পঞ্চসারে আধিপত্য নিয়ে…

আসন্ন ইউপি নির্বাচন ঘিরে বিএনপি থেকে পদত্যাগ, যোগদান, নৌকার টিকিট অতঃপর একটি লিফলেট বিলি নিয়ে পঞ্চসার ইউনিয়নে নানা বাতাস বইছে। উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনের পর সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে বিএনপির মধ্যে নানা শঙ্কা দেখা দেয়ায় সেখানকার বিএনপি ঘরানার কেউ কেউ আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হতে চাইছেন বলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে।

স্বাধীনতা পরবর্তী এ ইউনিয়নে বেশির ভাগ সময় বিএনপি সমর্থিতরা চেয়ারম্যান পদে জয়লাভ করেন। বর্তমানে দুই মেয়াদে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান। তিনি জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল হাইয়ের ছোট ভাই সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ মহিউদ্দিন আহাম্মেদ-এর প্রিয়ভাজন হিসেবে পরিচিত। তিনি এবার আওয়ামী লীগের টিকিট নেয়ার জন্য লাইনে রয়েছেন বলে পঞ্চসার ইউনিয়ন এলাকায় গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে চাইছেন জেলা বিএনপির সভাপতির চাচাতো ভাই গোলাম মোস্তফাও। যদিও পারিবারিকভাবে গোলাম মোস্তফার সঙ্গে সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মহিউদ্দিন আহাম্মেদ-এর মনোমালিন্য রয়েছে। গোলাম মোস্তফার সাফ কথা, নৌকা অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করবেন।

তবে, প্রার্থী যেই হোন-এখানে শুরু করেছে টাকার খেলা। পঞ্চসার শিল্পনগরীর এ ইউনিয়নে গতবার মোট ভোটার ছিল প্রায় ৫০ হাজার। এদিকে, পঞ্চসারের আধিপত্যের ভাগ বসাতে চেয়ে বার বার ব্যর্থ হয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ। এ ইউনিয়নের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিগত দিনে অসংখ্য রাজনৈতিক সহিংসতা হয়েছে। এ রাজনৈতিক সহিংসতা ও আক্রোশের কারণে খুনের শিকার হয়েছেন বেশ কয়েকজন।

এদের মধ্যে সরকারপাড়ার ছাত্রলীগ নেতা শাহীন (৩০), জোরপুকুর পাড়ের হীরা লাল ফকিরের ছেলে শহীদ (৩৫), মুক্তারপুরের মাদবর বাড়ির আওয়ামী লীগ নেতা বশির মাদবর (৫০), মালিরপাথর গ্রামের যুবলীগ কর্মী আনিস (৪০), নয়াগাঁওয়ের যুবলীগ কর্মী আবদুল আজিজ (৩৫), নয়াগাঁওয়ের যুবদল কর্মী মুক্তার হোসেন (৪৬) একই গ্রামের যুবদল কর্মী মো. মাসুম (২২) ও মিরেশ্বরাই গ্রামের বিএনপি সমর্থক মাছ বিক্রেতা সাইজউদ্দিন (২২) উল্লেখ্যযোগ্য। এসব হত্যাকাণ্ড ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সালে সংঘটিত হয়। ৯৬ জমানায় পঞ্চসার হয়ে উঠে এক দৈত্যপুরীতে। ২০০০ সালের ২৯শে অক্টোবর মুক্তারপুর ফেরিঘাট এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় সেখানকার আলোচিত আওয়ামী লীগ নেতা বশির মাদবরকে।

এ ঘটনায় সেখানে টানা ৫ দিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধসহ অর্ধমাস মুক্তারপুর-পঞ্চসার এলাকায় এক ভীতিকর অবস্থা বিরাজ করে। বশির মাদবর হত্যা মামলায় ওই সময়ের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল হাই, তার ছোট ভাই আবদুল কাদের, চাচাতো ভাই গোলাম মোস্তফাসহ ২৫ জন দলীয় নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের ওই ৫ বছরে আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধে হত্যাসহ ১৮-২০টি মামলা হয়। সেই আধিপত্য রক্ষার রাজনীতি এখনও থেমে নেই। তবে, রক্তারক্তি বন্ধ হয়েছে। এখন কৌশলে পঞ্চসার ইউনিয়ন দখলে মরিয়া স্থানীয় আওয়ামী লীগ। এবার আওয়ামী লীগ বিএনপির এ দুর্গে আঘাত হানতে যাচ্ছেন-এটা অনেকটা নিশ্চিত। বিএনপির একচ্ছত্র আধিপত্যে ভাগ চাচ্ছেন তারা।

এরই মধ্যে গত ৭ই ফেব্রুয়ারি পঞ্চসারের ডিঙ্গাভাঙ্গায় ঈগল ফাইবারে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিএনপির সকল পদ থেকে পদত্যাগ করেন হাজী মো. আক্তার হোসেন। তিনি সদর উপজেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ ও পঞ্চসার ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি ছিলেন। এরপর গত ১৫ই ফেব্রুয়ারি বিকালে জেলা পরিষদে ফুলের তোড়া নিয়ে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের কাছে আওয়ামী লীগে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেন। এদিকে, বিএনপি থেকে পদত্যাগের এক সপ্তাহের ব্যবধানে আওয়ামী লীগে যোগদান ও নৌকার টিকিট প্রাপ্তি নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক পক্ষের কর্মীরা মো. আক্তার হোসেনের বিরুদ্ধ নিয়েছেন।

জানা গেছে, স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭৮ সালে এ ইউনিয়নের সর্ব কনিষ্ঠ চেয়ারম্যান ছিলেন জেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ আবদুল হাই। এরপর ১৯৭৯ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আবদুল হাই পরপর ৫ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন তার বাবা মরহুম হাজী মনিরউদ্দিন ফকির। এ ইউনিয়নে চেয়ারম্যান ছিলেন, জাপা থেকে সফিউদ্দিন আহমেদ। জয়ের পর তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। এরপর ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার কয়েকদিন আগে তিনি বিএনপিতে যোগদান করেন। দুই মেয়াদে চেয়ারম্যান ছিলেন, আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম আশোক আলী। এ ছাড়া আরও ছিলেন, মরহুম আবদুল আজিজ ডাক্তার, বিএনপি সমর্থক রহমতউল্লাহ।

এরপর গত দুই মেয়াদে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান। পঞ্চসারের মুক্তারপুরে জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল হাই ও তার ছোট ভাই সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মহিউদ্দিন আহাম্মেদ-এর বসতবাড়ি হওয়ায় সেখানে বিএনপির আধিপত্য বেশি।

ওদিকে, পঞ্চসার ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনয়নের জন্য বিএনপি থেকে যোগ দেয়া আক্তার হোসেন ছাড়াও দৌড়ঝাঁপ করছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি আলমগীর খান, সহসভাপতি আওলাদ হোসেন কাজল ও আওয়ামী লীগ নেতা আবদুস সাত্তার।

বিএনপি থেকে এই মুহূর্তে প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন একজনই, তিনি বর্তমান চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান। এ ছাড়াও জেলা বিএনপির সভাপতির চাচাতো ভাই গোলাম মোস্তফাও রয়েছেন। তবে, গোলাম আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির টিকিট না পেলে স্বতন্ত্র নির্বাচন করছেন বলে তিনি জানিয়েছেন।

মানবজমিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.