প্রশ্নবিদ্ধ ওসি! সিরাজদিখানে ছাত্রলীগ নেতা আসিফের মৃত্যু

ছাত্রলীগ নেতা আসিফ হাসানের (২১) মৃত্যু ঘিরে নানা প্রশ্ন বইছে। হত্যার জন্য রাজনীতি না পুলিশ দায়ি-এ প্রশ্ন সর্বত্র। তবে, আসিফের অকাল মৃত্যুর জন্য সিরাজদিখার থানার ওসিকেই দায়ি করছেন স্থানীয়রা। সিরাজদিখান থানার ওসির ঘুষ বাণিজ্য ও পক্ষপাতিত্বের কারণে উপজেলার কোলা ইউনিয়নের কোলা গ্রামের ইউনিয়ন ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আসিফ হাসানের অকাল মৃত্যু ঘটে বলে সেখানকার আওয়ামী লীগের একাংশ ও নিহতের পরিবারের স্বজনের দাবি।

সরজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ১২ ই এপ্রিল ঘটনার দিন রাত ১১ টা থেকে পরদিন বেলা ১১ টা পর্যন্ত সময়ে সিরাজদিখান ও মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে গুরুতর আহত ছাত্রলীগ নেতা আসিফকে পুলিশ চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সেদিনই আসিফকে আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। হাসপাতালের দায়িত্বরত ডাক্তার, আসিফের আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা উন্নত চিকিৎসা ও সিটি স্কেনের জন্য বারবার ঢাকায় পাঠানোর জন্য অনুরোধ করা হলেও সিরাজদিখান থানার ওসি তা মানেননি।

এলাকাবাসীর প্রশ্ন, আসিফের অবস্থা আশঙ্কাজনক না হলে তাকে কেন ১২ ঘন্টার ব্যবধানে সিরাজদিখান থানার ওসি ইয়ারদৌস হাসান তিন দফায় হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে গেলেন। চিকিৎসা না দিয়ে ও হাসপাতালে ভর্তি না করিয়ে আদালতের মাধ্যমে কেন আসিফকে জেলা কারাগারে পাঠানো হলো?

এরপর গত ১৭ ই এপ্রিল সকালে কারাগারে গুরুতর অসুস্থ হয়ে আসিফের মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সিরাজদিখানের সর্বত্র। আবার ঘটনা ঘটার পৌনে তিন ঘন্টার মধ্যে চুম্বকগতিতে আসিফের বিরুদ্ধে থানায় মামলা নিলেন ওসি। অথচ দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলা চার-পাঁচদিন পরও থানার পুলিশ নানা টালবাহানা ও ঘুষ নিয়ে নথিভুক্ত করারও নজির রয়েছে। এদিকে, আসিফ হত্যাকান্ডকে ঘিরে সিরাজদিখানে স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশ অপর পক্ষকে ব্যাপকভাবে দায়ি করছেন, দায়ি করছেন সিরাজদিখান থানার ওসি ইয়ারদৌস হাসানকেও।

এদিকে, আসিফ হত্যার পর মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য সুকুমার রঞ্জন ঘোষ আসিফের বাড়ি গিয়ে তার মা, বাবা, বোন ও আত্মীয়স্বজনদের সাথে দেখা করে শোক সন্তপ্ত পরিবারটিকে সমবেদনা জানিয়েছেন। তখন আসিফের মা ও বাবা বলেন, আমাদের ছেলের হত্যার সাথে আপনি জড়িত এটা আমরা বলিনি ওসি বলেছে উপরমহল জড়িত । তাহলে উপর মহলটা কে?

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ২২ শে মার্চ অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচন ঘিরে জয়ী ও পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থী গ্রুপের মধ্যে গত ১২ ই এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টায় শ্রীনগর ও সিরাজদিখানের সীমানা ঘেরা সিরাজদিখানের কোলা ইউনিয়নের কোলা গ্রামের ব্রিজের কাছে ছাত্রলীগ নেতা আসিফ ও ইয়ামিন গ্রুপের মধ্যে সহিংস ঘটনা ঘটে। এতে দুই পক্ষের ইয়ামিন ও আসিফ দুইজনই আহত হয়। আসিফকে মারাত্মক আহতাবস্থায় রাত ১০টার দিকে পুলিশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। রাত ১১ টা ১০ মিনিটের সময় আসিফকে সিরাজদিখানের ইছাপুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে নিয়ে এসে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে পুনরায় থানায় নিয়ে রাখা হয়। ওইদিন মধ্যরাত ১২ টা ১৫ মিনিটে আসিফ, বিপ্লব মোল্লা ও তার ভাই বিদ্যুৎ মোল্লাসহ ৮জনকে আসামি করে থানায় একটি মামলা নথিভুক্ত করা হয়। মামলা নং-১৩। মামলার বাদী হন ইউনিয়ন ছাত্রলীগের বহিস্কৃত সাধারণ সম্পাদক ইয়ামিন শেখের মা আলেয়া বেগম।

তিনি মামলায় উল্লেখ করেছেন, তার ছেলের ওপর হামলার পর আসিফকে এলাকাবাসী গণধোলাই দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। তার ছেলে ইয়ামিন শেখ (২০)-কে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করান। ছেলের কাজে ব্যস্ত ও ছেলের কাছ থেকে জেনে ছেলে কিছুটা সুস্থ হলে থানায় মামলা করতে সামান্য বিলম্ব হলো।

এখন কথা হলো- এতো অল্প সময়ে তিনি কিভাবে ঢাকায় আসা যাওয়া ও ছেলের চিকিৎসা করিয়ে ঘটনার পৌনে ৩ঘন্টার মধ্যে থানায় মামলাটি নথিভুক্ত করিয়ে ফেললেন। এতো তাড়াহুড়া করে মামলা দেয়া ও এ মামলা চুম্বকগতিতে নথিভুক্ত করা নিয়েও এলাকার সর্বত্র সমালোচনার ঝড় বইছে।

আবার পরদিন সকাল ৯টা ৪০মিনিটে আসিফকে সিরাজদিখান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয় পুলিশ। এরপর একইদিন বেলা ১১টা ৫মিনিটে আসিফকে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়। মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের রেজিস্ট্রার খাতার নম্বর ৩৬৮০৭/৪১। এরপর এখান থেকে আসিফকে সোজা আদালতে পাঠানো হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডাক্তাররা বলেছেন, আসিফের অবস্থা ভালো নয় পুলিশকে বলার পরও কর্ণপাত করেননি। উন্নত চিকিৎসা ও সিটি স্কিন করার জন্যও পুলিশকে বলা হয়। কিন্তু তারা তা শোনেননি।

সরজমিন নিহত আসিফের বাড়িতে যাওয়ার পর তার মা কোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা জোহরা আসমা একমাত্র পুত্র শোকে অচেতন হয়ে খাটে শুয়ে আছেন। এগিয়ে আসেন আসিফের একমাত্র বোন নূসরাত জাহান তনিমা। তিনি ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী কলেজের মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।

তিনি জানালেন, তার একমাত্র ছোট ভাই আসিফ এলাকায় থাকতেন না, ঢাকার মিরপুরে খালার বাসায় থাকতেন। আসিফ পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে ১১ই এপ্রিল রাত ৮টায় গ্রামের বাড়িতে আসে। পরদিন ১২ ই এপ্রিল সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে বের হয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ, উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সৈকত হোসেনের সঙ্গে দেখা করে রাতে বিদ্যুৎ ও আসিফ মোটর সাইকেলে করে সিংপাড়া বাজারে বাবার ওষুধে দোকানে বাবার সঙ্গে দেখা করে বাসায় ফিরছিলেন। বাড়ির কাছাকাছি মাজার শরীফ কোলা ব্রিজের কাছে প্রতিপক্ষের ইয়ামিন ও তার লোকজন আসিফকে মোটর সাইকেল থেকে ধরে নিয়ে যায়। বিদ্যুৎ পালিয়ে এসে বিভিন্ন স্থানে ফোন করে ঘটনা জানায়। আসিফকে দেড়শ গজ দূরের পাশ্ববর্তী শ্রীনগর উপজেলার তন্তর ইউনিয়নের সিংপাড়ার একটি বাগানে নিয়ে ইয়ামিন, তার মা, বাবা, শশুর, রফিকুল ইসলাম তারন, নুরুল ইসলামসহ কয়েকজন মিলে ব্যাপক মারধর করে অচেতন করে ফেলে। এ সময় আসিফ বার বাব বমি করছিলো। পুলিশ এসে আসিফকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। আসিফ আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী মীর লিয়াকত আলীর নৌকার পক্ষে কাজ করায় ওরা ক্ষিপ্ত হয়ে এ ঘটনা ঘটায়। ইয়ামিন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী পরাজিত প্রার্থী নাছিরউদ্দিন চৌধুরীর নির্বাচন করে। আব্বু আম্মু রাতে থানায় গিয়ে দেখেন, পুলিশ আসিফের নামে মামলা লিখে ফেলেছে। আব্বু, আম্মু, স্থানীয় মহিলা মেম্বার রওশন আরা, খালাতো ভাই অরুণসহ আত্মীয়স্বজনরা থানায় গেলে তাদের পুলিশ থানা থেকে বের করে দেয়।

ওদিকে, অনুসন্ধানকালে নানা জনের সঙ্গে কথা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী রিকশাচালক আমির হোসেন। শ্রীনগরের বোলতলী ইউনিয়নের আটপাড়া গ্রামের একিন আলীর ছেলে। কোলা গ্রামের ব্রিজের কাছের একটি বাগান বাড়িতে বসে তিনি জানালেন, গত ১২ ই এপ্রিল রাত ৯টা থেকে সোয়া ৯টার দিকে ছাত্রলীগের বহিস্কৃত নেতা ইয়ামিন শেখকে সিংপাড়া বাজার থেকে ১০ টাকা ভাড়ায় কোলা গ্রামে নিয়ে আসছিলেন। কোলা ব্রিজের কাছেই পৌঁছতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা ২-৩ জন লোক ইয়ামিনকে রিকশা থেকে নামিয়ে ফেলে। এ অবস্থা দেখে সে রিকশা ভাড়া না নিয়েই দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন বলে তিনি জানান। এরপর কি হয়েছে তার জানা নেই বলে দাবি করেন।

সিরাজদিখান উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জহিরুল ইসলাম লিটু জানান, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি মীর লিয়াকত আলী নৌকার টিকিট পাওয়ার এক সপ্তাহ আগে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। যোগদান ও নৌকার টিকিট দেয়া নিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক এসএম সোহরাব হোসেন মীর লিয়াকত আলীর কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেয়।

লিয়াকত আলী চেয়ারম্যান হওয়ার পর বিএনপি সমর্থিতদের নিয়ে তার লোকজন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন শুরু করে। নির্বাচনের আগের দিন ইউপি আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শরীফ, নির্বাচনের চারদিন পর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম তারনকে কুপিয়ে পিটিয়ে আহত করে। এরপর ১২ই এপ্রিল রাতে বাসায় ফেরার পথে ইয়ামিন শেখকে রিকশা থেকে নামিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে মাথা ও মুখে আঘাত করে। এতে ইয়ামিনের মাথা ফেটে যায় ও দাত ভেঙ্গে যায়। তার আত্মচিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে আসিফকে আটক করে গণধোলাই দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।

উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সৈকত হোসেন জানান, গত ২-৩ বছর আগে ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি আল-আমিন ফ্রান্সে চলে যাওয়ার পর আসিফকে ওই ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়। এরপর গত বছরের ১২ শে মে উপজেলা ছাত্রলীগের সম্মেলনে আসিফ আমাকে সমর্থন করে। আসিফকে সভাপতির দায়িত্ব দেয়া ও আমার সভাপতি হওয়ার পেছনে আসিফের ভুমিকা থাকায় একই গ্রামের ইয়ামিন গং আসিফের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। এরপর গেল ২২ শে মার্চের ইউপি নির্বাচনে আসিফ নৌকা প্রার্থীর নির্বাচন করলে ও বিদ্রোহী প্রার্থীর নির্বাচন করার দায়ে নির্বাচনের ২-৩দিন আগে ইয়ামিনকে ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক থেকে বহিস্কার করা হলে ইয়ামিন গং আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে আসিফের ওপর।

তিনি আরও বলেন, ইয়ামিন এলাকায় মাদক ব্যবসা করে আসছিলো। তার এ ব্যবসায় আসিফ বাধা দেয়। ওদিকে, দলের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়ায় উপজেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য নাসির উদ্দিন চৌধুরীকেও নির্বাচনের আগে দল থেকে বহিস্কার করা হয়।

সিরাজদিখান উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মহিউদ্দিন আহম্মেদের মোবাইলে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি কল গ্রহণ করেনি।

সিরাজদিখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইয়ারদৌস হাসান জানান, আসিফের বাবা হাবিবুর রহমান বাদি হয়ে ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এ মামলায় আওয়ামী লীগের পরাজিত প্রার্থী নাসিরউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী রনি চৌধুরী (২৮)-কে ঢাকার জয়কালী মন্দির এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার ২দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে। সময়মতো রনিকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। অপর মামলায় আসিফ পক্ষের সবাই জামিন নিয়েছেন। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আসিফকে সুস্থ মনে করায় নিয়ম অনুযায়ী তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। মাদকের সঙ্গে তার কোন সম্পৃত্ততা ও পুলিশের গাড়িতে করে মাদক বহনের ঘটনা পুরোপুরি অসত্য বলে তিনি দাবি করেন।

ক্রাইম ভিশন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.