কাজী হাসান: ফেসবুকে এক বৃক্ষপ্রেমী

একজন বৃক্ষপ্রেমী মানুষ নগরমুখী না হয়ে থেকে গেলেন গাছ, ফুল আর নদীর কাছেই। গড়েছেন ‘সোনারং তরুছায়া’ নামের একটি বাগান। আর ফেসবুক হয়ে উঠছে তাঁর এই গাছের জন্য ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যম। গজারিয়া, মুন্সিগঞ্জ থেকে ফিরে লিখেছেন এ এস এম রিয়াদ

এটি একটি বাগানের গল্প। যে গল্পের শুরুটা আমরা প্রথম পাই কাজী হাসানের ফেসবুক পোস্ট থেকে। ফেসবুকে নিজের বাগানের দারুণ সব ছবি নিয়মিত পোস্ট করেন তিনি। ফেসবুক রেখে গল্পের পুরোটা শোনার জন্য গত ২৬ জানুয়ারি যাত্রা সেই মানুষটির স্বপ্নের বাগান সোনারং তরুছায়ার পথে। বাগানে পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই রোদের তাপে সকালের হালকা কুয়াশা মুখ লুকায়। জাম আর জামরুলের ফাঁক দিয়ে অল্প একটু হাসির মতো রোদ এসে পড়ে শরীরে। বাগানে দাঁড়িয়েই কথা হয় আমাদের গল্পের নায়ক কাজী হাসানের সঙ্গে।

গল্পের শুরুতেই আমাদের চোখ যায় একটি ডালিম ফুলের কলির দিকে। কাজী হাসান ফুলটা দেখিয়ে বলেন, ‘দুই দিনের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গভাবে ফুটবে এ ডালিম ফুল।’ আমাদের গল্প এগোতে থাকে…

বাগান পরিচিতি
কাজী হাসানের বাগানে জবা ফুল আছে নয় প্রজাতির। আছে উলটকম্বল, জংলি বাদাম থেকে শুরু করে দেশি-বিদেশি অজস্র গাছ। তার সে খালের দিকের ধারে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে রাঁধা-কৃষ্ণ। রাঁধাচূড়া আর কৃষ্ণচূড়া পেরোতেই চোখে পড়ে সজনেগাছের ফুলের কলি। কিছুদিন পরেই হয়তো ডাঁটায় ভরে যাবে গাছটি। ফুরুস ফুলের কলি ফুটতে এখনো বেশ বাকি। তবে ফুলের মতোই সুন্দর মহুয়ার লাল কচিপাতা দেখে মুগ্ধ হতে হয়। এদিকে পাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে লাল টুকটুকে বারবাডোজ চেরি। বাগানের করবীগাছটির বয়স এখনো ছয় মাস পেরোয়নি।

তবে দারুচিনি আর তেজপাতা আলাদা করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল। লজ্জাবতী লতার সহজে দেখা মিললেও লজ্জাবতী বৃক্ষ মেলা ভার। সোনারং তরুছায়ায় এলে তার দেখা পাওয়া যায়।

ঘ্রাণময় গাছের মধ্যে এ বাগানে আছে কাঁঠালি চাঁপা, হাসনাহেনা।

লেবুর পাতা করমচা যা বৃষ্টি ঝরে যা। বৃষ্টি ঝরুক আর না-ই ঝরুক, বাগানে আছে বেশ কয়েকটি করমচাগাছ। টবে এ করমচার স্বাদ মিষ্টি, টক নয়। বছর খানেক আগে বাগানে রোপণ করেছিলেন, চুকুর ফল। টক জাতীয় এ ফল মূলত পাওয়া যায় পাহাড়ে।

নিজের বাগানে কাজী হাসান। ছবি: খালেদ সরকার

পাতাহীন বাগানবিলাসটির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল আগেই। কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা আমেরিকা থেকে এনেছিলেন অ্যাভাকাডো ফলের বীজ। সেই বীজ থেকে জন্ম নেওয়া তিনটি চারাগাছের একটি তুলে দিয়েছিলেন কাজী হাসানের বিশ্বস্ত হাতে। এখন সে গাছটিকে বড় করে তুলছেন তিনি সন্তান স্নেহে। হাসান হেসে বলেন, ‘আতিথেয়তা পেয়ে বিদেশি গাছটিও আমাদের একজন হয়ে গেছে।’

শুরুর গল্প
সাহিত্যকর্মী ও প্রকাশক কাজী হাসানের বৃক্ষের সঙ্গে সখ্য আর বন্ধুত্বটা দীর্ঘ দিনের। বৃক্ষদের সুখ-দুঃখ, অসুখ-বিসুখে এগিয়ে আসা শুরু হয়েছিল সেই ‘ইশকুল পালানো’ দিনগুলো থেকেই। কিন্তু ভাড়া বাসায় থাকার কারণে নিজের একখণ্ড বাগান হয়ে উঠছিল না।

ছাদের টবে লাগানো গাছগুলোই ছিল সান্ত্বনা। স্বপ্ন ছিল অনেক বড়। অনেক গাছ লালন করার। একটি পরিপূর্ণ বাগানের। অবশেষে ২০১২ সালে আসে সে সুযোগ। পেয়ে যান বেশ খানিকটা জমি। এবার স্বপ্ন পূরণের পালা। সে বছরের ২৩ জুন একটি কাঠবাদাম রোপণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বাগানের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। ঢাকার অদূরে মুন্সিগঞ্জ জেলার গজারিয়া থানার ভবেরচরে এ বাগান। বাগানের নাম সোনারং তরুছায়া। তরুছায়ায় আছে ৫৬ রকমের ফুলগাছ, ৫০ রকমের ফলগাছ আর ১০ রকমের কাঠগাছ।

বাগানের পাশেই ছোট্ট একটা খাল। শীতের সে শুকনো খালে পড়ে আছে ছোট্ট একটি নৌকা। বর্ষার পানিতে অপরূপ এক রূপ ধারণ করে এ খাল। খালের ধারেই ফুটে থাকে কদম ফুল। ডিঙি নৌকায় চড়ে বাদল দিনের প্রথম কদম ফুলের ঘ্রাণ নেন কাজী হাসান। কাজী হাসান বলেন, ‘বৃক্ষ মানুষকে মহৎ করে তোলে, শুদ্ধতা অর্জনের জন্য বৃক্ষমুখী হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।’

হুমায়ূন আহমেদের সেই গাছ
নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের উদ্যোগে ‘নুহাশ পল্লী’তে রোপিত হয়েছিল একটি ‘নীলগাছ’ (প্রকৃতি বিষয়ক লেখক মোকারম হোসেন ছবি দেখে জানিয়েছেন, এটি নীলগাছ কি না নিশ্চিত করে বলা মুশকিল।) সেখান থেকে জন্ম নেওয়া একটি চারা তিনি সংগ্রহ করেছিলেন বছর দেড়েক আগে। সোনারং তরুছায়া বাগানে খুব সজীব হয়ে বেড়ে উঠছে প্রিয় নীলগাছটি। এখন সে গাছে এসেছে হলুদ ফুল। আমাদের প্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ নেই, তাঁর সেই গাছের উত্তরসূরি বেড়ে উঠছে হাসানের বাগানে।

ফেসবুক পোস্ট
বৃক্ষে আর ফুলে যে ভালোবাসা, কাজী হাসান তা ছড়িয়ে দিতে চান পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। তাই তাঁর বাগানে নতুন কোনো ফুল ফুটলে, কলি এলে অথবা পাতা গজানোর সঙ্গে সঙ্গেই সে বার্তা ছড়িয়ে দেন ফেসবুকের পাতায়। বৃক্ষপ্রেমী মানুষজন সে ছবি দেখে অনুভব করে অন্য রকম এক স্নিগ্ধতা। হাসান বলেন, ‘আমি কোনো দুর্ঘটনার ছবি পোস্ট করতে চাই না, আমি চাই মানুষের মনে একটা সুন্দর অনুভূতি খেলা করুক। আর তাই আমার নিয়মিত এ ছবি পোস্ট করা।’
বৃক্ষরোপণের কাজকে কেবল নিজের বাগানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি কাজী হাসান। লক্ষ্য সেটিকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়া।

এরই মধ্যে সঙ্গে জুটে যায় সমমনা আরও কিছু বৃক্ষপ্রেমী মানুষজন। তাঁদের নিয়েই শুরু হয় ‘শাইখ সিরাজ ফার্মাস ক্লাব’। এ ক্লাব কাজ করে মানুষকে বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করার জন্য। কেবল উৎসাহ নয়, এ ব্যাপারে যাবতীয় পরামর্শও মিলবে তাদের থেকে। ক্লাবের উদ্যোগে বছর বছর অনুষ্ঠিত হয় ‘বৃক্ষ উৎসব’। এলাকার বৃক্ষপ্রেমী মানুষদের দেওয়া হয় ‘শাইখ সিরাজ ফার্মাস ক্লাব সম্মাননা’। নিয়মিত আয়োজন করা হয় গাছের পরিচর্যা-বিষয়ক আলোচনা সভাও।

কাজী হাসান মনে করেন, মানুষের বিশেষ দিনগুলোকে উপলক্ষ করে বৃক্ষরোপণ হওয়া উচিত। সন্তানের জন্মদিনে একটি করে গাছ লাগানো যেতে পারে। সেই সন্তানের প্রথম স্কুলযাত্রার দিনও একটি বৃক্ষরোপণ হতে পারে। দুজন মানব-মানবী বিয়ের দিন তাদের দুই বাড়িতে দুটি করে বৃক্ষরোপণ হতে পারে। এভাবেই বৃক্ষের সঙ্গে মানুষের হৃদ্যতা বাড়বে। শুরু হবে মানুষে-বৃক্ষে অপূর্ব এক ভালোবাসা।

স্মারক বৃক্ষকথন
দেশের বরেণ্য ব্যক্তিদের জন্মদিন উপলক্ষ নিজের বাগানে গাছ রোপণ করেন হাসান। গাছটিকে হতে হয় সেই ব্যক্তির প্রিয় কোনো বৃক্ষ বা ফুলের গাছ। এ বৃক্ষগুলোর নাম দিয়েছেন স্মারকবৃক্ষ। অধিকাংশ সময়ই গাছটির চারা সংগ্রহ করা হয় বরেণ্য সেই ব্যক্তির কাছ থেকেই।

‘গাছের মাধ্যমে আমার বাগানেও সেই ব্যক্তিকে ধরে রাখছি। এখানকার আলো-হাওয়ায় বেড়ে উঠছে তাঁর স্মারক।’ বলছিলেন হাসান।

এখনো পর্যন্ত এ বাগানে স্মারকবৃক্ষ রোপিত হয়েছে অভিনয়শিল্পী আফজাল হোসেন, আলী যাকের, সারা যাকের, কণ্ঠশিল্পী সামিনা চৌধুরী, কনকচাঁপাসহ অনেকের নামেই।

সচেতনতার বীজ
প্রতিনিয়তই মানুষকে তরুতলে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন বৃক্ষপ্রেমী কাজী হাসান। তাঁর ডাকে সাড়াও মিলেছে বেশ।

কাজী হাসানের ইচ্ছে স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেবেন বৃক্ষরোপণের ডাক। এ বছর প্রথম স্কুল যাওয়ার দিন, তাই বেশ কিছু শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দিয়েছেন একটি করে গাছের চারা।

আলাপে সময় গড়াতে থাকে। বিদায় নিয়ে পা বাড়াতে হয় ফেরার পথে। শেষ বিকেলের রোদে তখন ঝলমল করছে উলটকম্বলগাছ।

প্রথম আলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.