চাকরি পাননি, তথ্যও পাচ্ছেন না প্রতিবন্ধী রাসেল

শারীরিক প্রতিবন্ধী রাসেল ঢালী ‘পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক’ পদের জন্য মৌখিক পরীক্ষায় ৩০ নম্বরের মধ্যে পেয়েছেন ২৮। তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আবেদন করে তিনি এ তথ্য জানতে পেরেছেন। মৌখিক পরীক্ষায় প্রায় ৯৩ শতাংশ নম্বর পেয়ে এবং প্রতিবন্ধী কোটা থাকার পরও তিনি পাননি চাকরি।

রাসেলের চেয়ে মৌখিক পরীক্ষায় কম নম্বর পেয়েও অনেকেই চাকরি পেয়েছেন। তাই একই আইনের আওতায় লিখিত পরীক্ষায় কত নম্বর পেয়েছেন তা জানতে চেয়েছিলেন রাসেল। কিন্তু তাঁকে জানানো হয়েছে, তাঁর লিখিত পরীক্ষার তথ্য অফিসে সংরক্ষিত নেই। কিন্তু যাঁরা চাকরি পেয়েছেন, তাঁদের লিখিত পরীক্ষার নম্বর ঠিকই সংরক্ষিত আছে।

২০১৩ সালের ১৩ এপ্রিল পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীনে মুন্সিগঞ্জ জেলার পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির জন্য জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার ইছাপুর ইউনিয়ন থেকে তৃতীয় শ্রেণির পদটির জন্য আবেদন করেন রাসেল। ওই বছরের ২১ জুন লিখিত পরীক্ষায় জেলার বিভিন্ন থানার ৫৭ জন প্রার্থী উত্তীর্ণ হন, তাঁদের মধ্যে রাসেলও ছিলেন। পরে চূড়ান্তভাবে ১৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

লিখিত পরীক্ষার নম্বর কেন জানানো সম্ভব হচ্ছে না—সে সম্পর্কে রাসেল ঢালীকে জানানো হয়েছে, তৎকালীন নিয়োগ বা বাছাই কমিটি মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী সবার লিখিত পরীক্ষার নম্বর সরবরাহ না করায় তা অফিসে সংরক্ষিত নেই। তবে মুন্সিগঞ্জে পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক পদে যে ১৫ জন নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের লিখিত (এমসিকিউ পদ্ধতি) ও মৌখিক নম্বর জানতে চেয়ে সেই তথ্য পেয়েছেন রাসেল।

রাসেলের প্রশ্ন, তিনি যদি লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হন, তাহলে তাঁকে মৌখিক পরীক্ষায় কেন ডাকা হবে? তথ্য অধিকার আইনের আওতায় তথ্য চেয়েই তিনি জানতে পারেন, তিনি মৌখিক পরীক্ষায় ২৮ নম্বর পেয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, একই তথ্যে তাঁকে জানানো হয়েছে, নিয়োগ পাওয়া ৩ হাজার ৮৭০টি পদের মধ্যে এতিমখানার নিবাসী ও শারীরিক প্রতিবন্ধী কোটায় (তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি) ৮১ জন নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন। এর আগে জানানো হয়েছিল ৫৭ জন এ কোটায় নিয়োগ পেয়েছেন। আর দুবারই পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা পরিচালক (প্রশাসন) জামাল হোসাইনের সইয়ে তথ্য দেওয়া হয়েছে। একবার তথ্য দেন গত বছরের ২০ মার্চ। আরেকবার তথ্য দেন ৪ ডিসেম্বর। মোট পদের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক পদে নিয়োগ পেয়েছেন ৮১৭ জন।

রাসেল বলেন, ‘যাঁরা নিয়োগ পাইছেন, তাঁদের মধ্যে মাত্র একজন মৌখিক পরীক্ষায় ২৯ নম্বর পাইছেন। এই একজন ছাড়া নিয়োগ পাওয়া অন্যদের চাইতেও আমি মৌখিক পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাইছি।’

নিয়োগ চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ দায়ের, সমাজসেবা অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কর্মরত প্রতিষ্ঠানের কাছেও ধরনা দিয়েছেন রাসেল ঢালী। গত বছর কেন তিনি চাকরি পাবেন না—তা নিয়ে হাইকোর্টেও একটি রিট করেছেন। এ পর্যন্ত যেসব ব্যক্তির কাছে গিয়েছেন, তাঁদের অনেকেই বদলি হয়ে অন্য জায়গায় চলে গেছেন। তথ্য অধিকার আইনের আওতায় তথ্য দেওয়া জামাল হোসাইনও বদলি হয়ে গেছেন। তবে হাল ছাড়েননি রাসেল।

১৯৯৭ সালের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সরকারি দপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত বা আধা স্বায়ত্তশাসিত এবং বিভিন্ন করপোরেশনের চাকরিতে জেলা কোটার বাইরে এতিমখানার নিবাসী ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদের জন্য ১০ শতাংশ কোটা রাখার নিয়ম রয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতেও সরকারের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবন্ধীসহ অন্যান্য কোটা সংরক্ষণ করা হবে বলে উল্লেখ ছিল।
১৩ বছর বয়সে টাইফয়েড রাসেল ঢালীর বাঁ হাত ও ডান পায়ে সমস্যা দেখা দেয়। তবে রাসেল একাই চলাফেরা করেন।

প্রথম আলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.