকটি ছোট পাকিস্তান হিসেবে বাংলাদেশ সমাজ পরিচালিত হতে থাকে। ১৯৭১ এর ঘাতক রাজাকারদের দল জামাতের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও এর কালো অর্থনীতি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মাঝে একটি পাকিস্তান রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে। বিএনপির সঙ্গে জোট বেধে বাংলাদেশে মন্ত্রী হয় সেই একাত্তরের ঘাতক আল-বদর, আল-শামস-এরা। পাকিস্তানের অনুকরণে বাংলাদেশের অন্যধর্মের মানুষের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালায় বিএনপি-জামাত জোট। বাংলাদেশ থেকে অন্যধর্মের মানুষদের পাকিস্তানের অসভ্য মডেলে উচ্ছেদ করে আজ জনসংখ্যার পরিসংখ্যানে একই রকম নিষ্ঠুর চিহ্ন দৃশ্যমান। এই সুযোগে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। আর পাকিস্তান থেকে জঙ্গীবাদ রপ্তানীর ধারাবাহিকতায় বাংলা ভাইদের মত জঙ্গীদের উত্থান ঘটে। আর ঠিক এই ক্রান্তিকালে (২০০৪ সাল) অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদকে জঙ্গীরা চাপাতি দিয়ে কোপায়; পাক-সার-জমিন-আসমান উপন্যাসে এই পাকিস্তান ভাইরাসের ইতিবৃত্ত লিপিবদ্ধ করার দায়ে।

আজ বাংলাদেশ সমাজে শিশুকে খুঁচিয়ে হত্যা, গণপিটুনীতে মানুষ মেরে ফেলা, নারী ধর্ষণ ও নারীকে অবরুদ্ধ করার হতাশাদায়ী প্রবণতাগুলো পাকিস্তানের অন্ধকার সমাজের ফটোকপি। এই প্রেক্ষিতে হুমায়ূন আজাদ যে বলে গিয়েছেন, আমি একজন পাকিস্তানীকে বিশ্বাস করিনা; যদি সে ফুল নিয়েও আসে।–এই অনিবার্য উচ্চারণ খুবই যৌক্তিক।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হলোকস্টের অপরাধে জার্মানী সেদেশের ঘাতক নাতসীদের বিচার করে। অপরাধ স্বীকার করে সমাজকে ন্যায়ের শিক্ষা দেয়। হলোকস্টের পক্ষে যে কোন কথা বলা আইনত নিষিদ্ধ করে। সেইখানে পাকিস্তান অপরাধ অস্বীকার করে মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সংখ্যা নিয়ে নরভোজী কুতর্ক করে। এই অনুতাপহীন পাকিস্তানকে বিশ্বাস করার কী কোন কারণ থাকতে পারে!

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ ও সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশাররাফ ১৯৭১-এর ট্র্যাজেডীর জন্য ব্যক্তিগতভাবে অনুতাপ প্রকাশ করলেও; পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে শত চেষ্টা করে ১৯৭১-এর গণহত্যার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার বিল উত্থাপন করাতে পারেনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের পক্ষ অবলম্বন করা নাগরিক সমাজ প্রতিনিধি ও তাদের উত্তর প্রজন্ম। অবশ্য শহীদ জননী জাহানারা ইমামের প্রতিষ্ঠিত একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির পাকিস্তান শাখা এ লক্ষ্যে তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। দক্ষিণ এশিয়ার অসাম্প্রদায়িক আন্দোলনের আইকন শাহরিয়ার কবির পাকিস্তানে এ আন্দোলনের সূচনা করেছেন ২০১২ সালে। এর বিপরীতে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির পর দ্রুত সংসদে একটি শোক প্রস্তাব উত্থাপন করতে পাকিস্তান জামাতের কোন কোন সমস্যা হয়নি। অবশ্য প্রস্তাবটি মূলধারার রাজনৈতিক দলের সাংসদদের সমর্থন পায়নি। পাকিস্তান বাংলাদেশে যে সাম্প্রদায়িক ভাইরাস ছড়িয়েছে বিএনপি-জামাতের হাত ধরে; তার বিপরীতে পাকিস্তানে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির প্রচলনের একটি নাগরিক পর্যায়ের কূটনীতি সক্রিয় হয়েছে। বাংলাদেশ সংস্কৃতির এই কাউন্টার হেজিমনি সফল না হওয়া পর্যন্ত; পাকিস্তানীদের বিশ্বাস করার মত কোন যৌক্তিক কারণ নেই। পাকিস্তানের সামগ্রিক মুক্তিযুদ্ধ অস্বীকার প্রবণতা দূরীভূত না হওয়া পর্যন্ত; একাত্তরের গণহত্যার জন্য সংসদের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়া না হলে; বাংলাদেশে জঙ্গীবাদ রপ্তানী ও অশুভ গোয়েন্দা ততপরতা বন্ধ না করা পর্যন্ত; হুমায়ুন আজাদের প্রজ্ঞাসঞ্জাত প্রত্যাখান জারী থাকাই স্বাভাবিক।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেহেতু জনমুখী নেতা ছিলেন; তাঁর উত্তরসূরী শেখ হাসিনা পাকিস্তানের ক্ষমতা কাঠামোর ধারাবাহিক শত্রুতা ও বিশ্বাসঘাতকতা সত্ত্বেও পাকিস্তানের বানভাসী মানুষের জন্য ত্রাণ সামগ্রী পাঠাতে দ্বিধা করেননি। তাছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক নিরাপত্তা যেহেতু পারস্পরিকভাবে সম্পৃক্ত; বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি শান্তি ও নিরাপত্তা মডেল উপস্থাপন করেন। সেটি বিগত কয়েক বছরে পাকিস্তানকে সাহায্য করেছে জঙ্গীবাদ দমনে। বাংলাদেশের কয়েকটি এনজিও জঙ্গীবাদ-হত পাকিস্তান ও আফঘানিস্তানের প্রান্তিক মানুষকে বেঁচে থাকার পথ দেখিয়ে চলেছে। সুতরাং দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ পাকিস্তানে একটি অসাম্প্রদায়িক ও উন্নয়নমুখী সংস্কৃতি প্রচলনে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু এর বিপরীতে পাকিস্তান এখন পর্যন্ত কোন সুসংস্কৃতিগত কৃতজ্ঞতা প্রকাশে সক্ষম হয়নি। ফলে ভুলে ভরা-অপরাধ প্রবণতায় আক্রান্ত পাকিস্তান ফুল নিয়ে এগিয়ে এলেও তাকে বিশ্বাস করার কারণতো ঘটেনি।

আর সবকিছু বাদ দিলেও একাত্তরের অপরাধ অস্বীকারের পরেও পাকিস্তান ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্টের কালো দিনটির পর যেভাবে বাংলাদেশ সমাজকে জঙ্গী ও পশ্চাদপদ মরণব্যাধিতে আক্রান্ত করেছে; সেই বাস্তবতায় বসে ত্রিকালদর্শী হুমায়ুন আজাদ আরো বেশী প্রাসঙ্গিক।

এখন তর্কের খাতিরে তর্ক করতে গিয়ে পন্ডিত হুমায়ুন আজাদকে অপমান করার ভাইরাসটিও পাকিস্তান ভাইরাস। পাকিস্তানে অধ্যাপক হুমায়ূন আজাদের মত মুক্ত ভাবনার মানুষদের গুলি করে হত্যা করা হয়, দেশত্যাগে বাধ্য করা হয় এবং এরপর স্যুডো বুদ্ধিজীবীরা তাদের শব ব্যবচ্ছেদ করে। দার্শনিক হুমায়ুন আজাদকে আমরা পড়েছি। আত্মস্থ করেছি। উনি লেখকদের অনুসারীদের মাজারের খাদেম হতে নিরুতসাহিত করেছেন। ফলে হুমায়ুন আজাদের কাছে আমাদের ঋণ একজন শিক্ষকের কাছে ছাত্রের ঋণ। মিডিওকার কিছু লোক যেমন আমাদের চিন্তার বাতিঘর মুহাম্মদ জাফর ইকবালের কটি গবেষণা পত্র আছে এরকম অর্বাচীন প্রশ্ন করে; হুমায়ুন আজাদকে নিয়েও এ্কইরকম বালখিল্য বিতর্ক তৈরী করে কটাদিন নিজেদের বৈচিত্র্যহীন জীবনে ছদ্ম উত্তেজনা অনুভব করছে যারা; তা খর্ব চিন্তার বৈকল্য। অনেকেই বলেন, আমাকে রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা করার জন্য রবীন্দ্রনাথ হতে হবে নাকি! সেটা যেহেতু অসম্ভব; অন্ততঃ রবীন্দ্রনাথকে বোঝার ন্যুনতম প্রজ্ঞা থাকতে হবে সমালোচকের। চিন্তার বাতিঘরেরা যারা আমাদের সংস্কৃতি-মনোজগত ও সমাজকে আলো দিয়েছেন; তাদের দিকে গোবরডাঙ্গার চায়ের দোকানে বসে স্ল্যাং নিক্ষেপের গ্যাং তৈরীর আদিম প্রবণতাটি একবিংশের প্রথম আলোয় আমরা কোনভাবেই মেনে নিতে পারিনা। সূর্যকে খর্ব আঙ্গুলে কীবোর্ড চালিয়ে ঢেকে দেয়া যে অসম্ভব; তা যত দ্রুত স্যুডো বুদ্ধিজীবীরা বুঝতে পারে; তাতেই মঙ্গল। নইলে সভ্যতার দৌড়ে তারা পিছিয়ে পড়বে। আমাদের চিন্তার জগতের দার্শনিক রাজাদের মৃত্যুর পরে তাদের আবার হত্যার জন্য যারা ততপর হবে; তারা গোলাপ নিয়ে এগিয়ে এলেও আগামী মনস্ক তারুণ্য তাদের বিশ্বাস করবে না; এটা নিশ্চিত।

ঢাকা রিপোর্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.