আশঙ্কা: বিদ্যুতের দাম বাড়ানোয় হিমাগার শিল্পে সংকট বৃদ্ধির

দেশের ২৪ হিমাগার এখন বন্ধ
দেশের ২৪টি হিমাগার (কোল্ড স্টোরেজ) বন্ধ হয়ে গেছে। আলু, বীজ, সবজিসহ পচনশীল পণ্য সংরক্ষণে প্রতিষ্ঠিত এসব হিমাগার নিজেরাই এখন রুগ্ণ।

বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন বলছে, যন্ত্রপাতি পুরোনো হয়ে যাওয়া, মালিকানাগত জটিলতা, ঋণখেলাপি হয়ে পড়া, চলতি মূলধনের অভাব ও সংরক্ষণ উপযোগী পর্যাপ্ত আলু না পাওয়ার কারণেই হিমাগারগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।

এ অবস্থায় মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুতের সাম্প্রতিক দাম বৃদ্ধি। সরকারের এ সিদ্ধান্তে দেশের হিমাগার শিল্প হুমকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন হিমাগারের মালিকেরা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, বিদ্যুতের দাম দফায় দফায় বাড়ানোর কারণে ও ব্যাংকঋণের সুদের হার বেশি হওয়ায় প্রতিটি হিমাগার ঋণের ভারে জর্জরিত ও রুগ্‌ণ শিল্পে পরিণত হচ্ছে। ২৪টি কোল্ড স্টোরেজ ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে আবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আরও কোল্ড স্টোরেজ বন্ধ হয়ে যাবে।

হিমাগার সমিতির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি হিমাগার বন্ধ হয়েছে মুন্সিগঞ্জ জেলায়। এ জেলার পাঁচটি হিমাগার এখন বন্ধ। এগুলো হলো পিজেন্ট ট্রেডিং কোল্ড স্টোরেজ, চান কোল্ড স্টোরেজ, মৌসুমী কোল্ড স্টোরেজ, মীরকাদিম কোল্ড স্টোরেজ ও ময়নামতি আইস অ্যান্ড কোল্ড স্টোরেজ।

এরপরই বেশি হিমাগার বন্ধ হয়েছে রংপুরে, চারটি। এগুলো হলো ভরসা স্পেশালাইজড কোল্ড স্টোরেজ, আরভি কোল্ড স্টোরেজ, আজি ভরসা কোল্ড স্টোরেজ ও মাওলানা বশির কোল্ড স্টোরেজ।

কুমিল্লায় বন্ধ হয়েছে তিনটি হিমাগার। এগুলো হলো মডার্ন কংশনগর কোল্ড স্টোরেজ, প্রিমিয়ার কোল্ড স্টোরেজ ও বন্দিশাহী কোল্ড স্টোরেজ।

এ ছাড়া ঢাকার মুন্না কোল্ড স্টোরেজ ও আরগোছী কনজার্ভস, গাজীপুরের ইরিনা অ্যাগ্রো প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজ, টাঙ্গাইলের মালতি কোল্ড স্টোরেজ, লক্ষ্মীপুরের লক্ষ্মীপুর কোল্ড স্টোরেজ অ্যান্ড আইস প্ল্যান্ট, হবিগঞ্জের পাইওনিয়ার কোল্ড স্টোরেজ অ্যান্ড আইস প্ল্যান্ট, সিলেটের সুরমা কোল্ড স্টোরেজ, খুলনার খুলনা আইস অ্যান্ড কোল্ড স্টোরেজ, কুষ্টিয়ার কুষ্টিয়া কোল্ড স্টোরেজ, বরগুনার মধুমতি কোল্ড স্টোরেজ, সিরাজগঞ্জের শাহ মুখদুমিয়া কোল্ড স্টোরেজ ও দিনাজপুরের উত্তরা হিমঘর বন্ধ হয়েছে।

এই বন্ধ ২৪টিসহ দেশে এখন হিমাগার আছে ৪০৪টি। এর মধ্যে ২২টি হিমাগার বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি)। সেখানে শুধু বীজ সংরক্ষণ করা হয়। দেশের সব হিমাগারে বছরে ৫০ লাখ মেট্রিক টন পণ্য সংরক্ষণ করার সক্ষমতা আছে।

হিমাগার সমিতি বলছে, দেশে উৎপাদিত আলুর প্রায় অর্ধেকই হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়। এ বছর হিমাগারে আলু এসেছে ৩৫ লাখ টন। এর মধ্যে ৪৭ শতাংশ আলুই বাজারে সরবরাহ করা হয়ে গেছে।

বিদ্যুৎ বিলে রেয়াত পায় না হিমাগার: হিমাগার শিল্প পুরোপুরিই কৃষিভিত্তিক শিল্প। তবে হিমাগার সমিতির অভিযোগ, জাতীয় অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখলেও এ খাত কৃষিভিত্তিক অন্যান্য খাতের মতো সুবিধা পাচ্ছে না।

হিমাগারের মালিকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ ছাড়া হিমাগারের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পরিচালনা করা সম্ভব নয়। আলু থেকে প্রক্রিয়াজাত ও উৎপাদিত খাদ্য (যেমন ফ্লেক্স, চিপস, ফ্রেঞ্চফ্রাই ইত্যাদি) প্রস্তুতকারী শিল্পকে বিদ্যুৎ বিলের ২০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হচ্ছে। সরকারি সংস্থা বিএডিসির আওতাভুক্ত ১৭টি হিমাগারও অনেক আগে থেকেই এ সুবিধা পাচ্ছে। কিন্তু কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বেশি সংরক্ষণ করেও বেসরকারি হিমাগারগুলো তা পাচ্ছে না।

একজন হিমাগারের মালিক ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘বীজের মোট চাহিদার মাত্র ২ শতাংশ বিএডিসি সংরক্ষণ করে। কিন্তু সংস্থাটি বিদ্যুৎ বিলে ২০ শতাংশ রেয়াত পাচ্ছে। অথচ বেশির ভাগ বীজ আলু সংরক্ষণের পরও আমরা তা পাচ্ছি না।’

এ বিষয়ে কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, কৃষিভিত্তিক শিল্পের জন্য বিদ্যুৎ বিলের ২০ শতাংশ রেয়াত দেওয়ার আইন থাকলেও হিমাগার শিল্পকে এ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না। এটা না পেলে সবগুলো কোল্ড স্টোরেজই বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে।

জসিম উদ্দিন আরও বলেন, এবারের বাজেটে হিমাগারের বিদ্যুৎ বিলের ওপর থেকে ৫ শতাংশ মূসক সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করায় হিমাগারের মালিকেরা আশান্বিত হয়েছিলেন। কিন্তু এখন বিদ্যুতের দাম নতুন করে বাড়ানোয় তাঁরা হতাশ।

প্রথম আলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.